বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর 24, 2020
Home এক্সক্লুসিভ মধুপুরে বিউটিশিয়ানরা বর্তমানে দিনমজুরি করছেন

মধুপুরে বিউটিশিয়ানরা বর্তমানে দিনমজুরি করছেন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
পার্লারে বিভিন্ন প্রসাধনী দিয়ে রুপের সৌন্দর্য বর্ধন বা মুখ সাজানো ছিল বিউটিশিয়ানদের কাজ। কিন্তু তারা কখনো কি ভেবেছিল মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে তারা কর্মহীন হয়ে পড়বে। তাদের গ্রামে ফিরে গিয়ে মাঠে দিনমজুরের কাজ করতে হবে। আর সেই দিনমজুরের টাকায় সংসার চলবে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়েনের ৪০ গ্রামকে বিউটিশিয়ানের গ্রাম বলেই পরিচিত সবার কাছে। এপারে পীরগাছা। ওপারে চুনিয়া। মাঝে ক্ষীরু নদী। ব্রিজ পেরিয়ে কাঁচা সড়ক ঢুকেছে পাহাড়ি গ্রাম চুনিয়ায়। হাজারও বৃক্ষলতায় ছাওয়া গ্রামে সারি সারি মাটির ঘর। তাতেই বসবাস গারোদের। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার এ গ্রাম বিউটিশিয়ানের গ্রাম বলে পরিচিত। গ্রামের রুবিনা রেমা ও বিউটি মৃ আগেই অভাব অনটনে স্কুল ছাড়েন। চাকরি নেন ঢাকার এক বিউটি পার্লারে। তাও প্রায় বিশ বছর। বিগত ২০১১ সালে চাকরি ছেড়ে দুই জনে ঢাকার ফার্মগেটে দেন ফিমেল বিউটি পার্লার। গ্রামের চার দরিদ্র গারো মেয়েও চাকরি পায়। মার্চের প্রথমে পশ্চিম রাজাবাজারে অফিস স্থানান্তর করেন। হাতের সম্বল ৬০ হাজার টাকা দেন অ্যাডভান্স। শুরু হয় করোনার তাণ্ডব। গত (২২ মার্চ) আসেন গ্রামে। হাতের টাকা শেষ। কবে পার্লার খোলা যাবে জানা নেই। বাড়ি ভিটে ছাড়া জমি নেই। পেটের তাগিদে তাই দিনমজুরি করছেন। একই গ্রামের থানছি মৃ। গরীব নানা-নানির কাছে মানুষ। অভাবী সংসারের হাল ধরতে সাত বছর আগে বিউটিশিয়ানের কাজ জোগান। গত (১৫ মার্চ) পার্লার বন্ধ হয়। মাস শেষ না হওয়ায় বেতনটা পাননি। শূন্য হাতে বাড়ি ফেরেন থানছি।
চুনিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, থানছি মৃ, রুবিনা রেমা, জবা আডেং, বিউটি মৃ, জিতি পাতাংসহ ছয় বিউটিশিয়ান কলা ও আনারস বাগানে কাজ করছেন। ভুটিয়া গ্রামের লিমা ম্রং, অর্পনা সাংমা, ইতি চিশিম, রুপালি চিশিম আনারস বাগান নিড়াচ্ছেন। কাকড়াগুনি গ্রামে বোরো ধান কাটছেন প্রিয়া নকরেক, অর্চনা নকরেক ও শবনম চিরান। কলাবাগান মালিক জুলহাসউদ্দীন টিনিউজকে জানান, পাহাড়ের চল্লিশ গ্রামের কয়েক হাজার পার্লার ও গার্মেন্টস কর্মী বাড়ি ফিরেছেন। প্রচণ্ড খরতাপে বৃষ্টিতে ভিজে পুরুষ শ্রমিকরাই যেখানে গলদঘর্ম, সেখানে নারী শ্রমিক তাও আবার বিউটিশিয়ান কতোটা খরতাপে পুড়তে পারেন বুঝে নিন। তাই এদের মজুরি ২০০/২৫০-এর বেশি নয়। থানছি মৃ আর রেবা আড়েং টিনিউজকে জানান, এসিরুমে সারাদিন দুই হাতে কৌণিক স্প্রে ও ড্রেসার, ব্লাশন আর সফট ব্রাশে ফেসিয়াল, হেয়ার ড্রেসিং ও রিবন্ডিং মেকআপে মানবীকে অপ্সরীর মতো সাজাই। সেই নরম হাতে এখন কোদাল, কাস্তে ও ছেনি। পেটের ক্ষুধা যখন নড়েচড়ে বসে তখন আর দশ জন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতোই রোদে পুড়ে কাঁচা সোনা নয়, তামাটে হয়ে বাঁচার লড়াই করি। করোনা প্রান্তজনের জীবিকাকে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। তিন মাসে ছয় কেজি চালডালের সরকারি ত্রাণ মিলেছে। সপ্তাহে চার দিনের বেশি কাজ মেলে না। পুরো সপ্তাহ কীভাবে চলে বুঝে নিন। আশপাশের বানুরিয়া, হাগড়াকুড়ি, থানারবাইদ, ভুটিয়া, ধরাটি, জাঙ্গালিয়া, গাছাবাড়ী ও বেড়িবাইদসহ পাহাড়ের সহস্রাধিক গারো বিউটিশিয়ানের একই হাল। ইদিলপুর গ্রামের মৌ চাম্বুগং এবং ধরাটি গ্রামের মাধুরি দালবৎ জমিজমা ও বাড়ি ভিটের একাংশ বেচে ছোটোখাটো পার্লার দিয়েছিলেন। করোনায় তারা পথে বসেছেন। অফিস ও বাসা ভাড়ার বকেয়া জমছে।
