মাস্কে ঢাকা মুখ ॥ করোনায় বদলে যাওয়া জীবন

16

জাহিদ হাসান ॥
জীবন এত কী করে বদলে যায়? প্রতিদিনের চেনা রুটিন তছনছ হয়ে গেছে। জরুরী কাজ। পরিকল্পনা। ভেস্তে গেছে সব। অহর্নিশ ছোটাছুটি করা বহু মানুষ এখন ঘরবন্দী। জীবিকার প্রয়োজনে যারা বাইরে বের হচ্ছেন, হতে হচ্ছে তারাও স্বস্তিতে নেই। কাজে যেটুকু মনোযোগ, তারও বেশি ভাবতে হচ্ছে নিজের সুরক্ষা নিয়ে।
ইতোমধ্যে প্রতিদিনের জীবন ঢেলে সাজিয়েছে টাঙ্গাইলের মানুষ। পোশাক-আশাকে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সুরক্ষা সামগ্রীতে মুখ নাক ঢাকা। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পরস্পরকে সামান্যই চিনতে পারছেন। এভাবে ঘরে এবং জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষের জীবন আমূল বদলে গেছে। অদ্ভুত এই বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে নোভেল করোনা ভাইরাস। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ আজ আক্রান্ত। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ভাল নেই বাংলাদেশও। ভাল নেই টাঙ্গাইলের মানুষও। সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে। দেশে প্রথম করোনা রোগীর সন্ধান মিলেছিল গত (৮ মার্চ)। এরপর থেকেই ঘরে ঢুকতে শুরু করে মানুষ। গত (২৬ মার্চ) থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। কয়েক দফায় সে ছুটি বাড়ানো হয়। অঘোষিত লকডাউনের ফলে টাঙ্গাইলের ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকেই বদলাতে থাকে জীবনযাত্রা। বর্তমানে সীমিত পরিসরে সবকিছু খুলে দেয়া হলেও, আগের সেই ছন্দ নেই। বরং একেবারেই ভিন্ন ছবি। বিচিত্রও বটে।
এখন যারা জীবিকার প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছেন তাদের কারও চেহারা পুরোপুরি দেখা যায় না। নাক, মুখ মাস্কে ঢাকা। কিছুদিন আগেও একটি করে মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এখন অনেকে একসঙ্গে দুটি মাস্ক ব্যবহার করছেন। চোখ, মুখ তাই ইটচাপা ঘাসের মতো। স্যাঁতস্যাঁতে। তদুপরি নাকের ওপর চেপে বসেছে ইয়া বড় গ্লাস। সেফটি গ্লাস নাক থেকে কপাল পর্যন্ত কামড়ে ধরছে। এতে কিছু ভেদ করে মূল ব্যক্তিটিকে চিনে নেয়া সহজ কাজ নয়। চোখ মুখের মতো হাতও গ্লাভসের ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা অপারেশন থিয়েটারে যে সার্জিক্যাল গ্লাভস ব্যবহার করেন, সেটি পরে রাস্তায় হাঁটছে সাধারণ মানুষ। এমন দৃশ্য করোনাপূর্ব পৃথিবীতে কেউ দেখেনি। আর যাদের হাত খোলা তারা কিছুক্ষণ পর পর পকেট থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের শিশি বের করছেন। কয়েক ফোঁটা তরল তালুতে ঢেলে নিয়ে ভাল করে ঘষছেন। সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া আরও বেশি কার্যকর। এ অভ্যাস আগেও কিছুটা ছিল। এখন ঘরে ঘরে। দিনে কতবার হাত ধোয়া হচ্ছে তার কোন হিসাব নেই। বার বার সাবান দিয়ে ধোয়ায় হাত যারপরনাই খসখসে।
এখন মাথাও অপারেশ থিয়েটারের সেই টুপিটা দিয়ে ঢাকা। আরও বেশি অবাক হতে হয় কামানো মাথা দেখে। সেলুনে গেলে সংক্রমিত হওয়ার ভয়। তাই ঘরে বসেই চলছে ন্যাড়া হওয়া। এত যত্নের চুল। ঠিক মতো কেটে ছেটে রাখা যাচ্ছে না। তাই এমন কামিয়ে ফেলা। এ কারণেও চেনা মানুষটিকে অচেনা ঠেকছে। সবচেয়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে পিপিই পরে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষগুলোকে। পলিথিন সদৃশ্য বিশাল ব্যাগে নিজেকে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে চেইনটা টেনে দেয়া হচ্ছে। আগা-গোড়া মোড়ানো মানুষ এ অবস্থায় হাঁটতে চলতে অভ্যস্থ হয়েছে। মানুষের চলাচলেও পরিবর্তন এসেছে। বেড়েছে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার। বাইসাইকেল চোখে পড়ছে খুব। বিভিন্ন পরিবহনেও অতিরিক্ত যাত্রী বা গায়ে গা লাগা ভিড় নেই। অধিকাংশ আসন ফাঁকা। ওঠার আগে যাত্রীদের হাতে স্প্রে করা হচ্ছে সাবান পানি।
