‘বায়স্কোপ’ নিয়ে টাঙ্গাইলে “বাপজানের বায়স্কোপ” এর প্রচারণা

132

3254স্টাফ রিপোর্টারঃ
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। হঠাৎ করে মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চোখে পরলো কাঠের একটি বাক্স মাথায় নিয়ে এক বৃদ্ধ ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে হেঁটে যাচ্ছে। আর তার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভীর। একটু পর লোকটি তার সাথে থাকা বাক্সটি নিচে রেখে দাঁড়ালেন। কাছে গিয়ে দেখা গেলো সেটি বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ‘বায়স্কোপ’। আর সেটি দেখতেই শিক্ষার্থীদের এমন ভীর! শিক্ষার্থীদের আগ্রহ মেটাতে সেই বায়স্কোপওয়ালা ডুগডুগি বাজিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছেন, “কী চমৎকার দেখা গেলো, লাইলি মজনু চলে এল, কী চমৎকার দেখা গেলো….”। কিন্তু গ্রাম-বাংলার প্রাচীনকালের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম বায়স্কোপ তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাহলে কোথা থেকে এলো এই বায়স্কোপ?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি দূরেই দেখা মিললো একদল যুবক হলুদ টি-শার্ট পরে ব্যানার-সাউন্ডবক্স লাগাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখা গেলো সেটি মুক্তির অপেক্ষায় থাকা বাংলা চলচ্চিত্র “বাপজানের বায়স্কোপ” এর প্রমোশন টিম। নামের সাথে প্রচারণার সার্থকতা রাখতেই বায়স্কোপ নিয়ে তাদের আগমন।
আহমেদ হিমু নামের এক টিম মেম্বার টিনিউজবিডি.কমকে জানালেন, তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা রিয়াজুল রিজু’র মুক্তির অপেক্ষায় থাকা গ্রাম-বাংলার অতিত ঐতিহ্য আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তৈরী ছবি বাপজানের বায়স্কোপের প্রচারের জন্যই তাদের এই আয়োজন। দেশের প্রায় ৬৩টি জেলা ঘুড়ে রোববার তারা টাঙ্গাইলে এসেছেন। আর তারপর থেকেই জেলার বিভিন্ন কলেজ ও জনবহুল স্থানে বায়স্কোপ নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাথে বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে সিনেমার ট্রেইলার, টিজার আর গান। সিনেমার পাশাপাশি বায়স্কোপের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই তারা বায়স্কোপ সাথে নিয়ে ঘুড়ছেন।
সিনেমার ট্রেইলার আর গান দেখার ফাঁকে বায়স্কোপ নিয়ে কথা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষার্থীর সাথে। আশরাফুল মঈন সোহেল নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী টিনিউজবিডি.কমকে জানালেন, ছোটবেলা থেকে বায়স্কোপের অনেক নাম শুনেছি। শুনেছি ‘বন্ধুর বাড়ির রঙ্গিন মেলায় দেখেছিলাম বায়স্কোপ’ গানটি। কিন্তু বাস্তবে সেই বায়স্কোপ কখনো দেখা হয়নি। আজ দেখতে পেরে খুব ভালো লাগলো। এখনকার দিনে আমরা হয়তো টিভি-কম্পিউটারে সিনেমা, গান দেখে থাকি। কিন্তু আগের দিনে যেভাবে কাঠের যন্ত্রের মাঝে ছবি আর বায়স্কোপওয়ালার নিজের গানে সিনেমার স্বাদ দেয়া হতো, তাই সত্যিই অন্যরকম।
364548মারুফ হাসান ইমন নামের বিশ্ববিদ্যায়রে আরেক শিক্ষার্থী টিনিউজবিডি.কমকে জানালেন, আমাদের দেশের আর দেশের সত্বার নিজস্ব কিছু ঐহিত্য আছে। সেগুলোর কাছে আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত। এই ঐহিত্যগুলোর সাথে আমাদের অতীত জেনারেশন আর বর্তমান জেনারেশন জড়িত। প্রত্যেকটি জাতি, প্রত্যেকটি দেশ তার পেছনের জেনারেশনের কথা চিন্তা করে, আর সেগুলো নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের বিনোদনের উপাদানগুলো হয়তো একটু আধুনিক হয়ে গেছে, কিন্তু বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত, যাদের গ্রামের নাড়ীর টানের প্রতি যাদের প্রাণের স্পন্দন আছে তারা একটু চেষ্টা করলেই এই হারানো বিনোদনের মাধ্যমগুলো ফিরিয়ে আনতে পারে। বায়স্কোপও আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু আজ সেই বায়স্কোপ নিজের চোখে দেখলাম। সত্যিই অন্যরকম লাগছে!
রাকিবুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থী মুক্তির আগে বাংলা সিনেমার এমন প্রচারণা সম্পর্কে বললেন, দেশে এখন অনেক সিনেমাই হচ্ছে। কিন্তু পাবলিক প্লেসে এমন ভিন্নধর্মী প্রচারণা চোখে পরেনি। সিনেমার প্রমোশনে এমন ভিন্নতা দেখে মনে হচ্ছে হয়তো ছবিটি আমদের বাংলা সিনেমার আগের সুনামটি আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে।
সিনেমাটির প্রমোশন চালাতে আসা দলটির সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেলো, গ্রাম-বাংলার প্রাচীন আর সাধারণ কাহিনী নিয়ে তৈরী বাপজানের বায়স্কোপ সিনেমাটি। চলচ্চিত্রের পটভূমি যমুনা পাড়ের চর “চর ভাগিনা”। চরের মালিক জীবন সরকার আর প্রান্তিক চাষী হাসেন মোল্লা কে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে কাহিনী। হাসেন মোল্লার পিতা চরে চরে বায়স্কোপ খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পিতার মৃত্যুর পর সেই বায়স্কোপের বাক্সটি ঘরেই পড়ে থাকে। ছাপোষা কৃষক হাসেন মোল্লকে তবুও ক্ষণে ক্ষণে নাড়া দিয়ে যায় বাবার শেষ স্মৃতি, পোড়ায় মন। একসময় হাসেন মেল্লা ঠিক করে ফেলে সপ্তাহে একদিন করে হলেও সে বায়স্কোপের খেলা দেখাবে। বায়স্কোপ বাক্সটি ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করে প্রস্তুত করে দূর চরে খেলা দেখাতে যাবার জন্যে। পুরনো ছবিগুলো ব্যবধানে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হাসেন মোল্লা মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী ছবিতে আঁকিয়ে নেয়, নতুন রীল বানায়। কিন্তু চরের মহাজন জীবন সরকারের আঁতে ঘা লাগে তাতে। সে ঘোষণা করে দেয় এই বায়স্কোপ চলবে না, এই খেলা দেখানো যাবে না! আর সেটা নিয়ে এগিয়ে গেছে সিনেমার কাহিনী।
যে বায়স্কোপ নিয়ে মানুষের এতো আগ্রহ, কথা হলো সেই বায়স্কোপওয়ালা সিরাজগঞ্জের যমুনা পাড়ের চরাঞ্চল চৌহালী গ্রামের বৃদ্ধ মুসা মিয়া সাথে। তিনি টিনিউজবিডি.কমকে বলেন, ছোট থেকেই হাল চাষের কাজ করতাম। কিন্তু একসময় দেখলাম তাতে আমার সংসার ভালোভাবে চলতো না। তখন ঢাকা গিয়ে বায়স্কোপের গ্লাসগুলো বানিয়ে আনি। আর তারপর এই বায়স্কোপের খেলা দেখিয়ে আমার সংসার মোটামোটি খুব ভালোভাবে চলতে লাগলো। কমপক্ষে ৩৫ বছর ধরে নিজের গ্রাম আর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে এই খেলা দেখিয়ে যাচ্ছি। গ্রামের ছেলেমেয়েদের টাকা ছাড়াও চাল, ধান, সবজির বিনিময়ে খেলা দেখাতাম।
তার তৈরী বায়স্কোপ নিয়ে একটি সিনেমা তৈরী হয়েছে তাতে কেমন লাগছে এমন প্রশ্নে মুসা মিয়া টিনিউজবিডি.কমকে বলেন, বুড়া বয়সে এতে অনেক আনন্দ লাগছে। এই সিনেমার দলটি আমার বাড়ি গিয়ে আমাকে নিয়ে আসছে। এতে আমি আর আমার গ্রামের লোকজন সবাই খুব আনন্দিত।
বাপজানের বায়স্কোপ টিমের সাথে সারা বাংলাদেশে বায়স্কোপে খেলা দেখাতে পেরে কেমন লাগছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক ভালো লাগছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা দেখছে যে তাদের বাপ-দাদারা যাতে সিনেমা হিসেবে দেখতো, সেই বায়স্কোপ এখন তারা দেখতে পেরেছে।
