মধুপুরে বাসে ডাকাতি ও গণধর্ষণকারী চালককে গ্রেপ্তার ॥ নারীর ডাক্তারী পরীক্ষা সম্পন্ন

102

হাসান সিকদার ॥
কুষ্টিয়া থেকে নারায়নগঞ্জগামী ঈগল পরিবহনের নৈশকোচে ডাকাতি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় রাজা মিয়া (৩২) নামে বাসের চালককে গ্রেপ্তার করেছে টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) ভোরে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে লুন্ঠিত তিনটি মোবাইল তার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। সে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। তিনি টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। সে পেশায় টাঙ্গাইলের ঝটিকা পরিবহনের চালক। বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) দুপুরে পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার তার সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান।

এদিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়নগঞ্জগামী ঈগল পরিবহনের নৈশকোচে ডাকাতি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত বাস চালককে রাজা মিয়াকে (৩২) পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৫ম আদালতের বিচারক বাদল কুমার চন্দ এ আদেশ দেন।

টাঙ্গাইল আদালত পরিদর্শক তানবীর আহমেদ টিনিউজকে জানান, টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মুরাদ হাসান আসামী বাস চালক রাজা মিয়াকে (৩২) সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। পরে আদালত ওই আসামীকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুনের আদালতে ধর্ষিত ওই নারী ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

 

পুলিশ সুপার সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, রাজা মিয়া ডাকাতির সাথে জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। তবে ধর্ষণের সাথে তিনি জড়িত নন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। এছাড়াও সে পুলিশের কাছে ডাকাতির বিষয়ে আরও গুরুত্বপুর্ন তথ্য দিয়েছে। তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ কারনে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) দুপুরে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়।
এদিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ওই নারী টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি রয়েছেন। তিনি ওই দিনের ঘটনার বর্ননা দিয়ে জানান, তার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। সে নারায়নগঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তার প্রথম স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে। দ্বিতীয় স্বামীর সাথেও কোন যোগাযোগ নেই। প্রথম স্বামীর ঘরে এক সন্তান রয়েছে তার। এছাড়া ওই নারীর বাবা-মা নেই। ওই দিন রাতে তিনি একাই ঈগল পরিবহনের বাসে নারায়নগঞ্জ যাচ্ছিলেন। পেছনের দিকে তিনি এক সিটে একাই বসা ছিলেন। যাত্রীবেশে ডাকাত দল বাসে উঠে একজন তার পাশেই বসে। সবাইকে জিম্মি করে সবকিছু লুট করার পর তাকে ৫/৬ জন ধর্ষণ করে। সে বাঁধা দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা তার হাত সিটের সাথে বেঁেধ ফেলে। তার মুখ বাঁধে। এ সময় ডাকাতদল তারা তার উপর নির্মম পাশবিক যৌন নির্যাতন চালায়। তিনি প্রশাসনের কাছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।

বাসযাত্রী কয়েকজন টিনিউজকে বলেন, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসে রাত ১০টার দিকে নাটোরের বড়াই গ্রামের ফল ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান তরমুজ চত্তর থেকে বাসে ওঠেন। তিনি নাটোরের আমড়া, কাঁঠাল ও তাল ঢাকায় বিক্রি করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঈগল পরিবহণে অনেক দিন ধরে নিয়মিত যাতায়াত করেন। হাবিবুর রহমান টিনিউজকে আরও জানান, তারা বাসে ওঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাদের বাসটি সিরাজগঞ্জের কাছাকাছি ‘দিবারাত্রি’ হোটেলে রাতের খাবারের জন্য বিরতি দেয়। বাসের অনেকেই ওই হোটেলে খাবার খান। তিনিও ওই বাসের সুপারভাইজার রাব্বি ও সহযোগী দুলালের সাথে বসে খাবার খেয়েছেন। আগে যে চালক বাস চালাতেন তিনি ওইদিন বাসটি চালাচ্ছিলেন না। সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়ে আসার পর গেঞ্জি, শার্ট ও পিঠে ব্যাগ নিয়ে ১০-১২ জন যাত্রী বাসে ওঠেন। তারা বাসের খালি সিটগুলোতে বসে পড়েন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পাড় হওয়ার পর যাত্রীবেশে ওঠা ওই ডাকাত দলের সদস্যেরা অন্য ঘুমন্ত যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে একে একে বেঁধে ফেলে। একই সঙ্গে প্রত্যেক যাত্রীর চোখ ও মুখ বেঁধে জিম্মি করে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিজেরা নিয়ে নেয়। এমনকি শিশুদেরও একই কায়দায় তারা বেঁধে রাখে। পরে সব যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল, টাকা, গয়না লুট করে নেয়। পরে ডাকাতরা নারী যাত্রীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।

 

