রবিবার, সেপ্টেম্বর 20, 2020
Home দুর্নীতি বাসাইলে নেই খুটি, বিদ্যুৎ সংযোগ ॥ তবুও বিল সোয়া লাখ টাকা!

বাসাইলে নেই খুটি, বিদ্যুৎ সংযোগ ॥ তবুও বিল সোয়া লাখ টাকা!

স্টাফ রিপোর্টার ॥
বসানো হয়নি কোনও প্রকার বৈদ্যুতিক খুঁটি। তারও টানানো হয়নি আবেনদকারী গ্রাহকের সেচ প্রকল্প পর্যন্ত। দেয়া হয়নি বিদ্যুৎ সংযোগ। শুধুমাত্র লাইনের জন্য আবেদন করাতেই বিল এসেছে প্রায় সোয়া লাখ টাকা। আবার এ অবাঞ্চিত বিল খেলাপির দায়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অধিনে টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ কর্তৃপক্ষ বৃদ্ধা শ্যামলা বেগমের নামে মামলা দিয়েছে। ভুক্তভোগী শ্যামলা বেগমের বাড়ি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায়।
সংশ্লিষ্ট্য সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কাশিল ইউনিয়নের দাপনাজোর হাকিমপুর গ্রামের মৃত আব্দুল সবুর মিয়ার স্ত্রী শ্যামলা বেগম সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ লাইন নেয়ার জন্য বিগত ২০১৪ সালের শেষের দিকে বাসাইল পৌর এলাকার মশিউর রহমান নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ লাইনের জন্য পিডিবি টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর অধিনে আবেদন করেন। ওই সময় দাপনাজোর হাকিমপুর, দেউলী ও মুড়াকৈ এলাকার ১২জনের কাছ থেকে সেচ মেশিনে বিদ্যুতের লাইন পাইয়ে দিতে মশিউর রহমান ১১ লাখ টাকা নেয়। পরে বিগত ২০১৫ সালের প্রথম দিকে তিনি ৯ জনের সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেন। এছাড়া গ্রাহকের নিজ দায়িত্বে বাঁশ ও সিমেন্টের খঁটি ও তার কিনে আরও দুইজন তাদের সেচ মেশিনে সংযোগ নেয়। ওই সময় রহস্যজনক কারণে দূরত্বের অযুহাতে শ্যামলা বেগমের লাইন না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা তার লাইন বাতিলের কথা বলে কাজ শেষ করে চলে যায়। আবেদনের প্রায় পাঁচ বছর পর সম্প্রতি শ্যামলা বেগমের নামে এক লাখ ১৪ হাজার ৬শ’ ২৭ টাকা বিদ্যুৎ বিল দেখিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর সহকারী প্রকৌশলী সাইমুম শিবলী বাদী হয়ে টাঙ্গাইলের বিদ্যুৎ আদালতে মামলা দায়ের করেন। ফলে শ্যামলা বেগম চড়মভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ মামলায় আগামী (১৪ সেপ্টেম্বর) বৃদ্ধা শ্যামলা বেগমকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এমন কার্যক্রমে এলাকায় চড়ম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী বৃদ্ধা শ্যামলা বেগম টিনিউজকে বলেন, আমরা ১২ জন সেচ মেশিনে বিদ্যুতের লাইনের জন্য আবেদন করলে লাইন পাইয়ে দিতে স্থানীয় শফিকুলের মাধ্যমে বাসাইলের মশিউর রহমান সেচ প্রতি ৮০ হাজার করে টাকা নেন। ওই সময় ১১জন বিদ্যুৎ লাইন পেলেও আমাকে লাইন দেওয়া হয়নি। খুঁটি বসানো ও তারও টানানো হয়নি। আমার ৮০ হাজার টাকাও ফেরত দেয়নি। উল্টো আমার নামে এক লাখ ১৪ হাজার ৬শ’ ২৭ টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এছাড়াও আমার নামে তারা মামলাও করেছে। তিনি আর বলেন, বিদ্যুৎ অফিসের এমন মিথ্যা মামলায় এই বৃদ্ধা বয়সে আমাকে আদালতে দাঁড়াতে হবে। এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও বিল খেলাপির অপবাদে জেলেও যেতে হতে পারে। এ ব্যাপারে আমি কি করবো বুঝতে পারছিনা না। এখন খুবই চিন্তায় আছি। বিদ্যুৎ বিভাগের এমন হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলার দায় থেকে মুক্তি পেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
