যমুনার ভাঙন স্বজনদের ঈদ আনন্দ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে

66

এম কবির ॥
যমুনার ভাঙন ঈদে স্বজনদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তীব্র ভাঙনে বসতভিটায় রয়ে গেছে প্রাণচাঞ্চল্যের চিহ্ন। যমুনা নদী বেষ্টিত টাঙ্গাইল জেলায় এবারের ভাঙনে তীব্রতা অনেক বেশী। জেলার কালিহাতী, সদর ও নাগরপুর উপজেলায় নদী তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য যেমন আশির্বাদ, তেমনি অভিশাপও। তাই এবার কোরবানি ঈদে ভাঙন কবলিতরা ঈদ করতে পারেনি।

নদী অনেক মানুষকে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দিয়েছে, আবার অনেককে সর্বশান্তও করে দিচ্ছে। যমুনা নদী তীরের বাসিন্দাদের বসতবাড়িই ভেঙে নিচ্ছে না, ভেঙে দিচ্ছে তীররর্তী বাসিন্দারে ঐক্যবদ্ধতাও। বছরের পর বছর একসঙ্গে বসবাস করা, সুখে-দুখে ঈদের আনন্দ ভাগ করা আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীকে একে অপরের কাছ থেকে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে তাদের বন্ধন। এ যেন ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ পড়ার মতো অবস্থা। ভাঙনের ক্ষতের মধ্যে দূরত্বের ক্ষতও তৈরি হচ্ছে তাদের অন্তরে। আর পরিবারের যেসব সদস্যরা বেঁচে নেই, তাদের সমাধিস্থলও নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে রাক্ষুসী যমুনা নদী।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কাকুয়া ইউনিয়নের চরপৌলী গ্রামের চাঁন মিয়ার পাঁচ ছেলে একই বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে বসবাস করে আসছিলেন। ৫০ বছরের পুরোনো বাড়িটি নদীর খুব কাছেই। তাই ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে বাড়ির বাসিন্দারা যে যার মতো অন্যত্র বসতি গড়েছেন। একেকজন একেক জায়গায় চলে যাওয়ায় এবার ঈদে একে অপরের কাছ থেকে ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

চাঁন মিয়ার ছোট ছেলে মানিক মিয়া টিনিউজকে বলেন, কয়েকদিনের মধ্যে আমাকেও কোথাও না কোথাও যেতে হবে। আমাদের ভাইদের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে হচ্ছে। যমুনা নদী আমাদের একসঙ্গে বসবাস করতে দিল না। তিনি টিনিউজকে আরও বলেন, বাড়িতে যখন একসঙ্গে ছিলাম, একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতাম। আপদে-বিপদে এগিয়ে আসার সুযোগ হতো। এ পর্যন্ত সকল ঈদ আনন্দ একসঙ্গেই করেছি। কিন্তু এখন চাইলেও সম্ভব হবে না। একেক জন একেক জায়গায়। একই গ্রামে সমাজবদ্ধ হয়ে অনেকের সঙ্গে বসবাস করতাম। প্রতি ঈদে কোরবানি মাংস ভাগ করে নিতাম। অনেক প্রতিবেশী ছিল। কিন্তু যমুনা ভাঙনে এখন সবাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তাদের অপর বড় ভাই জালাল মিয়া টিনিউজকে বলেন, বাবা এবং এক ভাইয়ের কবর বাড়ির সামনেই। এছাড়া পরিবারের অন্তত আরও ১০ জন সদস্যের কবর রয়েছে পারিবারিক কবরস্থানে। কিন্তু নদী তাদের শেষ স্মৃতিও কেড়ে নিয়েছে। বাবা-ভাইয়ের কবরটুকুও আর থাকল না।

তাদের প্রতিবেশী আমজাদ হোসেন টিনিউজকে বলেন, আমরা চার ভাই। সবাই একই বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে বসবাস করতাম। এখন বাড়ি নদীগর্ভে। চার ভাই চার স্থানে। এখন কারো সঙ্গে কারো সহজে দেখা হয় না। তাই এবার একসঙ্গে কোরবানির ঈদও করা হলো না। বসতভিটা ছাড়ার তিনদিনের মাথায় বাবা মারা যান। পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা সম্ভব হয়নি। কারণ সেটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙন আমাদের একে অপরকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

আলীপুর গ্রামের পশ্চিম পাশে জয়নাল আবেদীনের বাড়ি। প্রায় ৬০-৬৫ বছর আগে জেলে জয়নাল মিয়া এ বাড়িতে তার চার ছেলেকে নিয়ে বসতি স্থাপন করেছেন। তিনি আজ বেঁচে নেই। তবে তার চার ছেলের মধ্যে দুই ছেলে এখনো জীবিত। মৃত জয়নাল মিয়ার শতাধিক উত্তরসূরির বসবাস ছিল এ বাড়িতে। বসতঘরের সংখ্যা ছিল ১২টি। পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই মিলেমিশে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতেন। সম্প্রতি নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ৬০-৬৫ বছরের একতাবদ্ধ পরিবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। পুরো বাড়ি চলে গেছে যমুনার তলদেশে। মৃত জয়নাল মিয়ার যে দুই ছেলে বেঁচে আছেন, তাদের মধ্যে একজন নুরুজ্জামান। তার বয়স ৮৩। শেষ বয়সে তার আপেক্ষ, এবার এক সাথে ঈদ করতে পারলাম না। এছাড়া মরে গেলে বাবার কবরের পাশে তার দাফন হবে না। আর জানাজায় হয়তো একত্র হতে পারবেন না বাড়ির লোকজন। তিনি টিনিউজকে আরও বলেন, আমাদের বংশের ১২টি পরিবার এখন ১২ স্থানে গিয়ে বসবাস করছে। তাই সবার কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। শেষ জীবনে অনেকের সঙ্গে আর দেখা নাও হতে পারে। বাবার কবরসহ বংশের প্রায় ১৫ জন সদস্যের সমাধিস্থল ছিল। নদী পূর্ব পুরুষদের সমাধিস্থলও বিলীন হয়ে গেছে।

কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন বৃদ্ধ নুরুজ্জামান। বললেন, বুকটা ফেটে যাচ্ছে। এতো বছরের একতা এখন বুঝি শেষ হয়ে গেল।
শ্যামশৈল ও ভৈরববাড়ী গ্রামের নারী-পুরুষসহ বাড়ির কয়েকজন বাসিন্দা টিনিউজকে বলেন, দীর্ঘ সময় থেকে আমরা সুখে, দুঃখে একসঙ্গে থেকেছি। ঈদের আনন্দগুলো সবাই ভাগ করে নিয়েছি। একে অন্যের বিপদে এগিয়ে গেছি। বাড়িতে বিয়ে-শাদী, ঈদ বা যে কোনো অনুষ্ঠানে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করতাম। এখন ১২ পরিবার ১২ জায়গায় গিয়ে উঠেছে। ফোনে যোগাযোগ থাকলেও কারো সঙ্গে কারো দেখা হয় খুব কম। একে অন্যের বিপদে বা সাহায্যার্থে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তারা টিনিউজকে বলেন, একদিকে বসতবাড়ি ভাঙনের ক্ষত, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়া। অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া। এটাই যমুনা তীরের বাসিন্দাদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।

 

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