শনিবার, আগস্ট 8, 2020
Home এক্সক্লুসিভ যমুনার চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহন

যমুনার চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
যমুনা চরাঞ্চলে প্রায় দেড় যুগ আগেও পরিবহনের জন্য ছিল না তেমন কোন কিছু। বর্ষা মৌসুমে নৌকায় আর শুকনো মৌসুমে মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালুচর। পায়ে হেঁটেই নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল মাথায় নিয়ে হাটে ও গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতেন মানুষ।
গ্রামাঞ্চলের মেঠো পথে পরিবহন বলতে ছিল গরু ও মহিষের গাড়ি। কালের পরিবর্তনে এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে অধিকাংশ গরু ও মহিষের পরিবহন। বর্তমানে আধুনিকতায় ছোঁয়ায় অটো-ভ্যান, অটো-রিকশাসহ বিভিন্ন ধরণের যান্ত্রিক গাড়ি দখল করে নিয়েছে গ্রামাঞ্চলের পথ ঘাট। আধুনিক যুগে গরু ও মহিষের গাড়ি বিলুপ্তি হলেও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার দুর্গম যমুনার চরাঞ্চলে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি ও ইঞ্জিন চালিত মিনি ট্রফি ট্রাক্টরে পরিবহন।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে জানা যায়, গরু ও মহিষের গাড়ি ছিল সে সময়ে পরিবহন বাহক। কিছু মানুষও যাতায়াত করতো তবে কম। ঘোড়ার গাড়ি বলতে ছিল সে সময়ে রাজা-বাদশা ও জমিদারদের পরিবহন। প্রজা ও সাধারণ মানুষের কল্পনার বাহিরে ছিল ঘোড়ার গাড়িতে (চড়া) উঠা। গ্রাম ও যমুনার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে সব ধরণের মানুষের রাজকীয় আদলে না হলেও বর্তমান সময়ে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পরিবহন এখন বেশ জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে দুর্গমন এই চরাঞ্চলবাসীর। উপজেলার পুংলীপাড়া গ্রামের ঘোড়া চালক শাহ কামাল টিনিউজকে বলেন, এখন যমুনা চরাঞ্চল মরা। যা এখন শুকনো মৌসুমে উঁচু নিচু বালুময় দ্বীপ। এ চরাঞ্চল এলাকার জমি থেকে উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলার জন্য ঘোড়া গাড়ি একমাত্র বাহক। কেননা মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালুচর। পায়ে হেঁটে মাথায় করে ফসল বাড়িতে নিয়ে আসা খুবই কষ্টকর। তাই বর্তমানে এ চরাঞ্চলে মালামাল ও বিভিন্ন ধরণের পরিবহনের জন্য ঘোড়ার গাড়ি প্রধান মাধ্যম। তবে বর্ষার সময়ে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার হয় না।
যমুনা চরাঞ্চলের মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চরাঞ্চলের উৎপাদিত ফসল, বাদাম, ভুট্টা, মসুর ডাল, কাউন, খেসারি ডাল, বোরো ধান, মিষ্টি আলু, কাঁশফুলের শুকনো খড় ইত্যাদি ফসল জমি থেকে ঘোড়ার গাড়িতে পরিবহন করা হয়। এছাড়াও গাবাসারা মধ্য চরাঞ্চলে হাট বাজারে গোবিন্দাসীর পুরাতন ফেরীঘাট থেকে পরিবহন করে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে পাড়ি জমায় হাটে। সরেজমিনে উপজেলার গাবাসারা, অর্জুনা ও নিকরাইল ইউনিয়নের অধিকাংশ ঘোড়ার গাড়িতে সব ধরণের কৃষি পণ্য ও মালামাল পরিবহন করা হয়। এতে চালক হিসেবে বেশী ভাগ ১৫ থেকে ২২ বছর বয়সের ছেলেরা চালায়। পরিবারে অভাব-অনটন, বাল্যশিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া ও সংসারের হাল ধরতেই তারা এই পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে জানায়। শুধু ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছে তাই নয়। বর্ষা মৌসুমে নদীতে মাছ ধরাসহ নদী থেকে নৌকাযোগে বালু উত্তোলন করে ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী ঘাটসহ জামালপুর, সরিষাবাড়ী ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ঘাটে বালু বিক্রি করে সংসার চালাতে চালাচ্ছে। ঘোড়ার গাড়ি চালক শফিকুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, বর্তমান তাদের ২টি ঘোড়া রয়েছে। ৫ ভাই, ২ বোন ও মা-বাবা নিয়েই তাদের সংসার। তার বাবা একা সংসার চালাতে হিমসিমে পড়েছিল বছর তিন আগে। অন্য আরেক জনে একটা ঘোড়া কিনে দেয় তাকে। এরপর নিজেদের ফসলের পরিবহন করেও অন্যের ফসল নিতো ভাড়ায়। দিনে ২ হাজার ৫’শ থেকে ৩ হাজার ৫’শ টাকা পর্যন্ত ভাড়া উঠতো। এভাবে সংসারে অভাব কমতে থাকে। এক পর্যায়ে আরো ৩ টি ঘোড়া কিনে চরাঞ্চলে ভাড়ায় চালাচ্ছে শফিকুল।
যমুনা চরাঞ্চলবাসীরা টিনিউজকে জানায়, ঘোড়ার গাড়ি তৈরিতে খরচ কম, ঘোড়ার দামও হাতের নাগালে। পরিবহনের উপযোগী একটা ঘোড়ার দাম ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে কয়েক বছর পরিবহন করতে সক্ষম হয়। ঘোড়ার খাদ্য হিসেবে ধান ভাঙানো কুঁড়া, সরিষার খৈল, ছোলা, ভূষি ও চাউলের খুত খাওয়ালেই হয়। এ ছাড়াও মাঠে সবুজ ঘাস ও খড়ও খায়। এতে ঘোড়া পালনে আরো খরচ কম হয়। তাছাড়া অনেকেই লাভবান হয়ে সংসারের স্বচ্ছতা ফিরেছে।
এদিকে, যমুনা চরাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরণের কৃষি পণ্য ও পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। চরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও গ্রাম চলাচলের রাস্তা-ঘাটের অভাবে যেখানে আধুনিক যান্ত্রিক পরিবহন গাড়ি চলতে পারে না। সেখানে বালুকে উপেক্ষা করে ঘোড়ার গাড়িতে পরিবহনে মানুষের নানা ধরণের সুবিধা দিয়ে আসছে। চরাঞ্চলের জমি থেকে উৎপাদিত ফসল বাড়িতে নিয়ে যেতে জুড়ি নেই এই ঘোড়ার গাড়ি। যার কারণে যান্ত্রিক যুগেও দিন দিন জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে যমুনা চরাঞ্চলের মানুষের কাছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

ব্রেকিং নিউজঃ