টাঙ্গাইল শহরের বেবিস্টান্ডে সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় ওঠার আগে যাত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে সিটে সাবান পানি স্প্রে করছিলেন। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে বোতল বের করে আশপাশ জীবাণুমুক্ত করতে দেখা যায় তাকে। এ বিষয়ে জানতে তার কিছুটা কাছে এগিয়ে যেতেই হাত উঁচু করে থামিয়ে দেন। দূর থেকে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। হুমায়ুন নামের এই প্রবীণ ব্যক্তি টিনিউজকে বলেন, আমার অনেক বয়স হয়েছে। কারও বোঝা বাড়াতে চাই না। তাই সুরক্ষিত থাকার চেষ্টা করছি। বিশেষ কাজে দুই মাস পর বাসার বাইরে বের হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অটোরিক্সায় প্রতিদিন কত যাত্রী ওঠে। করোনা রোগী যে উঠেনি, তা তো বলা যায় না। এ কারণে অল্প কিছুক্ষণের জন্য বসলেও, অটোরিক্সার সিটে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে নিলাম। বাইরে বের হলে জীবাণুনাশকের এই বোতল সঙ্গে রাখেন বলে জানান তিনি।
এদিকে, যারা ঘরে আছেন তাদের প্রতিদিনের জীবনও যথেষ্ট পাল্টে গেছে। দিন রাতের হিসাব নেই। ঘুম খাওয়ার সময় ঠিক থাকছে না। পরিবার পরিজনের সঙ্গে বেশি সময় থাকা যাচ্ছে, এই একমাত্র পাওয়া। বাকি সময় এ-ঘর ও-ঘর করে কাটাতে হচ্ছে। বারান্দায় চেয়ার পাতা। চেয়ারে বসে শুকনো চোখে বাইরের পানে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। পায়চারী করে সময় কাটাতে হচ্ছে। সবার ছাদে যাওয়ার অনুমতি নেই। তাই আকাশটাও ঠিক মতো দেখতে পারছেন না। মনে ভর করছে হতাশা। বাসায় বসে অফিস করা লোকের সংখ্যাও কম নয় এখন। হোম অফিস কথাটি সবার মুখে মুখে। লিভিং রুমের এক কোনে টেবিল পাতা হয়েছে। তার ওপর ল্যাপটপ। কাজ হচ্ছে ইন্টারনেটে। তাদেরই একজন মোকারম হোসেন। একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ অফিসে কাজ করেন। করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে হোম-অফিস করছেন। অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসার ডাইনিং টেবিলে ল্যাপটপ পেতে কাজ করছি আমি। সকালে একদফা কাজ করি। দুপুরে খাওয়ার পর আরেক দফা। ভিডিও কল ও অনলাইন ডেটিং এ্যাপ ব্যবহার করে মিটিং ইত্যাদি করছি। নতুন এই অফিস মন্দ লাগছে না বলে মত দেন তিনি।
অবশ্য এত সতর্কতার পরও কোন কোন ঘরে ঢুকে পড়ছে করোনা। করোনার উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। আর তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ঘরের ভেতরে আরও ঘর তৈরি করে নিতে হচ্ছে। পরিবারের সবার থেকে আলাদা হতে হচ্ছে আক্রান্তকে। এক ঘরে করোনা আক্রান্ত বাবা। পাশের ঘরে স্ত্রী সন্তান। এর চেয়ে ভয়ানক আর কী হতে পারে? সব মিলিয়ে আমূল বদলে যাওয়া জীবন। এ জীবন থেকে ফেরাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আদৌ কি চ্যালেঞ্জে জিতবে মানুষ? নাকি বদলে যাওয়া জীবনটাই স্থায়ী হবে? সময়ই দিতে পারে উত্তর। সে পর্যন্ত শুধুই অপেক্ষা।

ব্রেকিং নিউজঃ