সম্মেলনে লাখো নেতাকর্মীর সমাগম ঘটিয়ে বড় রাজনৈতিক শোডাউন করেছে টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগ

215

হাসান সিকদার ॥
স্বরণকালের সেরা কাউন্সিল করেছে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ। জেলার প্রবীণ থেকে তরুণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়ে একবাক্যে বলছেন জেলা আওয়ামী লীগের এমন সুষ্ঠ ও সুন্দর পরিবেশের মধ্য দিয়ে কাউন্সিল তারা দেশের আর কোথাও দেখেতে পায়নি। টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে ত্রি-বার্ষিক জেলা সম্মেলনে লাখো নেতাকর্মীর সমাগম ঘটিয়ে টাঙ্গাইলে বড় ধরনের রাজনৈতিক শোডাউন করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। সম্মেলন থেকে দলের নেতাকর্মীদের সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি রাজপথেই বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতারা। তাঁরা বলেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা বিএনপির নেই। কারণ তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই। অতীতের মতো তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে সহিংসতার পথে গেলে বিএনপিকে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না।




গত সোমবার (৭ নভেম্বর) টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ জেলাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জেলার তৃণমূলের নেতাকর্মীরাসহ দলের শীর্ষ নেতারা জেলার আট সংসদীয় আসন আগামী নির্বাচনে ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সেই সাথে বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনকে টাঙ্গাইলের রাজপথে থেকে প্রতিহত করার ঘোষনাও দিয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা।




দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন সোমবার (৭ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন সকাল থেকে জেলার সকল ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা, উপজেলার দলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন যানবাহনে করে টাঙ্গাইল উপস্থিত হন। দলীয় নেতাকর্মীরা টাঙ্গাইল শহরের প্রবেশমুখে এসে যানবাহন থেকে নেমে মিছিল সহকারে সম্মেলনস্থল টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। দুপুর ২টার মধ্যে সম্মেলনস্থল টাঙ্গাইল স্টেডিয়াম মাঠ জেলার লাখো নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে যায়। দলীয় নেতাকর্মীরা ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে উপস্থিত হন। এই সম্মেলনকে ঘিরে গোটা জেলাব্যাপী দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। জেলা শহরের চতুর্দিকে বিভিন্ন সড়কে বিশাল বিশাল তোরণ নির্মাণ করা হয়। এমন আয়োজনে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে জেলায় সাজ সাজ রব পড়ে যায়। বহুদিন পর অনুষ্ঠিত হওয়া সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত হয়ে উঠে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়া সম্মেলনস্থল ভরে যায়। পরে স্টেডিয়ামে স্থান না পেয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা স্টেডিয়ামের পাশেই আউটার স্টেডিয়াম ও জেলা ঈদ গাঁ মাঠে অবস্থান নেয়। সম্মেলনের শেষ মুর্হুত পর্যন্তও বিশাল আকৃতির মিছিল ও খন্ড খন্ড মিছিল সম্মেলনস্থলের দিকে আসতে থাকে।




দলীয় নেতাকর্মীরা ছাড়াও জেলার সকল শ্রেণীপেশার মানুষের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্মেলনকে ঘিরে। শুধু সম্মেলনস্থল বা এর আশেপাশেই লোক সমাগম হয়, না নয়। পৌর শহরের রাস্তায় রাস্তায় মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও সম্মেলনে আসা নেতাকর্মীরা যানজটের মধ্যে পড়েন। এসময় তারা যানবাহন থেকে নেমে মিছিল নিয়ে সম্মেলনের উদ্দেশ্যে রওনা হতে দেখা যায়। এজন্য নির্ধারিত সময়ে দলের নেতাকর্মীরা সম্মেলনস্থলে উপস্থিত হতে পারেননি। এদিকে জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শহরের মোড়ে মোড়ে পুলিশের বিভিন্ন বাহিনী অবস্থান নেয়।




জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা টিনিউজকে জানায়, জেলা আওয়ামী লীগের ১২টি উপজেলার ১৩টি সাংগঠনিক উইনিট রয়েছে। দুইটি বাদে প্রতিটি ইউনিটের সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পূর্বেই। টাঙ্গাইল জেলায় বিগত ১৯৯৯, ২০০৪, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনকেও পিছনে ফেলেছে এবারের সম্মেলনকে। তারা টিনিউজকে বলেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের অন্যতম সদস্য, টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) থেকে বারবার নির্বাচিত জনপ্রিয় এমপি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন নেতা ও বর্তমান সরকারের সফল কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। শুধু তাই নয়, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আওয়ামী লীগ আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের সাংগঠনিক তৎপরতায় এসব বিভাগের জেলা আওয়ামী লীগের ইউনিটগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় টাঙ্গাইল জেলায় সফল একটি সম্মেলন দেখতে পেয়েছে জেলাবাসী।




