মজনু একজন দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা

127

Tangail Comandar Pic- 09-12-15কাজল আর্য্য, কালিহাতীঃ
বহু ত্যাগ, তিতিক্ষা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা অর্জনে রয়েছে বিস্তর ইতিহাস। ’৫২ ভাষা আন্দোলন, ’৫৪ নির্বাচন, ’৬৬ ছয় দফা, ’৬৯ গণঅভ্যুথান এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা অর্জন। পশ্চিম পাকিস্তানীদের অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নিপিড়ন ও বৈষম্যে যখন পূর্ব পাকিস্থানীরা দিশেহারা তখন স্বাধীনতার নেশায় তারা হয়ে যান বিভোর। স্বাধীনতা নামের সেই কাঙ্খিত লাল সূর্যটি ছিনিয়ে আনতে এদেশের ছাত্র যুবক জনতাসহ সকল শ্রেণীপেশার মানুষ জীবনবাজি রেখে অংশ নেন মুক্তির সংগ্রামে।
১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক মূহুর্তে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তখনকার টগবগে যুবক মিজানুর রহমান মজনু। ১৯৫৪ সালের ২ জানুয়ারী টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে মিজানুর রহমান মজনু জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নওশের আলী সরকার ও মাতার নাম হালিমা বেগম। পরিবারের সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তিনি শুধু নিজেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। অন্যদের উৎসাহিত করে দলবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য পাড়ি জমান ভারতের তুড়া পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। সেখানে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি যোগ দেন দেলবর আনসারীর ৯নং আলফা কোম্পানীতে। তার কোম্পানীর সেকেন্ড ইন কমান্ড (টুআইসি) ছিলেন দেলদুয়ার উপজেলার খোরশেদ আলম ও প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সোহরাব হোসেন। ভারতীয় বিহার রেজিমেন্টের সাথে যুক্ত থাকা ৯নং আলফা কোম্পানী ১১নং সেক্টরের যাত্রাকোনা, চরবাঙ্গালী, হালুয়াঘাট, সর্চাপুর, তেলিখালী, ফুলপুর, তারাকান্দা, ময়মনসিংহ, সাভার, টঙ্গী ও ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এতে মিজানুর রহমান মজনুর ভুমিকাও অগ্রগণ্য।
একজন সাহসী ও তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন যোদ্ধা হিসেবে কোম্পানীতে তার বেশ সুনাম ছিল। তাদের ১১নং সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন প্রথমে কর্ণেল আবু তাহের পরবর্তীতে এম হামিদুল্লাহ। আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে ছিলেন ময়মনসিংহের রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্মরণীয় দিন মিজানুর রহমান মজনুর নিকট। এই দিনে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার চরবাঙ্গালী যুদ্ধে তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু তার সহযোদ্ধা টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঝিঁনাইচর গ্রামের আবু সাঈদ হানাদার বাহিনীর ছোড়া গুলিতে শাহাদৎ বরণ করেন। শহীদ আবু সাঈদের তাজা রক্তে মিজানুর রহমান মজনুর শরীর ভিজে রক্তাক্ত হয়েছিল। সে দৃশ্য আজও তার চোখে সুস্পষ্ট এবং তাকে কাঁদায়। শহীদ আবু সাঈদকে পার্শ্ববর্তী ধলা পানি গ্রামে কবর দেয়া হয়। শহীদ আবু সাঈদের করব বাধিয়ে স্মৃতিফলক তৈরী করার ক্ষেত্রেও মজনুর ভূমিকা অগ্রগণ্য। এই যুদ্ধে বাসাইল উপজেলা ইউনুস আলী, জীবন করিম, কালিহাতী উপজেলার আনোয়ার হোসেন খান, সদর উপজেলার আব্দুস সবুর নামের কয়েকজন সহযোদ্ধা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। এ ধরনের অনেক ভয়াবহ দৃশ্য ও সম্মুখ যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বাঙ্গালী জাতি যখন স্বাধীন ও স্বার্বভৌম ভূখন্ড হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয় তখন অন্য আট-দশজন মুক্তিযোদ্ধার মত তিনিও আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন, ধরে রাখতে পারেননি আনন্দঅশ্রু। স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে আসেন ঘরে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হয়ে যান পুরো উদ্যমী।
মিজানুর রহমান মজনু ১৯৭২ সালের এইচএসসি ও ১৯৮৭ সালে ¯œাতক পাস করেন। ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। পারিবারিক জীবনে রাশেদা জেসমিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এক ছেলে তানবীর আহম্মেদ ও এক মেয়ে তানিয়া সুলতানা তন্দ্রার সার্থক জনক তিনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মিজানুর রহমান মজনুর মুক্তিবার্তা লালবই নং- ০১১৮০২০১৪৭, বাংলাদেশ গেজেট নং-২০৫৯, কল্যাণ ট্রাস্ট নং-৮৩৬৬, ভারতীয় এফএফ নং-৩২৭, জাতীয় তালিকা নং-৩৮৪, ভোটার সূচক নং-৯৩-৪৭-৭৩-০২২, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাময়িক সনদপত্র নং-ম-৮৪৬২৩ ও ডাটাবেজের আইডি নং-০৩১৭০৬০২০৬। তিনি মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীনের পর শুধু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে নিজেকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে মিজানুর রহমান মজনু তাদের সেবা করার দৃঢ় প্রত্যয়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কালিহাতী উপজেলা কমান্ডের কমান্ডার পদে বিপুল ভোটে দ্বিতীয় বারের মত নির্বাচিত করেছেন। এখন তার দিনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় হয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের বিভিন্ন কর্মকান্ডে।
কালিহাতী উপজেলা নারান্দিয়া ইউনিয়নের একমাত্র শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কায়েম উদ্দিনের ছেলে মনিরুজ্জামান মনির বলেন, আমরা শহীদ পরিবারে সদস্য হিসেবে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। এবারই প্রথম মজনু কাকার একান্ত প্রচেষ্টায় সরকারি সম্মানি ভাতা পেয়েছি। উপজেলার নাগবাড়ী ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গাজী মাহমুদ বলেন, মিজানুর রহমান মজনু ১৯৭১ সালে যেমন অস্ত্র হাতে দেশ স্বাধীন করেছেন। তেমনি এখন আমাদের (কালিহাতীর মুক্তিযোদ্ধাদের) পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করছেন। ৯নং আলফা কোম্পানী কমান্ডার দেলবর আনসারী মিজানুর রহমান মজনু সম্পর্কে বলেন, তিনি আমাদের কোম্পানীর একজন দুঃসাহসিক যোদ্ধা। রণকৌশল নির্ধারণে মজনুর মতামত সর্বদাই গুরুত্ব পেত।
মিজানুর রহমান মজনু বলেন, দেশ স্বাধীন হলেও এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক প্রাপ্য সম্মান, অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা অনেক স্থানে অবহেলিত, নিগৃহীত। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের কতিপয় পদক্ষেপ খুবই প্রসংশনীয়। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, স্বাধীনতা বিরোধীর জন্য নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সেই সব ভয়াল স্মৃতি বর্তমান প্রজন্মকে অনুধাবন করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে পরাজিত শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠিত হোক, তারা ভাল থাকুক এটাই আমার একমাত্র চাওয়া। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সর্বদাই নিবেদিতভাবে কাজ করে যাব।

ব্রেকিং নিউজঃ