সখীপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ ॥ নারীরা এগিয়ে

131

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় অন্য বছরের তুলনায় বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গত এক বছরে তালাকের মাধ্যমে ৫৭৮টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণে সৃষ্ট পারিবারিক কলহ ডিভোর্স বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। এছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল, পারস্পরিক বোঝাপড়া না হওয়াও বড় কারণ। নারীদের পক্ষ থেকে বেশি ডিভোর্স দেওয়ার পেছনে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধিকেই প্রধানত দায়ী করছেন তাঁরা।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, বাল্যবিবাহ, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর উদাসীনতা, পরকীয়া, নারীর প্রতিবাদী রূপ, নারীর শিক্ষা, স্বামীর মাদকাসক্তি, দীর্ঘদিন স্বামী প্রবাসে থাকা, শ্বশুর-শাশুড়ির নির্যাতন, যৌতুকের জন্য ক্রমাগত চাপ, স্বামীর নির্যাতন এসব কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।
সখীপুর উপজেলার আট ইউনিয়ন ও একমাত্র পৌরসভায় মোট ১২টি কাজি অফিস রয়েছে।




কাজি অফিসের নথি থেকে জানা যায়, বিগত ২০২১ সালে উপজেলার হাতীবান্ধা ইউনিয়নে ৪৪টি, যাদবপুর ইউনিয়নে ৪৪টি, বহুরিয়া ইউনিয়নে ২১টি, গজারিয়া ইউনিয়নে ১৮টি, দাড়িয়াপুর ইউনিয়নে ৩৫টি, কালিয়া ইউনিয়নে ১২০টি, বহেড়াতৈল ইউনিয়নে ৬৯টি, কাকড়াজান ইউনিয়নে ৬৩টি ও পৌরসভার চারটি কার্যালয়ে ১৫৪টি বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক) নিবন্ধন করা হয়েছে।

সখীপুর উপজেলায় এক বছরে বিবাহ ৮৩৩ টি আর বিবাহ বিচ্ছেদ ৫৭৮টি। এরমধ্যে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে ১৭টি, স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে ২৯৭ টি ও ছেলে-মেয়েপক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে ২৬৪টি বিয়ের তালাক নিবন্ধন করা হয়েছে। উপজেলার ১২টি কাজির কার্যালয় ঘুরে এমনই চিত্র পাওয়া যায়।

একজন নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামান্য কারণে একজন নারী কখনো বিবাহ বিচ্ছেদ চান না। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যখন সীমা অতিক্রম করে। তখন বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হয়।

সখীপুর উপজেলা নিকাহ রেজিস্ট্রার, কাজি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সখীপুর পৌরসভার কাজি শফিউল ইসলাম বলেন, বাল্যবিবাহ, স্বামী বিদেশে থাকা ও পরকীয়াঘটিত নানা জটিলতা নিয়ে প্রথমে দুই পরিবারে ফাটল ধরে পরে তা বিচ্ছেদে রূপ নিচ্ছে। তিনি জানান, সখীপুরের ৯০ শতাংশ তালাক স্ত্রীরা দিয়েছেন।




এক নারী তার বিবাহবিচ্ছেদের পেছনের কারণ জানান টিনিউজকে। তার স্বামী বিয়ে করে ১৫ দিনের মাথায় বিদেশ চলে যান। বিয়ের সময় শর্ত ছিল স্ত্রীকে পড়াশোনা করতে দেওয়া হবে। কিছুদিন পর স্বামী বিদেশ থেকে বলেন, পড়াশোনা করা যাবে না। কেন? স্বামী তখন ফোনে জানিয়েছিলেন তার স্ত্রী নাকি অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করছে। পড়াশোনা করলে তাকে ফেলে চলে যাবেন। এসব মিথ্যা বলে স্ত্রীকে পড়াশোনা বন্ধ করার জন্য চাপ দেন। তবু স্ত্রী পড়াশোনা চালিয়ে যান। এরপর থেকে স্বামী কোনো খরচ দেন না তাকে। কোনো ফোন করেন না। মেয়েটিকে তালাক দেবেন বলে হুমকি দেন। দুই বছর স্বামী তার খোঁজ না নেওয়ায় স্ত্রীই স্বামীকে তালাক দেন।

বিচ্ছেদের ঘটনা এতো কেন? এমন বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিরা টিনিউজকে জানান, সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারকে দায়ী করেন। বাল্য বিবাহ ও শিক্ষা জীবন শেষ না করেই বিবাহের কারণে অনেক বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। এছাড়া উচ্চ শিক্ষিত দম্পতিদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করার কারণে সংসারে অশান্তি তৈরি হয়। যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে বিবাহ বিচ্ছেদে। স্বামীর প্রবাসী জীবন, দু’জনের মতের অমিল, সাংসারিক মনোমালিন্য, কিছু ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীকে রেখে আরেকটি বিয়ে করায় নারী বিবাহ বিচ্ছেদ চান। এছাড়া সখীপুরে প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অভিভাবক হিসেবে কনের মায়েদের উদাসীনতাও দায়ী বলে মনে করেন তারা।




এ ব্যাপারে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, আগে নারীর ক্ষমতায়ন এখনকার মতো ছিল না। পুরুষদের অত্যাচার সহ্য করে নীরবে সংসার করেছে। এখন মেয়েরা সচেতন, শিক্ষিত ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ায় মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এখন মেয়েরা আর নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে চায় না। এখন আগের চেয়ে নারীরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হওয়ায় তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আর মুখ বুজে থাকেন না। তাই হয়তো বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যাটা বেড়েছে।

সখীপুর মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক বাবুল আকতার বলেন, স্বামী প্রবাসে থাকা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অমিল, পরকীয়া, নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের প্রভাব, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব এবং বাঙালি সংস্কৃতির বিচ্যুতি, মূল্যবোধগত অবক্ষয়সহ নানা কারণে স্ত্রী কর্তৃক তালাকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তালাক কমাতে হলে আগে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে হবে। এছাড়া অসময়ে বিয়ে, যৌতুক, দীর্ঘদিন স্বামী প্রবাসে থাকা, পরকীয়া, স্বামী কর্তৃক নির্যাতন তালাকের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।

ব্রেকিং নিউজঃ