মধুপুরে বিষযুক্ত আনারস হলেও চাহিদা এখন আকাশচুম্বি

278

মোজাম্মেল হক ॥
মধুপুর কিংবা গারো বাজারে এখন আর বিষমুক্ত আনারস পাওয়া যায় না। তারপরও এবার আনারসের চাহিদা প্রচুর। তিনি দীর্ঘদিন যাবত আনারস চাষ করে লাভবান হয়েছি। তবে অন্যবারের তুলনায় এবার লাভের পরিমাণ বেশী। করোনাকালে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি রোগ নিরাময়ে আনারস খুবই উপকারী। তাই কেমিক্যালযুক্ত আনারসও রয়েছে বিপুল চাহিদা। গারো বাজারের কৃষক হিসাব আলী এমন কথাই টিনিউজকে বলেন। তিনি আরও বলেন, আমি দু’একর জমিতে প্রায় দুই লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে ১৮ মাস পরিশ্রম করে ৫ লক্ষ টাকা লাভবান হয়েছি। এছাড়া জমিতে এখনও ২৫ শতাংশ আনারস মজুত রয়েছে।
গারো বাজারের অপর আনারস চাষী আব্দুস সাত্তার মইষামারা গ্রামে প্রায় ৪ একর জমিতে আনারস চাষ করে লাভবান হয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনও পরিপূর্ন হিসাব করেনি তাই কত লাভ সেটা বলতে পারেনি। গারো বাজারের ব্রাজিল ভিলা বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, গারো বাজারের ৯৮ ভাগ অধিবাসীরা আনারস চাষ করে থাকে। আনারস চাষ করে তারা সবাই আর্থিক স্বচ্ছলতা এনেছেন।
করোনাকালে আনারসে চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় তার মতো এবার ১০ হাজার আনারস চাষীর মুখে ফুটেছে। ভাল দাম পেয়ে আনারস চাষে আগ্রহ বাড়ছে চাষীদের। আনারস চাষ ও ব্যবসার সাথে জড়িতদের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, আনারস চাষি এবং আনারসের পাইকারি ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। মধুপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার একর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ৫০ একর বেশি। প্রতি একরে গড়ে ১৩ হাজার করে আনারস উৎপাদন হয়। মধুপুর এবং পাশ্ববর্তী এসব উপজেলায় উৎপাদিত আনারস মধুপুরের জলছত্র এবং গারো বাজার পাইকারী হাটের মাধ্যমে বিপনন হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলায় হানি কুইন্ট ও জায়ান্ট জাতের আনারস চাষ হয়। গত বছর ৭ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছিলো। এ বছর ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ করা হয়েছে। সরেজমিন ওই হাট দু’টিতে গিয়ে কথা হয় আনারস বিক্রি করতে আসা চাষী ও ব্যবসায়ীদের সাথে। তারা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি দামে আনারস বিক্রি হচ্ছে। এ বছর মানভেদে প্রতিটি আনারস ২৫ থেকে ৬৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর মানভেদে আনারস বিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে। গারো বাজার হাটের আনারসের পাইকারী ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান টিনিউজকে বলেন, গত জুন মাস থেকে আনারস উঠতে শুরু করেছে। চলবে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষীরা গারো বাজার এবং জলছত্র হাটে এনে প্রতিদিন আনারস বিক্রি করছেন। পাইকাররা কৃষকের কাছ থেকে কিনে ট্রাক ভরে পাঠাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। বাজারে আলোচনা করে জানা যায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার