মুক্তিযুদ্ধে ছাব্বিশা গ্রামের ৩২ জন রক্তে ভাসে

128

2012-05-18 14.04.25স্টাফ রিপোর্টারঃ

টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর উপজেলার ছাব্বিশা গ্রাম। ভুঞাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণে গেলেই এ গ্রাম। পাকা রাস্তা। অটো, রিকশা, মোটরসাইকেল নিয়ে সহজেই যাওয়া যায়। এই গ্রামেরই ওমর আলীর পরিবারের সাতজনকে গুলি ও পুড়িয়ে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। একই সঙ্গে জ্বালিয়ে দেয়া হয় পুরো বাড়ি। সেই পরিবারের বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে একজন ছানোয়ার হোসেন (৫৯)। তাঁর বাবা, মা, বোন, চাচা, চাচাতো বোন নিহত হন মহান মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল দিনে। সেদিন যারা নিহত হনÑওমর আলী, তার স্ত্রী সাজেদা বেগম, ওমর আলীর বড় ভাই ইসমাইল হোসেন কটু, বড় ভাইয়ের (ইসমাইল হোসেন) নয় বছরের মেয়ে খালেদা আক্তার, তার নাতি হোসনে আরা, মেঝ ভাই মমতাজ উদ্দিন, ওমর আলীর এক মাস বয়সের মেয়ে রাবেয়া খাতুন কুলসুম। একই সময় এ গ্রামের মোট ৩২ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
ছানোয়ার হোসেন জানান, সেদিনের ভয়াবহ ঘটনা-১৯৭১ সালের ১৭ নভেম্বর। তখন রমজান মাস। ২৬ অথবা ২৭ তম রোজা চলছিল। রাতে সেহরী খেয়ে ঘুমিয়েছেন সবাই। রোজার কারণে দিনেরবেলা সকালে রান্নার তাড়া ছিল না। অন্য কাজও কম ছিল। তাই ঘুম থেকে উঠতেও অনেকেই দেরি করেছে। হালকা শীত থাকায় দিনের কাজ শুরু করতেও দেরি হয়ে যায়।
সকাল সাতটার পরপর খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, বিহারীরা এ গ্রামের দিকে আসছে। ভয়ে লোকজন যার যার মতো পালিয়ে যেতে শুরু করে। আশপাশের বাড়ির অনেকে তাদের বাড়িতে এসে একত্র হন। বাড়ির কিছু দূরে একটি খাল ছিল। খালের পাড়ে মুক্তিবাহিনীর অবস্থান ছিল। তারা লোকজদের ছোটাছুটি করতে নিষেধ করে। লোকজনের ছোটাছুটি দেখলে পাকিস্তানীরা সঙ্গে সঙ্গে গুলি করতে পারে বলে তারা জানায়। বাবা ওমর আলী রান্নাঘরের পাশেই ছিলেন। তার সামনে ছিলেন বড় চাচা ইসমাইল হোসেন। বাড়ির অন্যরাসহ আশপাশের বাড়ি থেকে আসা মানুষ রান্নাঘরে আশ্রয় নেন। মুহূর্তের মধ্যে বিহারীরা গুলি করতে করতে বাড়িতে প্রবেশ করে। ইসমাইল হোসেন তাদের দেখে দু’হাত উচুতে তুলে দাঁড়ান। কোন কথা না বলেই তাকে গুলি করা হয়। বুকের ঠিক মাঝখানে গুলি লাগে। তিনি লম্বা, মোটা, ভারি দেহের লোক ছিলেন। তার রক্তে পাশের উনুন (চুলা) ভর্তি হয়ে যায়। উঠানের মধ্যে গুলি করা হয় ওমর আলীকে। তারপর রান্নাঘরে ঢুকে বেধড়ক পিটুনি শুরু করে। এ অবস্থায় যে যার মতো দৌঁড়ে পালাতে থাকে। তাদের সঙ্গে পালিয়ে যান ছানোয়ার হোসেন। তার অপর তিন ভাই আবদুল মান্নান, হুরমুজ আলী ও বেল্লাল হোসেনও বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। ছানোয়ার হোসেন সোজা চলে যান ঘাটাইল উপজেলার বগাজান গ্রামে তার বোন জবেদা খাতুনের বাড়ি। সেখানে আধা ঘন্টার মতো অবস্থান করেন। পরে বোন, বোন জামাই নিয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসার জন্য বের হন। রাস্তায় ইফতার করেন। রাতে বাড়ি এসে দেখেনÑসারা বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উঠানে বাবা, মা, ছোট্ট বোনের অর্ধপোড়া লাশ পড়ে আছে। বাকিদের লাশও আশপাশে পড়ে রয়েছে। ছানোয়ার হোসেন বলেন, বাবা, চাচাকে গুলি করে মারার পর বাড়ি পোড়াতে গেলে মা তাদেরকে বাড়ি না পোড়াতে অনুরোধ করেন। তখন মার কোলে ছোট বোন ছিল। ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে মাকে সেখানে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। মা অনেক কষ্টে বেরিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেননি। বোনকে নিয়ে পুড়ে মরেছেন। পরেরদিন সবার লাশ গোসল ছাড়াই দাফন করা হয়। রাতেই তিন ভাইও বাড়ি আসেন। বিহারীদের আক্রমণের সময় তাদের আরেক বোন চন্দ ভানুও অন্য জায়গায় চলে যান। তিনিও রাতে বাড়ি আসেন।
