ফেরিওয়ালা আকবর ৫৭ বছর ধরে টাঙ্গাইলের পথে প্রান্তরে বই বিক্রি করছেন

587

মোজাম্মেল হক ॥
বই পড়ে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই বই পড়তে ইচ্ছে করে। অথচ ফেরিওয়ালা আকবর হোসেনের বই তার নিত্যসঙ্গী, অথচ বইয়ের ভিতর কি লেখা আছে তা কিন্তু পড়তে পারেন না। দ্রারিদ্রতার কারনে পড়ালেখা না করতে পারলেও বইকে ভালোবেসে পথে-প্রান্তরে, হাটবাজারে বই বিক্রি করে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। অশিক্ষিত বই ফেরিওয়ালা আকবর মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বই বিক্রি করা শুরু করেন। সারাদিন পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করে চলেছেন। বই বিক্রি করে কোন দিন ১৫০ কিংবা ৫০ টাকা আয় হয়। প্রায় ৫৭ বছর যাবত টাঙ্গাইলের সে পথে প্রান্তরে বই বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
জানা যায়, স্বাধীন পেশা বই ফেরিওয়ালা আকবর (৬৯) অন্য পেশা গ্রহণ করেননি। যদিও একসময় টাঙ্গাইল শহরে কিছুক্ষন ও মিতালী হোটেল ছাড়াও বিভিন্ন হোটেলে প্লেট ও বাসন পরিস্কার করেছেন। ঘুরে ঘুরে বৃক্ষের চারাও বিক্রি করেছেন। বয়স জনিত কারনে স্বরণশক্তি কমে গেছে, গুছিয়ে কথা বলতেও পারেন না। তাই জন্ম তারিখ সঠিক বলতে পারেনি। তবে তার দাবী জন্ম ১৯৫২ সালে, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পাঁচ কাহনিয়া গ্রামে মনু পাগলার গৃহে। বাবা আটিয়া মাজারে পড়ে থাকতেন। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মারা যান। যে কারনে মনু পাগলার ঘরে কয়টি সন্তান ছিল সেটা আকবর হোসেন ভুলে গেছেন। অভাবের কারনে আকবরের ভাইবোনকে তার বাবা-মা অন্যের কাছে পালক দিয়েছিলেন। তারপরও তার ধারনা তার ভাইবোন ৫ থেকে ৬ জন হবে। আকবর হোসেনের ১ ছেলে, ১ মেয়ে। বড় ছেলে রাসেল রিক্সাচালক। বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন তার দেওয়া ভাগ করা ৩ শতাংশ জমিতে। ১ শতাংশ জমিতে তিনি তার স্ত্রী আয়েশাকে (৫০) নিয়ে বসবাস করছেন। দুই মেয়ের বড় মেয়ে বিয়ের পর সন্তান জন্ম দিয়ে মারা যায়। আর ছোট মেয়ে লাকী বিয়ে করে ঘরসংসার করছেন।
আকবরের কাছে অন্য পেশা থেকে পথে ঘাটে গান গেয়ে বই বিক্রি করতে ভাল লাগে। শুরুতে একআনা, দুইআনা করে গানের বই, সিনেমার পোষ্টার, ভিউকার্ড বিক্রি করতেন। পর্যায়ক্রমে গল্পের বই, উপন্যাস, বর্ষপুঞ্জি ও নামাজ শিক্ষার বই বিক্রি করেন। যুবক বয়সে করটিয়া হাটে গান গেয়ে বই বিক্রি করতেন। তিনি করটিয়া হাটে মলম বিক্রেতা জসিমের হয়ে গান গেয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন দেওয়ান বই বিতান থেকে বাকীতে বই নিয়ে বিক্রি করে বিকেলে বই ফেরত দিয়ে বাড়ী চলে যান। উর্দু গান ভাল গাইতে পারেন বলে লোকে তাকে উর্দু গান মাস্টার খেতাব দিয়েছেন। উর্দু ছাড়া বাংলা সিনেমার অনেক গান তার মুখস্ত আছে। সেই গানগুলি সময় পেলেই নিরবে গেয়ে যান। ভাদাইমা কৌতুকের প্রথম সিডিতে তার একটা গানও আছে। যে গানের জন্য পরিচালক ফরিদ আহমেদ সাথী ১০০ টাকা সম্মানী দিয়েছিলেন।
আকবর দাবী করে টিনিউজকে বলেন, বাংলা সিনেমার নায়িকা মালতী চৌধুরী তাকে সিনেমায় গান করার জন্য প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছিল। পরবর্তীতে বাস্তবে রুপান্তরিত হয়নি। যার কারন হতে পারে সে একজন অশিক্ষিত মানুষ। বর্তমানে বয়স প্রায় ৭০ হলেও তিনি অনেক তদবির করেও সরকারের বয়স্ক ভাতার কার্ড পাননি। আকবর টিনিউজকে আরও বলেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নিকট একবার কাপড়ের জন্য গিয়েছিলেন। বঙ্গবীর তাকে একহাজার টাকা প্রদান করেছিলেন। আকবরের শরীর এখন আগের মতো চলে না। শারীরিক দুর্বলতায় বসে পড়লেই চোখে ঘুম চলে আসে। শহরে বই বিক্রি করার সময় ক্ষুধা লাগলে ফুটপাতের হোটেলে ভাত কিংবা ঝোলায় রাখা মুড়ি খান। তিনি পথে ঘাটে ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করে টাঙ্গাইল জেলার অনেক এলাকা পায়ে হেঁটেই ঘুড়েছেন। কিন্তু এখন আর পারেন না। ক্লান্তিতে তার চোখে ঘুম চলে আসে। তিনি এখন মানুষের সহানুভুতির আশায় বসে থাকেন। আর চোখে মরীচিকার মতো শেষ বয়সে একটু সুখের স্বপ্ন দেখেন।

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