ভূঞাপুরে দু’হাত ছাড়াই জীবন সংগ্রাম জগন্নাথ শীলের

106

স্টাফ রিপোর্টার ॥
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ শীলের। কাজ করার দু’হাত নেই তার। জীবিকার প্রয়োজনে সবই করতে হয়। তারপরও থেমে নেই তার কঠিন এক জীবন যুদ্ধ। ৬৯ বছর কেটে গেছে। কিন্তু হাত পাতেননি কারও কাছে। বাল্যকাল থেকেই জগন্নাথ শীল এ বয়সেও বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়িয়েই টানছেন সংসারের ঘানি। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সময় কেটেছে নিদারুন। ফলে অভাবের তাড়নায় এক বেলা খেয়ে, আরেক বেলা না খেয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন তিনি। জীবনযুদ্ধে দু’পা দিয়েই লড়ছেন জগন্নাথ শীল। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কয়েড়া গ্রামে।




জানা যায়, ১৯৬৭ সালে পা দিয়ে লিখেই এসএসসি পাশ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকায় করেছেন সেচ্ছাসেবকের কাজ। এসএসসি পাস করলেও দুই হাত না থাকায় চাকরি মেলেনি কোথাও। তবুও হাল ছাড়েননি জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে। থাকেন জীর্ণশীর্ণ ভাঙা একটি ছোট্ট ঘরে। এ ঘরটিও যেন নিরাপদ নয়, ঝড়-বৃষ্টির সময় চালের ফুটা দিয়ে পানি পড়ে। অন্যদিকে, একসময় সিনেমা জগতে ছিল তার কদর। মলুয়া সিনেমায় সাঁতার কেটে, সুপারি গাছে উঠে অভিনয় করে বেশ আলোচনায় ছিলেন সে সময়ে। অভিনয়ও করলেও এখন প্রাইভেট পড়িয়েই কোন রকমে সংসার চালান।




এখন তার সর্বশেষ ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা। তাকে জানাতে চান তার দুঃখ দুর্দশার কথা। তার জীবনের এই শেষ মূহুর্তে চান সবার একটু সহানুভূতি, আর সরকারের সার্বিক সহায়তা। বয়সের ভারে তার শরীর অনেকটাই নাজুক। তার মধ্যে আবার করোনার শুরুতেই বন্ধ হয়ে গেছে তার আয়ের পথটা। জগন্নাথ শীলের দুই ছেলে, এক মেয়ে। ১০ বছর আগে বড় ছেলে বিয়ে করে সংসার থেকে পৃথক হয়ে যায়। আরেক ছেলে এখনো বেকার অবস্থায়।




এরমধ্যে জগন্নাথের পৈতৃক সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। উপজেলার কয়েড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও ছোলায়মান নামের দুই ব্যক্তি জোরপূর্বক তার পৈতৃক ৭২ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন। এজন্য তিনি আদালতের দারস্থ হলে পরবর্তীতে আদালত তার নামে জমির ডিক্রি জারি করেন। পরে আদালত জমি বুঝিয়ে দেয়ার পর দখলদাররা পুনরায় ডিক্রি জারি বাতিলের জন্য মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন।
শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ শীল টিনিউজকে বলেন, জন্ম থেকে দুই হাত নেই। অভাব অনটনের মাঝে ১৯৬৭ সালে মেট্রিক পাস করি। কিন্তু মেট্রিক পরীক্ষার আগে বাবা ৬৫ টাকা ফিস দিতে পারেননি। সে সময় ঢাকা গিয়ে গীতিকার লোকমান ফকিরের সহযোগিতায় মলুয়া ছবিতে অভিনয় করি। অভিনয় করে যে টাকা পেয়েছিলাম সেই টাকা দিয়ে মেট্রিক পরীক্ষা দেই। এতো অভারের মাঝেও কারো কাছে হাত পাতিনি। এরপর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছি। তাদের বিভিন্ন তথ্যে দিয়েছি। তিনি টিনিউজকে আরও বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপজেলার নিকরাইল বাজারে বই বিক্রির ব্যবসা শুরু করি। তখন টেক্সবুক বোর্ডের লাইসেন্স পেয়েছিলাম। ভালই চলছিল ব্যবসা। পরে জিয়া সরকার ক্ষমতায় এসে লাইসেন্স বাতিল করে। এতে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সারাদেশে সরকার বই বিতরণ শুরু করে। ২০ বছর ব্যবসার পর বই বিক্রি ছেড়ে দেই। এছাড়া বাপ-দাদার জমিও অন্যরা জবর দখল করে নেয়। পৈতৃক ভিটা রক্ষার জন্য আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।




স্থানীয়রা টিনিউজকে জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধী জগন্নাথ খুবই কষ্টে দিন পার করছেন। কিন্তু কারোর কাছে হাত পাতেননি। তার দুই ছেলের একজন বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। ছোট ছেলেটাও বেকার করোনার কারণে। এতে চরম কষ্টে আছেন পরিবার নিয়ে।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি টিনিউজকে বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী অসহায় জগন্নাথ শীলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘর করে দেওয়ার পাশাপাশি সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