তিনি টিনিউজকে আরও জানান, তার পাশে বসা এক নারীকে তারা চার দফায় ধর্ষণ করেছে বলে তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন। তারা অসহায় ছিলেন- হাত, মুখ, চোখ বাঁধা ছিল। কিছুই করতে পারেন নি। টানা তিন ঘণ্টা তারা ওই বাসটিতে জিম্মি ছিলেন। বাসটি কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে- কোন যাত্রীই কিছু জানতেন না। দুর্ঘটনায় শিকার হওয়ার পর যাত্রীরা জানতে পারেন- তারা টাঙ্গাইলের মধুপুরের রক্তিপাড়া এলাকায় রয়েছেন। হাবিবুর রহমান টিনিউজকে জানান, স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করেছে। রক্তিপাড়া জামে মসজিদের ইমাম তাকে সকালে নাশতা করিয়েছেন।

বাসের নারী যাত্রী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার তারাগুনিয়া গ্রামের শিল্পী বেগম টিনিউজকে জানান, তিনি অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের সবাইকে হাত, মুখ, চোখ বেঁধে ডাকাতরা সব লুট করে নিয়েছে। তার স্বামী পিয়ার আলীকে ছুরি দিয়ে আঘাত করছে। তার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। ওই বাসে থাকা অন্য নারী যাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি।

বেসরকারি চাকুরিজীবী নারায়ণগঞ্জের আব্দুর রশিদ টিনিউজকে জানান, নাটোর থেকে অসুস্থ মাকে দেখার জন্য তিনি বাড়ি যাচ্ছিলেন। বেতনের ২২ হাজার ৮০০ টাকা তার সঙ্গে ছিল। এর মধ্যে ১০০ টাকা রেখে সব টাকাই ডাকাতরা নিয়ে গেছে।

এ ঘটনার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া থেকে ঈগল পরিবহণের ম্যানেজার আয়নাল হোসেন মধুপুরে যান। গাড়িটির চালক ও সহযোগীদের বরাত দিয়ে তিনি টিনিউজকে জানান, মির্জাপুরের পাকুল্যা এলাকার একটি ফাঁকা মাঠে বাস ঘুরিয়ে টাঙ্গাইলের দিকে নিয়ে নেওয়া হয়। পরে বাসটিকে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে মধুপুরের দিকে নেওয়া হয়।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের গাইনী বিভাগের প্রধান ডাক্তার রেহেনা পারভীন টিনিউজকে বলেন, বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) দুপুরে ওই নারীর ডাক্তারী পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

 

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার টিনিউজকে বলেন, বাসটিতে টিকিট কেটে ২৪ জন যাত্রী নিয়ে নারায়নগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। মঙ্গলবার (২ আগস্ট) রাতে বাসটি সিরাজগঞ্জের কাছাকাছি দিবারাত্রি হোটেলে নৈশভোজের জন্য যাত্রা বিরতি দেয়। পরে রাত দেড়টার দিকে আবার যাত্রা শুরু করে। সিরাজগঞ্জ সড়কের অনির্ধারিত স্থান থেকে প্রথমে ৪জন যাত্রী উঠেন। কিছু দূরে গিয়ে আরো তিনজন ওঠেন। তারপরে কড্ডার মোড় থেকে আরো তিনজন ওই বাসে উঠেন। তখন ওই বাসের সকল যাত্রী প্রায় ঘুমে ছিলেন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রীবেশে থাকা ডাকাত দল অস্ত্রের মুখে একে একে সব যাত্রীকে বেঁধে ফেলে। প্রত্যেক যাত্রীর চোখ ও মুখ বেঁধে চালককেও জিম্মি করে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তখন গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া বাসের চালককে উঠিয়ে নিজে নিয়ন্ত্রণ নেন। তারা সব যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল, টাকা, গহনা লুট করে নেয়। তারপর পেছনে বসা এক নারীকে তারা ৬ জনে মিলে গণধর্ষণ করে। গাড়িতে তখন আরো কয়েকজন নারী ছিলেন। তাদের সাথে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ছিল। হয়ত এ কারনেই তারা রক্ষা পেয়েছেন। বাসটি তারা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়ায় নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে তারা ঘুরিয়ে এলেঙ্গা হয়ে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া জামে মসজিদের সামনে ফেলে রেখে ডাকাত দল নেমে পালিয়ে যায়।

এ ঘটনায় বাসের যাত্রী কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার হেকমত আলী বাদি হয়ে বুধবার (৩ আগস্ট) রাতে ডাকাতি ও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জনকে আসামী করে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ সুপার টিনিউজকে আরো বলেন, রক্তিপাড়ার কাছেই ডাকাত দলের সদস্য রতনের মামার বাড়ি। আমরা জানতে পেরেছি, ডাকাত দল বাস থেকে নেমে রতনের মামার বাড়িতে যায়। তারপর সেখান থেকে তারা যার যার মতো চলে যায়। ডাকাত দলের সবাইকে আমরা চিহিৃত করতে পেরেছি। একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। আশা করছি খুব দ্রুতই অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