সখীপুরে কিন্ডারগার্টেনগুলো প্রায় বন্ধের পথে হুমকির মুখে

130

বিভাস কৃষ্ণ চৌধুরী ॥
গত বছরের (১৭ মার্চ) থেকে করোনা মহামারির কারণে সরকারের নির্দেশনায় সারাদেশের ন্যায় টাঙ্গাইলের সখীপুরেও সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পুণরায় কবে চালু করার নির্দেশনা আসবে তা নিশ্চিত বলতে পারছেন না কেউ। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও বন্ধ নেই তাদের মাসিক ভবন ভাড়াসহ নানা খরচ। এরই মধ্যে উপজেলায় ভবন ভাড়াসহ বিবিধ খরচের চাপে বেশকয়েকটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্কুলের পরিচালকরা মনে করছেন ভবনের মালিকপক্ষ উদার না হলে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বন্ধ হয়ে যাবে অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন। শিক্ষাবিদরা বলছেন, হঠাৎ এসব শিক্ষপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপক হুমকির মুখে পড়বে।
কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক, পরিচালক ও এই খাতে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সখীপুর উপজেলায় ১৪৫টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বিগত এক বছর তিনমাস ধরে ওইসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পরপরই অভিভাবকরাও স্কুলের বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেন। বেতন-ভাতা না পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েন কিন্ডারগার্টেনে কর্মরত উপজেলার প্রায় দুই হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। গুটি কয়েকজন শিক্ষক বাদে কাজ হারিয়ে এখন তাঁরা সবাই অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে আয়ের উৎস হারিয়ে মহাবিপদে পড়েছেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালকরা। উপজেলার প্রায় সব কিন্ডারগার্টেন স্কুলই ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হয়। ভাড়ার চাপে স্কুল ভবন ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেক পরিচালক। ইতোমধ্যে ৩০ টির বেশী কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান অর্ধেক ভাড়া পরিশোধ করে কিছু প্রতিষ্ঠান ভাড়া বকেয়া রেখে নামমাত্র টিকে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠান পরিচালকরা টিনিউজকে বলেন, আগামী এক/দুই মাস পরে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও স্কুল পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। ভবন মালিকরা দীর্ঘ দেড় বছরের ভাড়া ছাড়পত্র না দিলে স্কুলের সকল সরঞ্জাম বিক্রি করেও তা পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
উপজেলার প্রতিমাবংকী গ্রামের গোল্ডেন লাইফ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক জহির ইকবাল টিনিউজকে বলেন, গ্রামের মধ্যে দু’টি টিনশেড ঘর ভাড়া নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাই। প্রতিমাসে ভাড়া দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার টাকার ভাড়া বাকি পড়েছে। প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও ঘর ভাড়ার বাকী টাকা পরিশোধ করে স্কুল চালু করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছেন হলেও সহযোগিতার আশা করেন তিনি।
উপজেলা কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আল মামুন। তিনি পৌর শহরে তিনতলা ভবন ভাড়া নিয়ে শাহীন শিক্ষা পরিবারের একটি শাখা পরিচালনা করেন। তিনি টিনিউজকে বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০০ জন নামমাত্র টিকে আছে। ভবন মালিককে অর্ধেক ভাড়া দিয়ে কোনভাবে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রয়েছি। গত দেড় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। শিক্ষক ও ঘরভাড়া দিতে না পারায় কতগুলো প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে তার সঠিক হিসেবই নেই আমাদের কাছে।
সখীপুর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিষয়ে সরকারের ভাবা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে শিশু শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেনগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি বর্ধিত কলেবর। প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে আমরা শিক্ষক ও পরিচালকদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও সরকারি মুজিব কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ছদরুদ্দীন আহমদ টিনিউজকে বলেন, করোনা মহামারিতে সামলে ভবন ভাড়াসহ নানা অর্থনৈতিক চাপ সামলে শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। কিন্ডারগার্টেনগুলো জাতি বা সরকারের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এই বিশেষ দুর্যোগে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিলে আমাদের জাতি ও দেশও ধ্বংসের দিকে যাবে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ব্যাপারে সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চিত্রা শিকারী টিনিউজকে বলেন, বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা কেজি স্কুলগুলোর জন্যে করোনাকালীন সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে আপাতত প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখতে পরিচালকদেরই মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে। এ বিষয়ে সরকার বরাদ্দ দিলে অবশ্যই সুষ্ঠু বন্টন করা হবে।

 

ব্রেকিং নিউজঃ