সখীপুরে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে সিপাহী জয়নালের পরিবারের আকুতি

24

স্টাফ রিপোর্টার ॥
১৯৭১ সালের (২৫ মার্চ)। রাজারবাগ পুলিশ লাইন। অসহযোগ আন্দোলন চরমে। ডিউটিরত এবং বিশ্রামে যত সিপাহী ছিল তাদের মাঝে একই আলোচনা যে কোন সময় পাকিস্তান সেনারা বাঙালীদের উপর আক্রমন করতে পারে। শেখ মুজিবের প্রতিটি নির্দেশ সবার নজরে। সব জল্পনার অবসান করে (২৫ মার্চের) সেই কালোরাতে পাকিস্তান সেনারা কোন ঘোষণা ছাড়াই আক্রমন করে রাজারবাগ পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। সিপাহী জয়নাল আবেদীন সেদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বিপি নম্বর-৯৫১।
সেদিন দেশপ্রেমী জয়নাল আবেদীন সাথী সিপাহীদের নিয়ে পাকিস্তান সেনাদের বিরুদ্ধে নেমে পড়েন যুদ্ধে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাদের ভারী অস্ত্রের মুখে সাধারণ রাইফেল দিয়ে প্রতিরোধ দীর্ঘায়িত করতে পারেননি তারা। বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের অবস্থান ছেড়ে তারা বাইরে এসে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ওই যুদ্ধে সহযোদ্ধা অনেক সিপাহী নিহত হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন জীবনে বেচেঁ যান। কিন্তু সেদিনের সে যুদ্ধে সাথীদের হারানোর কষ্ট আর পাকিস্তান সেনাদের বোমার বিকট শব্দ আর নিষ্ঠুরতা তাকে স্তব্দ করে দেয়। ওই রাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন একটি বাসায় আশ্রয় নেন। পরে তাদের দেয়া লুঙ্গি, শার্ট পড়ে আর কিছু টাকা নিয়ে পায়ে হেটে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের বাসাইল (বর্তমান সখীপুর) থানার যাদবপুর গ্রামে পৌঁছান। পরিবারের লোকজন হঠাৎ করে এমন পোষাকে জয়নাল আবেদীনকে দেখে সেদিন অবাক হয়েছিলেন। বিষন্ন জয়নাল চুপচাপ থাকতেন। বাড়ি থেকে বেড় হতেন না। কেন তার এ পরিবর্তন ? কেন তার মধ্যে এমন বিষন্নতা ? সবার অনেক প্রশ্নের মুখে তিনি সপ্তাহ খানেক পড়ে জানালেন ওই যুদ্ধের রাত্রে ভারী গুলাগুলি আর সাথী হারানোর যন্ত্রনাই তার মানুষিকভাবে ভেঙে পরার একমাত্র কারণ। দিন যায় আর তিনি মানুষিক এবং শারীরিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন।
সিপাহী জয়নালের পারিবার সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল (বর্তমান সখীপুর) থানার যাদবপুর গ্রামের নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান ছিলেন জয়নাল আবেদীন। বাবার নাম মনির উদ্দিন সিকদার। গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে হাইস্কুলে ভর্তি হন। প্রতিদিন যেতে হতো বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পায়ে হেটে আর বর্ষা মৌসুমে নৌকায়। এসব প্রতিকুলতা আর পরিবারিক অর্থাভাবে তিনি লেখাপড়ায় বেশিদূর এগুতে পারেননি। গঠনে সুঠামদেহী দীর্ঘ আকৃতির ছিল জয়নাল আবেদীন। একদিন পুলিশে লোক নেওয়ার খরব পেয়ে লাইনে দাঁড়ান তিনি। তার সুঠামদেহ আর লম্বায় নির্বাচকদের নজরে পড়লে তিনি নির্বাচিত হন। চলে যান সারদার ট্রেনিং সেন্টারে।
সারদার ট্রেনিং শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত জয়নাল আর যুদ্ধ ফেরত জয়নালের মাঝে এ এক বিরাট পার্থক্য। মানষিক অবসাদ থেকে তার শরীরে একের পর এক অসুখ বাসা বাধে। স্ত্রী সন্তান পিতা-মাতা নিয়ে অভাবের সংসার। সারাদিন বাড়ির সামনে আম গাছের নীচে বসে থাকত আর কি যেন ভাবত। নানা অসুখে জর্জরিত জয়নাল আবেদীনকে জমিজমা বিক্রি করে তার চিকিৎসা করালেও ফল শুভ হয়নি। বীরমুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন জীবিত থেকেও যেন মৃত প্রায়। নিজের অধিকারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তিনি আরো নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