তৃণমূলের নেতাকর্মীরা টিনিউজকে আরও জানায়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হওয়া স্বত্বেও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক নিজ জেলার সাংগঠনিক সকল কর্মকান্ডে নিজে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সফলতার সাথে। তার নেতৃত্বে পুরো টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনগুলোও বর্তমানে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। ড. আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে দীর্ঘ সাত বছর পর সফলভাবে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন সফলতার মুখ দেখতে পেরেছে। তারই আহবানে টাঙ্গাইলের এই বিশাল সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এছাড়াও জেলার এই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, মন্ত্রী, এমপিরা ছাড়াও কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী অনেক নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সকল অতিথিরা টাঙ্গাইলের এই সম্মেলনের প্রশংসা করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলীয় সকল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে রাজপথে থাকার আহবান জানান।




প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের বলেন, পয়সা খেয়ে কমিটি করা লোকদের আওয়ামী লীগের প্রয়োজন নেই। এসব কর্মকান্ড যারা করেন নিজেকে সংশোধন করে ভালো হয়ে যান। কমিটিকে ঘিরে পদ বাণিজ্যের কথা যেন না শুনি। ডেকে ডেকে পকেটের লোক বসাবেন তাও চলবে না। এবার তদন্ত করে খোঁজ-খবর নেব। পয়সা খেয়ে কমিটি করা লোকদের আওয়ামী লীগে প্রয়োজন নেই। কমিটি একটা হবে। নতুন নেতা আসতে দেন। বসন্তের কোকিল আছে দুঃসময়ের লোক নেই। কে কী করে তা শেখ হাসিনাও জানেন। তিনি আরও বলেন, নভেম্বরের পরে আসছে ডিসেম্বর। বিএনপি ডাক দিয়েছে ১০ ডিসেম্বর সমাবেশের। বাইরের লোক লাগবে না আমাদের। শেখ হাসিনা ডাক দিলে বাইরের লোক লাগবে না। ঢাকার রাজপথে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হবে। আমরা যদি ঢাকার রাজপথে অবস্থান নেই তাহলে বিএনপি পালাবার পথ পাবে না। পালনোর দল আওয়ামী লীগ নয়, পালানোর দল বিএনপি।




টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়ড়া উড়িয়ে জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি। সম্মেলনের উদ্বোধকের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেন, বিএনপি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে দেশে। বিএনপি আগে কোন রাজনৈতিক দল ছিল না। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের নিয়ে বিএনপির জন্ম হয়েছে। ইতিপুর্বে তারা দেশে অনেক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা সিলেটে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করেছে। যারাই এই কাজে জড়িত আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। সারা বিশ্ব আজ শেখ হাসিনার প্রশংসা করে। এখন বছরের প্রথম দিনেই বাচ্চাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করে বাঙালি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলে।




বঙ্গবন্ধু কন্যা এ দেশকে বিশ্ব দরবারে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। সন্ত্রাসী, লুটেরা ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূর প্রসারি চিন্তা-চেতনায় বিশ্ব মহামারী করোনা সহ সকল সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। ’৭১-এর পরাজিত শক্তিরা দেশকে পিছিয়ে নিতে চায়, তারা আরেকটা ’৭৫- এর দিবাস্বপ্ন দেখছে। তাদের সে ইচ্ছা কোনভাবেই পুরণ হবেনা। জনগনকে সাথে নিয়ে তাদের সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার পরোক্ষ খুনি। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে খুন করে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। এ দেশে এখন আর মঙ্গা নেই। খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। আমাদের খাদ্য এখন উদ্বৃত্ত হয়।




টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুকের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি ও আব্দুর রহমান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সালাম গোলাপ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান, শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন প্রমুখ। সম্মেলনে টাঙ্গাইলের আটটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা সহ জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার নেতারা বক্তব্য রাখেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহের এমপি।




সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক কাউন্সিলরদের সমর্থনে পুণরায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুককে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহের এমপিকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার ঘোষনা দেন।

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