করোনায় কর্ম হারিয়ে গ্রামে গিয়ে দিনমুজুরের কাজ করছে তারা। তবে নারী হওয়ায় তাদের কাজে না নেয়ার অভিযোগ আছে। ফলে বিউটি পার্লারে কর্মরত নারীরা কর্মহীন হয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছে। গ্রামের বিউটিশিয়ান দিতি, রিয়া, সুস্মিতাসহ অনেক মেয়েই অন্যের জমিতে কাজ করছে। তবে কেউই পেশাদার শ্রমিক নয়। করোনার আগে তারা সবাই ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন গ্রান্তের মানুষের সৌন্দর্য বা রুপ সাজানোর কারিগর ছিল। তারা সমাজের মূলস্রোত থেকে পিছিয়ে থাকা পশ্চাৎপদ পাহাড়ী এই জনপদের মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী। মাতৃতান্ত্রিক নিয়মে পরিপাটি করে বাড়িটি সাজিয়ে রাখার দায়িত্ব তার। তবে তার থেকেও গুরুদায়িত্ব বাড়ির সকলের মুখে খাবার তুলে দেয়া। অতীতে যাদের অধিকাংশের আয়ের উৎস ছিল দিন মুজুরী, বর্তমানে তাদের পরিবারের একাধিক সদস্য বেছে নিয়েছেন বিউটিশিয়ান পেশা। জমিতে কাজ করা বিউটিশিয়ানরা টিনিউজকে বলেন, করোনাকালে সেই স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের স্বপ্নে ছেদ ঘটিয়ে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চিত আগামীর পথে। পেশা বন্ধ থাকায় জীবন বাঁচিয়ে রাখা রীতিমত যুদ্ধ হলেও মানবিক সহায়তার হাত বাড়ায়নি কেউ।
বেসরকারী উন্নয়ন সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড হিউমেন ডেভেলপমেন্ট (সেড) এর হিসেব মতে, বিগত ২০১৮ সালের ৪৪টি গ্রামের জরিপে দেখা গেছে, মধুপুর এলাকায় ১৭ হাজার ৩২৭ জন গারো সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে ১১শ’ ৩১ জন নারী দেশের বিভিন্ন জেলায় বিউটিশিয়ান হিসেবে কাজ করছে। যা তাদের মোট জনসংখ্যার ৬.৮%।
গারো নারী সংগঠন আচিকমিচিক সোসাইটির সুলেখা ম্রং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা এবং অনটনে থাকা বিউটিশিয়ানদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের দাবি জানান। উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আকতার হোসেন টিনিউজকে বলেন, বিউটিশিয়ানরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। এখন পর্যন্ত তারা কোন সহযোগিতা পায়নি। মধুপুর আদিবাসী কল্যাণ ট্রাস্ট্রের ইউলিয়াম দাজেল টিনিউজকে বলেন, অপেশাদার শ্রমিক হওয়ায় কাজেও নিচ্ছে না মালিকপক্ষ। এজন্য কোন দিন ভাগ্যক্রমে কাজ জুটলেও অধিকাংশ দিনই অতিবাহিত করতে অনাহারে অর্ধাহারে।
মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরিফা জহুরা টিনিউজকে বলেন, নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির বিউটিশিয়ানে কাজ করা নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠীর কর্মহীনদের তালিকা প্রনয়নের কাজ চলছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম টিনিউজকে জানান, বিউশিয়ানদের দুরবস্থা নিরসনে সহায়তা করা হবে। এজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিদের্শনা দেয়া হয়েছে।

ব্রেকিং নিউজঃ