মির্জাপুর হাসপাতালে রোগীরা রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের হাতে ‘জিম্মি’

94

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতাল এবং উপজেলার ৩১ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ (প্রতিনিধি) চক্রের হাতে জিম্মি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনেও তাদের দেখা যায়।

ভুক্তভোগী রোগীরা অভিযোগ করে টিনিউজকে বলেন, রিপ্রেজেন্টেটিভদের অত্যাচারে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে রোগীদের গোপনীয়তা রক্ষা হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ (প্রতিনিধি) চক্রের সদস্যদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়তে থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা বিব্রত বোধ করছেন। কুমুদিনী হাসপাতাল এবং উপজেলা ৩১ শয্যাবিশিষ্ট্য সরকারি হাসপাতাল (স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) ঘুরে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে।

উপজেলা সদরের কুমুদিনী হাসপাতালের বর্হিবিভাগ ও জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই দলের সদস্য সংখ্যা কমপক্ষে ৮০-৯০ জন। তাদের হাতে ও কাঁধে ব্যাগ ঝুঁলানো, ব্রিফকেস এবং চিকিৎসকদের জন্য আনা নানা উপহার সামগ্রী। কুমুদিনী হাসপাতালের এক শ্রেণীর চিকিৎসক তাদের নিকট থেকে নিয়মিত মাসোহারা ও উপহার সামগ্রী নিয়ে নিম্নমানের ওষুধ লিখে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

কুমুদিনী হাসপাতালে মহিলা বিভাগের (মেডিসিন বিভাগে) চিকিৎসা নিতে আসা এক কলেজ ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে টিনিউজকে বলেন, তিনি শারীরিক সমস্যা নিয়ে এই হাসপাতালে পর পর কয়েক দিন চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। চিকিৎসকের চেম্বার থেকে রাস্তায় বের হতেই ১০-১২ জনের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রেসক্রিপশন (চিকিৎসাপত্র) নিয়ে ছবি তুলে তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। তিনি বিব্রত ও ভয় পেয়ে যান।

কুমুদিনী হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের উত্তর পাশ মা মেডিক্যাল হল পর্যন্ত আসতে তিনি ৪-৫টি গ্রুপের কাছে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হন বলে অভিযোগ করেন। শুধু ওই কলেজছাত্রই নন, তার অন্তত ১০ রোগী ও তাদের স্বজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের হাতে নাজেহাল হওয়ার অভিযোগ এই প্রতিনিধির কাছে তুলে ধরেন।

এ ব্যাপারে কুমুদিনী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এ বি এম আলী হাসান টিনিউজকে বলেন, কুমুদিনী হাসপাতাল চিকিৎসা সেবার জন্য একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা উন্নত মানের সেবা পেয়ে থাকেন। হাসপাতালের ভেতরে কোনো ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ (প্রতিনিধি) আসার সুযোগ নেই। প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার পর এবং রবিবার দুপুর ২টার পর প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বল্প সময়ের জন্য দেখা করতে পারেন। এর বাইরে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

একইভাবে উপজেলার সরকারি চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসা ৩১ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালে (স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) গিয়ে দেখা গেছে, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের আনাগোনা। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে শাহ-আলম (৩০) এবং ফরিদা বেগমসহ (৫০) আটজন রোগী অভিযোগ করে বলেন, এক শ্রেণীর দালাল এবং বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ সিন্ডিকেট চক্রের কাছে জিম্মি। দালাল ও রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের মধ্যে রয়েছে দহরম মহরম সম্পর্ক। ব্যবস্থাপত্র দেখলেই তাদের নানাভাবে ছবি তোলা এবং ব্যবস্থাপনা পত্র না দেখালে হতে হয় নাজেহাল। দীর্ঘ দিন ধরে এই হাসপাতালে অব্যস্থাপনা চলে আসলেও নেই কোনো প্রতিকার। এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তারা জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে কুমুদিনী হাসপাতাল এবং সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১২ জন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা টিনিউজকে বলেন, আমরা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি। কোম্পানির নির্দেশনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করে ভিজিট করি এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলি। বিভিন্ন অভিযোগ তারা অস্বীকার করেন।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, দালাল চক্র, ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিদের উৎপাত। জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের কক্ষে ৪০-৫০ জন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রতিনিধি নিয়মিত ভিড় করছেন। এর বিনিময়ে কতিপয় চিকিৎসকরা পান মোটা অংকের কমিশন এবং নানা উপহারসামগ্রী বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফরিদুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে কোনো অবস্থায় বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ আসার সুযোগ নেই। অফিস সময়ের বাইরে রবি ও বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটার পর রিপ্রেজেন্টেটিভরা অল্প সময়ের জন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। তবে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নে বিব্রত করা বে-আইনী ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধির জন্য তিনি সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