ওমর আলীর পরিবারের সাতজনসহ ছাব্বিশা গ্রামের ৩২ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একইদিনে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে খুঁজে খুঁজে সাধারণ মানুষদের বের করে গুলি করে হত্যা করে। অনেকের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। হত্যাযজ্ঞ শেষে জ্বালিয়ে দেয়া হয় পুরো বাড়ি-ঘর। কিছু বাড়ি ছাড়া পুরো গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পডিরণত হয়। ওমর আলীর পরিবারের সাতজন ছাড়া ছাব্বিশা গ্রামে নিহত বাকিরা হলেনÑ মনির উদ্দিন, সেকান্দার আলী, বিশা ম-ল, শমসের আলী, মছিরন নেসা, আয়নাল হক, হাফিজ উদ্দিন, দানেছ আলী, তাছেন আলী, হায়দার আলী, রমজান আলী, কোরবান আলী, মাহমুদ আলী, আবুল হোসেন, ইউসুফ আলী, শফিকুল ইসলাম, মোতালেব হোসেন, ইয়াকুব আলী, শুকুর মাহমুদ ম-ল, বাহাজ উদ্দিন ম-ল, আবদুল গফুর ম-ল, রাবেয়া খাতুন, জহির উদ্দিন, সোনা উল্যাহ, ছায়েদ আলী।
ওমর আলীর পরিবারের সাতজন মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হলেও তার পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কেউ সরকারি কোন সাহায্য, সহযোগিতা পাচ্ছে না। ওমর আলীর ছেলে ছানোয়ার হোসেন বলেন, নিহতদের নাম শুধু গণহত্যার তালিকায় লিখে রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাবার নাম লেখা হয় নাই। অথচ বাবা বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। তাদের বাড়িতে খাবার দিয়েছেন। বাড়ির পাশে খালের কাছে মুক্তিবাহিনী থাকতো। বাবা মারা যাওয়ার আগের রাতেও ডিম রান্না করে তাদের দিয়ে আসেন।
এ ব্যাপারে ভুঞাপুর উপজেলা মুক্তযোদ্ধা কমান্ডার এমএ মজিদ মিয়া বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য, সহযোগিতা করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত নন। সরকার চাইলেই কেবল ওমর আলীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যাবে। ছাব্বিশা গ্রামে গণহত্যা হয়েছে। গণহত্যা সম্পর্কে সরকারি কোন নিদের্শনা নেই।
ছাব্বিশা গ্রামের গণহত্যা সম্পর্কে ভূঞাপুর মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা পরিষদের সভাপতি ও ’৭১ এর কম্পানী কমান্ডার খন্দকার হাবিবুর রহমান বলেন, ভূঞাপুর আক্রমণ করার জন্য পাকিস্তানী বাহিনী গোবিন্দাসী ঘাট দিয়ে প্রবেশ করছিল। কাছাকাছি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান। তারা পিছু নিয়ে ছাব্বিশা গ্রামে চলে যায়। সেখানে পাকিস্তানীদের উপর আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু সংখ্যায় কম হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা টিকতে পারেনি। পরে পাকিস্তানী বাহিনী গ্রামে ঢুকে যাকে যেখানে পেয়েছে গুলি করে হত্যা করেছে। অনেকের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। এক ঘন্টার মধ্যে নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তারা গ্রাম থেকে চলে যায়।

ব্রেকিং নিউজঃ