শ্যামলা বেগমের ছেলে সুরুজ্জামান টিনিউজকে বলেন, বিগত ২০১৪ সালে আমরা একটি সেচ মেশিন করার পরিকল্পনা করে বিদ্যুৎ লাইন আনার জন্য আবেদন করি। তখন নানা অযুহাতে আমাদের লাইনটি বাতিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চলে যায়। প্রায় পাঁচ বছর পর আমার মায়ের নামে হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভাগের মামলার নোটিশ আসে। তারা মামলার কপির সাথে বিদ্যুৎ বিল পাঠিয়ে দেন। অথচ সেচ মেশিন বা বিদ্যুৎ লাইনের কোন অস্তিত্বই নাই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মহসিনুজ্জামান টিনিউজকে বলেন, বিদ্যুৎ লাইনের জন্য শ্যামলা বেগম আবেদন করেছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ খুঁটি স্থাপন বা কোন তারও টানায়নি, সংযোগও দেয়নি। তারপরও শ্যামলা বেগমের নামে বিদ্যুৎ বিল খেলাপি মামলা হয়েছে। এই মামলা থেকে বৃদ্ধা শ্যামলা বেগমকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
বিদ্যুৎ লাইন পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে টাকা লেনদেনকারী শফিকুল ইসলাম টিনিউজকে বলেন, বিগত ২০১৪ সালের শেষের দিকে আমার নিজের একটিসহ ১২টি সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ লাইনের জন্য আবেদন করে ইস্টিমেট করি। তখন আমার হাত দিয়েই ১২টি সেচের জন্য বাসাইলের মশিউর রহমানকে ১১ লাখ টাকা দেই। সেই সময় ১১টি সেচে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। কিন্তু শ্যামলা বেগমের সেচ পয়েন্ট পর্যন্ত কোন প্রকার খুঁটি স্থাপন বা তার টানানোই হয়নি। এব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করেও কোন সুরাহা হয়নি। তারা বলে এ লাইন বাতিল হয়ে গেছে। শ্যামলা বেগমের লাইন আর হবে না। এ পাঁচ বছর শ্যামলা বেগমের নামে কোন বিদ্যুৎ বিলও আসেনি। হঠাৎ করেই শ্যামলা বেগমের নামে বিল বকেয়া সংক্রান্ত বিদ্যুৎ বিভাগের মামলার সমন এসেছে। এতে এলাকায় সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যুৎ লাইন পাইয়ে দিতে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়ে টাকা গ্রহণকারী মশিউর রহমান টিনিউজকে বলেন, ওই এলাকায় ৯টি সেচে বিদ্যুৎ লাইন দেয়া হয়েছে। বাকি ৩টির বিষয়ে আমার জানা নেই। পরে আমার সাথে যোগাযোগ করলে বাকি ৩টির ব্যাপারে অফিসকে অবহিত করা হয়। এরমধ্যে দুইটি নিজ দায়িত্বে খুঁটি এবং তার কিনে সংযোগ নেন। কিন্তু শ্যামলা বেগমের লাইনটি বাতিল হলে অফিসকে অবহিত করা হয়েছিল। যেখানে অফিসকে অবহিত করা হয়েছে সেখানে শ্যামলা বেগমের নামে বিদ্যুৎ বিল আসার কথা না। তার নামে কেন বিদ্যুৎ বিল আসলো এটা বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারাই ভালো জানেন।
মামলার বাদী টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ (বিউবো) এর সহকারী প্রকৌশলী সাইমুম শিবলীর সাথে মোবাইলে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি টিনিউজকে বলেন, মোবাইলে কথা বলা যাবে না। অফিসে আসেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ রকম হাজার হাজার মামলা হচ্ছে। পরে তিনি ফোন কেটে দেন।

ব্রেকিং নিউজঃ