মির্জাপুরে হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ

134

image_827_239121মির্জাপুর সংবাদদাতাঃ
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে। কোন কোন বিদ্যালয়ে ৪৫০০ থেকে ৬৫০০ টাকা নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে দরিদ্র ছাত্র ছাত্রীরা ফরম পূরণে বিপাকে পড়ছেন বলে জানা গেছে। মির্জাপুর উপজেলার উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন টাকা নেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ফরম পূরণের সময় অতিরিক্ত টাকা না নিতে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। যা বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সকল বিদ্যালয়ে সতর্কীকরণ নির্দেশনাও দিয়েছেন। কিন্তু হাইকোর্টের নির্দেশ তোয়াক্কা না করে এ উপজেলার ৫১টি বিদ্যালয়ে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ফরম পূরণের জন্য বোর্ড হতে ১৪২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন অজুহাতেই এর বাইরে অতিরিক্ত কোন টাকা নেয়া যাবে না বলে হাইকোর্টের নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু মির্জাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ মিটিং করে বিশেষ ক্লাসের (কোচিং ফির) নামে ৩৬০০ টাকা ও জামানতের নামে ৫০০ টাকাসহ ৪৫০০ টাকা পর্যন্ত নেয়ার কথা সকল স্কুলের প্রধানকে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে এর বাইরেও কোন কোন স্কুলে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার মৈশামূড়া বসন্ত কুমারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬৪০০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। ওই স্কুলের কোন অভিভাবককে ফরম পূরণের জন্য বিদ্যালয়ে আসাতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন আল মামুন জানান, তার বিদ্যালয়ে নিয়মিত ১৬০ শির্ক্ষার্থী ও রেফার্ড ১৮জন শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে নিয়মিত ১২৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়া ১৮জন রেফার্ড পরীক্ষার্থী রয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে ওই বিদ্যালয়ে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ছয় হাজার ৪শ টাকা নিয়ে ফরম পূরণের সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই বিদ্যালয়টিতে গত বুধবার শিক্ষকরা ফরম পূরণের জন্য ৩ দিনের সময় দিয়ে শিক্ষার্থীদের নোটিশ দেন। ওই নোটিশে ফরম পূরণের বিষয়ে কোন অভিভাবককে বিদ্যালয়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে বলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন।
মৈশামুড়া বি.কে উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের ছাত্র উত্তম চন্দ্র সরকার বলেন, সহকারি প্রধান শিক্ষক তাকে জানিয়েছে টেস্ট পরীক্ষায় এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছি। তবে কোন বিষয়ে তা না বলে ফরম পুরণে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত এক হাজার টাকাসহ ৬৪০০ টাকা নিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
একই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান তুষার জানান, সে দ্ররিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তার কাছ থেকে ৪৫০০ টাকা নেয়া হয়েছে।
মৈশামুড়া বি.কে উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী সাদিয়া সুলতানার বাবা শহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, তিনি পুলিশে চাকুরী করেন। এ কারণে তার স্ত্রীর কাছ থেকে মেয়ের ফরম পুরণে ৩৫০০ টাকা নিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অতিরিক্ত টাকা নিয়ে তরিঘড়ি সকল শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ শেষ করেছেন ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বোর্ড-ফি সহ ফরম পূরণের জন্য প্রায় সাত লাখ টাকা আদায় করেছেন বলে বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন। ফরম পূরণের জন্য যাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে তাদের কাউকে রশিদ দেয়া হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি জানান, বোর্ডের-ফি জমা দিয়ে রশিদ কেটে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছে দেয়া হবে। পরে অবশিষ্ট টাকা পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যয় করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মৈশামুড়া বি,কে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন আল মামুন বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাসুদুর রহমানের নির্দেশেই প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিশেষ ক্লাশ (প্রতি বিষয়ে ১৫০ টাকা করে ১২ বিষয়ে) বাবদ ৩৬০০ টাকা, ফরম পুরণের জন্য ১৫০০ টাকা ও তিন মাসের স্কুলের বেতন ৩০০ টাকাসহ ৫৪০০ টাকা নেয়া হয়েছে।
এছাড়া উপজেলার বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয়, ভাদগ্রাম কে আর এস ইনস্টিটিউশন, সদরের সদয় কৃষ্ণ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হাট ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়, মহেড়া আনন্দ উচ্চ বিদ্যালয়, রশিদ দেওহাটা উচ্চ বিদ্যালয়সহ উপজেলার ৫১টি বিদ্যালয়ে ফরম পুরণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একইভাবে টাকা নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সদরের সদয় কৃষ্ণ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র তাওহীদের কাছ থেকে এক বিষয়ে ফরম পুরণের জন্য ১৩শ’ টাকা নেয়া ও ছাত্রদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম খান স্বীকার করেন।
বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছোরহাব হোসেন বলেন, তার বিদ্যালয় হতে ১৩১ জন নিয়মিত ও ৪৮ জন শিক্ষার্থী রেফার্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাসুদুর রহমানের নির্দেশে বিশেষ ক্লাসের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বরাটি নরদানা বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ভাদগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন সিদ্দিকী বলেন, বিশেষ ক্লাস, মিলাদ, সেশন, বেতনসহ প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৪৫০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মির্জাপুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাসুদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দুই মাসের বিশেষ ক্লাসের জন্য প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩৬০০ টাকাসহ ফরম পুরণের টাকা নেয়ার জন্য প্রধান শিক্ষকদের বলা হয়েছে বলে জানান।
মির্জাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাকির হোসেন মোল্লার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোন অজুহাতে শিক্ষকরা ফরম পুরণে অতিরিক্ত টাকা নিতে পারবে না। হাইকোর্টের নির্দেশনা প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারপরও শিক্ষকরা অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা পরিষদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ব্রেকিং নিউজঃ