আনারস এই বাজারে বিভিন্ন ভাবে বিক্রি হয়। ঢাকাসহ সারাদেশে ট্রাক, পিকআপ কিংবা সিএনজিতে আনারসের চালান হয়। তবে আনারস চাষীরা সাইকেল, ঘোড়াবাড়ী, ইজিবাইক কিংবা ভ্যানে আনারস বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। সাইকেলে আনলে ১০০ আনারস আনতে পারে। যা প্রাইকারী রেটে বাজারে ২২ থেকে ২৮শ’ টাকা দাম হয়। সাইকেলে আনারস এনে দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত ৫টি খ্যাপ মারতে পারে। সেক্ষেত্রে দিনে ১০ হাজার টাকার আনারস কৃষকরা বিক্রি করতে পারে। প্রতিদিন সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাজার বসে। তবে রবি ও বুধবারে গারো বাজারে হাট বিশাল আকৃতির হয়। অন্যবারের চেয়ে এবার আনারসে চাহিদা অনেক বেশি। তাই হাট দুটো জমজমাট। আনারস চাষী, ক্রেতা, বিক্রেতাসহ এর সাথে জড়িত সবাই খুব খুশি। মধুপুর উপজেলা সদরের হিরু মিয়া টিনিউজকে বলেন, করোনাকালে কলা বা অন্য সবজি আবাদ করে তেমন লাভবান হওয়া যায়নি। তবে আনারস চাষ করে এবার ভাল দাম পাওয়া যাচ্ছে। এতে অন্য ফসল আবাদ করে কাঙ্খিত দাম না পেলেও আনারসের দাম পেয়ে পুষিয়ে যাচ্ছে।
বিষমুক্ত আনারস কেন পাওয়া যায় না সর্ম্পকে গারোবাজার ঘুরে চাষীরা জানায়, বিষমুক্ত আনারস আকারে অনেক ছোট। আর এর রঙ দেখে ক্রেতারা কিনতে চাষ না। এ আনারস বাগান থেকে কেটে দুই-তিনদিনের বেশী রাখা যায় না, পচে য়ায়। কিন্তু ফরমালিনযুক্ত আনারস সাত/আটদিন রাখা যায়। আর অন্যান্য রাসায়নিক দিলে আনারসে আকারও অনেক বড় হয়, আবার রং গাঢ হলুদ হয়। ফলে সহজেই সাধারণ ক্রেতারা আকৃষ্ট হয়। এতে ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কোনো অসুবিধা হয় না। লাভ অনেক বেশী। তাই বাধ্য হয়ে বেশীর কৃষক আনারসে ফরমালিন ও ইথোফন স্প্রে করেন। তবে আনারসে আসল স্বাদ আর গন্ধ এখানে খুঁেজ পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে মধুপুর উপজেলার গারোবাজারে সবচেয়ে বেশী আনারসের চাষ হয়। এছাড়া অরণখোলা, জলছত্র, মোটের বাজার, রসুলপুর, ইদিলপুর, আউশনাড়া, ষোলাকৃড়ি, পঁচিশ মাইল, মইষামারা অঞ্চলে প্রচুর আনারস চাষ হয়। এই আনারস রোপন করার পর ধীরে ধীরে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগে আনারস পরিপূর্ন হতে। মধুপুরের আনারসের বড় বাজার গারোবাজার। মধুপুরে আনারস আবাদের ইতিহাস খুব বেশী পুরনো নয়। গড় (উঁচু) এলাকার আউশনারা ইউনিয়নের ভেরেনা সাংমা ষাটের দশকের শেষ দিকে গিয়েছিলেন ভারতের মেঘালয়ে। সেখানে প্রচুর আনারস চাষ হয়। তিনি কয়েকটি জায়ান্টকিউ জাতের আনারসের চারা নিয়ে আসেন। মধুপুর গড়ে নিয়ে এসে রোপণ করেন। প্রথমবারেই ভালো ফলন হয়। খেতেও সুস্বাদু ছিল। পরে আরো বেশী জমিতে আবাদ করেন। তার দেখাদেখি অন্যরাও আবাদ করতে থাকলে মধুপুর হয়ে বাংলাদেশের আনারসের একমাত্র স্বর্গ। আনারস আবাদ করে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেন।
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান টিনিউজকে জানান, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় আনারসের ফলন ভাল হয়েছে। আর বাজারে আনারসের চাহিদা রয়েছে প্রচুর। তাই চাষিরা ভাল দাম পাচ্ছে। এতে আনারস চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