ভূঞাপুরে লেখাপড়ার শর্তে বিয়ের পিঁড়িতে স্কুল ছাত্রী জেসমিনরা

64

স্টাফ রিপোর্টার ॥
এসএসসির গন্ডি পার না হতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসলো স্কুল ছাত্রী জেসমিন। পারিবারিক অসচ্ছলতা আর করোনা মহামারির দেড় বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বালিকাতেই বধূ সাজতে হয় তাকে। তবে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার শর্তে বিয়ের সম্মতি দেয় সে। বধূ হলেও শর্তানুসারে স্কুল খোলার দিন থেকেই নিয়মিত শ্রেণীকক্ষেও যাচ্ছে জেসমিন। স্কুল জীবনেই বিয়ের মত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও লেখাপড়া করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে সে।
জেসমিন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ও গোবিন্দাসী পূর্ব পাড়া গ্রামের মৃত. আবু হানিফ ও গৃহিনী মা জাকিয়া বেগমের মেয়ে।
জেসমিন টিনিউজকে বলেন, গত ৬ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন আমার বাবা। মা ও আমরা তিন ভাই-বোন নিয়ে আমাদের চার সদস্যের সংসার। এর মধ্যে আমরা দুই বোনই বড়। ভাই অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। এ কারণে তিন ভাই-বোন নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়েন আমার মা। তবে এ সমস্যায় এগিয়ে আসেন আমার বড় খালা। খালু সরকারি চাকুরী সুবাদে অন্যত্র থাকায় আমার বড় খালা আমাদের সাথে বসবাস শুরু করেন ও আমাদের ভোরণপোষণের দায়িত্ব নেন। বড় বোনের বিয়ে হলেও এরই মধ্যে চলে আমাদের দুই ভাই-বোনের লেখাপড়া। আমরা দুই ভাই বোনই গোবিন্দাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। জেসমিন টিনিউজকে আরও বলেন, হঠাৎ করোনা মহামারির কারণে বন্ধ হয়ে যায় স্কুল। এরপর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসতে থাকে আমার বিয়ের প্রস্তাব। পাত্র আর পরিবার ভালো পাওয়ায় আমার মাসহ অভিভাবকরা ২০২০ সালের আগস্ট মাসে আমার বিয়ে দেন উপজেলার ছাব্বিশা গ্রামের নাজিম উদ্দিনে ছেলে শাকিল পারভেজের সাথে। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। স্বামী আর শ^শুরবাড়ী লোকজন ভালো আর শিক্ষিত হওয়ায় আমার ইচ্ছানুসারে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সম্মতি দেন। এ কারণে স্কুল খোলার দিন থেকেই আমি নিয়মিত শ্রেণীকক্ষেও যাচ্ছি। আমার লেখাপড়ার সকল খরচও বহন করছেন আমার স্বামী। আমি লেখাপড়া করে বড় হতে চাই।
জেসমিনের স্বামী শাকিল পারভেজ টিনিউজকে বলেন, পরিবারের পছন্দে স্কুল ছাত্রী বিয়ে করেছি। তবে আমি চাই জেসমিন লেখাপড়া করবে। ওর লেখাপড়ার সকল সুযোগ সুবিধা আমি সাধ্যমত পূরণ করবো।
গোবিন্দাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের শুধু জেসমিনই নন বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে আমেনা, নূরী খাতুন, স্বর্ণা, শাহিনুর, লাকি, নিলুফা, মিতানূর, দিবাসহ ওই বিদ্যালয়ের ১৭জন এসএসসি পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে দুইজন অন্তঃসত্ত্বা। স্কুল ছাত্রী নূরী খাতুন টিনিউজকে বলেন, বিয়ের জন্য আমি প্রস্তুত না থাকলে বাবার অসুস্থতার কারণে স্কুল জীবনেই আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। আমি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে আগ্রহী দেখে আমার স্বামী আপত্তি করেননি। স্বামীর সকল প্রকার সহযোগিতা পেয়ে স্কুল খোলার দিন থেকেই আমি নিয়মিত ক্লাস করছি। জীবনে নিজে কিছু করার ইচ্ছায় লেখাপড়া চালিয়ে যাবো।
আমেনা আক্তার টিনিউজকে বলেন, ইচ্ছে না থাকলেও বাবা-মার পছন্দেই আমার বিয়ে হয়েছে। বিয়ে হলেও স্বামীর সম্মতিতেই স্কুল খোলার দিন থেকে আমি নিয়মিত ক্লাস করছি। আমি লেখাপড়া করে বড় হতে চাই।
শ্রেণী শিক্ষক আব্দুল লতিফ তালুকদার টিনিউজকে বলেন, করোনার বন্ধে দেশের অসংখ্য স্কুল ছাত্রী বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটেনি আমাদের স্কুলেও। এ স্কুলের ১৭জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পরও স্কুলে আসছে আমাদের অনেক ছাত্রী। এটি সত্যিই আশার আলো। আমরাও তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সাধ্য মত অনুপ্রেরণা দিচ্ছি।
এ বিষয়ে গোবিন্দাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খন্দকার মোহাম্মদ আলী টিনিউজকে জানান, করোনার বন্ধ আর পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে আমাদের স্কুলের বেশকয়েকটি ছাত্রী ও ছাত্র বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে। তবে বিয়ের পরও আমাদের অসংখ্য ছাত্রী স্কুলে ক্লাস করছে। আমার স্কুলের কতজন ছাত্র-ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে এ তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ স্কুলের ২৬ জন ছাত্র আর ছাত্রী বিয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা আরো বাড়বে বলেও জানান তিনি।

ব্রেকিং নিউজঃ