যাকে ঘিড়ে স্বপ্ন দেখছে “বাপজানের বায়স্কোপ”, কথা হয় সেই পরিচালক রিয়াজুল রিজু’র সাথে। তিনি বলেন, আমি টাঙ্গাইলের ছেলে। টাঙ্গাইলেই আমার জন্ম থেকে বেড়ে উঠা। সারাদেশে বাপজানের বায়স্কোপের প্রমোশনে যেতে না পারলেও টাঙ্গাইলে নিজেই উপস্থিত হয়েছি। বায়স্কোপ নিয়ে সিনেমা তৈরী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বায়স্কোপ আমাদের অতি পরিচিত একটি শব্দ। কিন্তু সেইসাথে এটাও সত্য, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই স্বচক্ষে দেখেনি। এই জিনিসের উৎপত্তি এদেশেই, একসময় এদেশের গ্রামের মানুষের কাছে বায়স্কোপই ছিলো সিনেমা, এরই মাঝে তারা খুঁজে পেতেন রাজ্জাক, করবী, শাবানা। তিনি বলেন, আমার এই বাপজানের বায়স্কোপ চলচ্চিত্রটি গ্রাম বাংলার একটি চলচ্চিত্র। এর গল্পে আমরা মাটির টান আর গন্ধ দিতে চেষ্টা করেছি। আর বায়স্কোপ থেকেই চলমান চিত্রের ধারণা এসেছে। আর বাপজান কথাটির মাঝে একধরণের মায়া আছে। তাই এর নাম হয়েছে “বাপজানের বায়স্কোপ’। নাড়ী, শেকর আর সোডামাটির গন্ধ পাওয়া যাবে এই চলচ্চিত্রটিতে। আমি সবসময়ই একটি সাধারণ চলচ্চিত্র তৈরী করতে চেয়েছি, যে চলচ্চিত্রে মানুষ নাড়ীর টান খুঁজে পাবে।
বর্তমান সময়ের ষ্পেশাল ইফেক্ট আর আধুনিক গল্পের মাঝে গ্রাম বাংলার গল্পনিয়ে তৈরী একটি সিনেমা কতটা স্থান নিতে পারবে এমন প্রশ্নে চলচ্চিত্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা রিজু টিনিউজবিডি.কমকে বলেন, বাপজানের বায়স্কোপের স্লোগান হচ্ছে “প্রজন্মের গল্প”। আমি পুরনো গল্প নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। বাংলার মুক্তিযুদ্ধটাকে, অতীত ঐহিত্যটাকে আমার মতো করে, আমার ঢং এ বলার চেষ্টা করেছি। তাই বাপজানের বায়স্কোপকে নতুন প্রজন্মের, তরুণ প্রজন্মের উদ্বুদ্ধের গল্প বলতে পারেন। এই বায়স্কোপটি একটি এন্টিক বায়স্কোপ ছিলো। আমার জানামতে এটিই দেশের শেষ বায়স্কোপ যেটি প্রতিনিয়ত ব্যবহার হচ্ছিলো। এর আগে আমি এই বায়স্কোপটি নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি তৈরী করেছিলাম। এই বায়স্কোপের নাম হয়তো অনেকেই শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখেনি। তাই আমি আমার ছবির প্রচারণার অংশ হিসেবে এর সাথে বায়স্কোপটি রেখেছি যাতে, নতুন প্রজন্ম এটি দেখতে পারে, অতীত ঐহিত্য জানতে পারে।
আসছে ২৫শে ডিসেম্বর দেশের ১০০টি সিনেমা হলে একযোগে মুক্তি পাচ্ছে বাপজানের বায়স্কোপ। মাসখানেক আগে সেন্সর থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে চলচ্চিত্রটি। আর মুক্তির আগেই ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে বেশ কিছু আন্তার্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। তারমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র উৎসব কানাডার টরেন্টতে আন্তর্জাতিক সাউথ এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসব-২০১৫ অন্যতম। দৌলদিয়ার পতিতা পল্লী আর সিরাজগঞ্জের লাঙ্গরঘেড়া চরে ধারণ করা হয়েছে চলচ্চিত্রটির দৃশ্য। চলচ্চিত্রটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- শহিদুজ্জামান সেলিম, শতাব্দী ওয়াদুদ, সানজিদা তন্ময়, হাফসা মৌটুসী, মাসুদ মহিউদ্দিন, তারেকবাবু, বৈদ্যনাথ, উজ্জল কবির হিমু, আহমেদ হিমু ও মামুন খান সহ আরও অনেকে। চলচ্চিত্রটির কাহিনী ও সংলাপ লিখেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মাসুম রেজা, চিত্রগ্রহনে আছেন মেহেদি রনি। গানের কথা ও সুর করেছেন অয়ন চৌধুরী ও আমিরুল ইসলাম। সংগীতায়োজনে আছেন এসআই টুটুল, অমিত মল্লিক ও সেতু চৌধুরী। কন্ঠ দিয়েছেন এসআই টুটুল, চন্দনা মজুমদার, অমিত মল্লিক, শিমুল খান, সায়েম বিপ্লব, শতাব্দী ওয়াদুদ ও আমিরুল ইসলাম।

ব্রেকিং নিউজঃ