বাসাইলে মেয়াদোত্তীর্ণ ভ্যাকসিন প্রয়োগে ১৬শ’ হাঁসের মৃত্যুর অভিযোগ

83

বাসাইল প্রতিনিধি ॥
টাঙ্গাইলের বাসাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ডাকপ্লেগ রোগের মেয়াদোত্তীর্ণ ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর পর্যায়ক্রমে রিপন সিকদার নামের এক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রায় ১৬০০ হাঁসের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রিপন সিকদার দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত রিপন জেলার বাসাইল উপজেলার ফুলকী ইউনিয়নের ময়থা উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আইনগত সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার খামারীকে সমঝোতার প্রস্তাব দিচ্ছেন।

জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে বেকার অবস্থায় থাকা যুবক রিপন সিকদার ৪২ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে ঘর তৈরি করে হাঁসের খামার করেন। প্রথম অবস্থায় তিনি ১ হাজার হাঁস নিয়ে খামার শুরু করেন। প্রথমে তার বেশ কিছু টাকা লাভ হয়। এরপর দ্বিতীয়বারে তিনি নাগেশ^রী জাতের ডিমের জন্য ১৭৩০টি হাঁসের বাচ্চা ও মাংসের জন্য বেলজিয়াম জাতের ৭০টিসহ মোট ১৮০০টি হাঁসের বাচ্চা খামারে তুলেন। বাচ্চাগুলোর এক মাস বয়সে গত (৫ জুন) রিপন সিকদার বাসাইল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে ভ্যাকসিনের দাঁয়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) জাহিরুল ইসলামের কাছে ডাকপ্লেগ রোগের ভ্যাকসিনের জন্য যান। ওই সময় জাহিরুল ইসলাম তাকে ১৯টি ভ্যাকসিনের বোতল দেন। এরপর গত (৭ জুন) রিপন হাঁসগুলোকে ওই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেন। ভ্যাকসিন প্রয়োগের একদিন পর থেকে পর্যায়ক্রমে হাঁসগুলো মারা যেতে থাকে। ক্রমেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৬০০ হাঁস মারা যায়। ওই সময় ভ্যাকসিনের বোতল চেক করলে দেখা যায়- চলতি বছরের (২০ মে) ভ্যাকসিনটির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

 

খামারি রিপন সিকদারের স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে ভ্যাসকিন আনার পর প্রায় ১৭০০ হাঁসকে প্রয়োগ করা হয়। আর বাকিহাঁসগুলোকে একটি কোম্পানির ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরের দিন থেকে হাঁস মারা যাওয়া শুরু হয়। একদিনেই প্রায় ৫০০ হাঁসের মৃত্যু হয়। এভাবেই বাড়িতেই প্রায় ১৬০০ হাঁস মারা যায়। এরপর বাকি হাঁসগুলোকে বিলে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকেও হাঁস মারা যাচ্ছে। ঋণ নিয়ে এই খামারটি করেছিলাম। আমরা এখন নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
ক্ষতিগ্রস্থ খামারি রিপন সিকদার জানান, গত (৫ জুন) আমি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে ভ্যাকসিনের দাঁয়িত্বে থাকা জাহিরুল ইসলামের কাছে হাঁসের ডাকপ্লেগ রোগের ভ্যাকসিন আনতে যাই। তিনি আমাকে ১৯টি ভ্যাকসিনের বোতল দেন। এরপর আমি গত (৭ জুন) প্রায় ১৭০০ হাঁসকে ওই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করি। ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরেরদিন থেকে হাসগুলো মারা যেতে শুরু করে। একদিনে ৫০০ হাঁসের ওপরেও মারা গেছে। এভাবে প্রায় ১৬০০ হাঁস মারা গেছে। মৃত হাঁসগুলো মাটিতে পুতে রাখা হয়। আর বাকি জীবিত হাঁসগুলো বিলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোও মারা যাচ্ছে। তিনি আরো জানান, হাঁসগুলো মারা যেতে থাকলে ভ্যাকসিনের বোতল চেক করে দেখি প্রায় এক মাস আগে ভ্যাকসিন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। জাহিরুল ইসলামের ভুলের কারনে আামার প্রায় ৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনার পর আমি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে গেলে জাহিরুল ইসলাম জানায়, তার ভুল হয়েছে। ঋণ নিয়ে আমি এই হাঁসের খামারটি করেছি। এই ক্ষতি আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে। এই ক্ষতি পোষানোর মতো আমার ক্ষমতা নেই। তাই আমি ক্ষতিপূরণ চাচ্ছি। এ ঘটনায় আইনের আশ্রয় নেওয়া হবে।

স্থানীয়রা জানান, রিপন ঋণ করে এই খামারটি করেছিলেন। প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের কর্মকর্তার ভুলের কারনে রিপনের অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো। অভিযুক্ত কর্মকর্তার শাস্তি ও পাশাপাশি রিপনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবী জানাচ্ছি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য সুমন সরকার জামাল জানান, একজন কর্মকর্র্তার ভুলের কারনে রিপনের প্রায় ১৬০০ হাঁসের মৃত্যু হয়েছে। রিপনের অনেক টাকা ক্ষতি হয়ে গেলো। এলাকাবাসী হিসেবে রিপনের ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি।

উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) অভিযুক্ত জাহিরুল ইসলাম জানান, রিপন নামের ওই ছেলেটা আমার কাছে গত (৬ জুন) এসেছিল। পরে তাকে ২০টি ডাকপ্লেগ রোগের ভ্যাকসিন দেয়া হয়। কয়েকটি হাঁস মারা যাওয়ার পর রিপন আমার কাছে এসে ১০টি ভ্যাকসিন ফেরত দিয়ে গেছে। পরে চেক করে দেখি গত (২০ মে) ভ্যাকসিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওই ভ্যাকসিন মূলে আমাদের অফিসে থাকা বাকিগুলো ফেলে দিয়েছি। হঠাৎ করে আবার এসে বলতেছে- তার ১৬০০ হাঁস মারা গেছে। ভ্যাকসিনের মেয়াদ না থাকলেও উপকার না হতে পারে, তবে কোনও ক্ষতি হবে না। আসলে এতোগুলো ভ্যাকসিনের মধ্যে থেকে তাকে দেওয়ার সময় আমি মেয়াদটি খেয়াল করিনি।

বাসাইল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্র্তা ডা. ফারুক আহাম্মদ বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। এসেই হাঁসগুলোর মৃত্যুর ঘটনাটি জেনেছি। মেয়াদোত্তীর্ণ ভ্যাকসিন বিতরণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও ভুক্তভোগীকে প্রণোদনার মাধ্যমে সহায়তা করা হবে। আমি খামারীকে বলেছি বিষয়টি সমাধান করতে।

টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রানা মিয়া বলেন, এ ঘটনায় ওই কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা কিংবা গাফিলতি করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেইসাথে হাঁসগুলো মারা যাওয়ার আসল কারন শনাক্ত করতে হবে।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