পরিবারের অনুরোধে ১৯৭২ সালের কোন এক সময় গিয়েছিলেন কর্মস্থল রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। সেখান থেকে তাকে বলা হয়েছিল জয়নাল আবেদীন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তার ফাইল ক্লোজ (বন্ধ) করে দেওয়া হয়েছে। পূণরায় চাকুরীতে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। হায়রে নিয়তি যে বীরমুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীনের জন্য জীবনের সব হারালো সেই স্বাধীন দেশে নিজে জীবিত থেকেও তার মৃত ঘোষণা নিয়ে বিদায় নিতে হলো। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরলেন তিনি। এরপর অনাহারে অর্ধাহারে আর চিকিৎসার অভাবে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন ২০০০ সালে (২০ অক্টোবর) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার মৃত্যুতে সংসারের সকল দায়িত্ব পড়েন স্ত্রীর উপর। সংসারের অভাব মেটাতে জমিজমা বিক্রি আগেই শেষ। চার কন্যা আর দুই পুত্র সন্তানের তিন বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে না পেড়ে স্ত্রীও ভেঙে পড়েন। অনাহারে অর্ধাহারে চলে সংসার। কোন উপায়ন্তর না দেখে তার স্ত্রী স্বামীর মৃত্যু সনদ নিয়ে ২০০১ সালে পেনশনের টাকা চাইতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যান। যেখানে তার স্বামী প্রায় ৬ বৎসর পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত ছিল। জয়নাল আবেদীন, পুলিশ সদর দপ্তর স্বারকনং কল্যাণ ৪৮-৯৩/১৯২/১৯(১০) তারিখ ০১/০২/৯৩ এবং স্বারক নং কল্যাণ ৪৭-৯৩/১৯১/ ১/(৮) তারিখ ০১/০২/৯৩ প্রাক্তন কং (নিহত) বিপিনং ৯৫১।
স্বামীর কর্মজীবনের স্মৃতি বিজরিত স্থান স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার কান্নায় চোখের জলের বিপরিতে তাকে শুনতে হয় আরেক নিষ্ঠুর বাক্য। ওই অফিস থেকে জানানো হয় সিপাহী জয়নাল আবেদীনের চাকুরীর সব পাওনা তুলে নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। কী বিচিত্র এ দেশ। জীবিত জয়নালকে মৃত বলা, আবার তারই পেনশনের টাকা তুলে নেন অন্য কেউ। অনেকটা বাকরুদ্ধ অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন স্ত্রী সুফিয়া বেগম। পরবর্তীতে যাদবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম আতিকুর রহমানসহ অনেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে তদবির করেও এর সুরাহা করতে পারেননি।
বীরমুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী সুফিয়া বেগম বলেন, জীবিত থেকে আমার স্বামী তার অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারেননি। তার স্ত্রী সন্তান অর্থাভাবে জীবন যুদ্ধে পরাস্থ, অধিকার বঞ্চিত। জাতীর পিতা বঙবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছুই করছেন। তিনি প্রাধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবী জানান, বাংলাদেশের জন্য সর্ব প্রথম অস্ত্রহাতে যুদ্ধে যাওয়া সেই সিপাহী জয়নাল আবেদীনকে বীরমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অর্ন্তভূক্ত করে তার আত্মার শান্তি দিতে। পরিবার পরিজন নিয়ে সমাজে মাথা উচু করে বাঁচতে।
এ ব্যাপারে ওই গ্রামের আরেক বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম মিঞা বলেন, জয়নাল আবেদীন একজন সরল মানুষ ছিলেন। (২৫ মার্চ) পাক সরকারের চাকরীর মায়া ছেড়ে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে মিলিটারী বাহিনীর সাথে সর্ব প্রথম যুদ্ধ করেছেন জয়নাল। পুলিশে চাকরী করার জন্য পেনশন, রেশন ও অন্যান্য সুযোগ অবশ্যই তার পাওয়া উচিত। মানসিকভাবে বিপর্যয়ের কারনে সে দুনিয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এ দেশের সমাজ, পুলিশ বাহিনী, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসলে, বীরমুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের অধিকার বঞ্চিত স্ত্রী সন্তানরা সকল সুবিধা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। নানা প্রতিকুলতায় জয়নালের স্ত্রীর চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থাভাবে জীবন অচল। অধিকার আদায় করার ক্ষমতা তার নেই। সমাজের, রাষ্ট্রের সুবিচার পাবে এটাই একমাত্র ভরসা।

 

ব্রেকিং নিউজঃ