প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনের মধ্যে অন্যতম আতিয়া জামে মসজিদ

73

হাসান সিকদার ॥
বাংলাদেশের পুরোনো দশ টাকার নোটে রয়েছে আতিয়া জামে মসজিদটির ছবি। যার জন্য মোটামুটি সবার কাছে পরিচিতি আতিয়া জামে মসজিদটি। আতিয়া মসজিদের নাম একবার হলেও শোনেনি এমন ব্যক্তি হয়তো খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। মসজিদটি দশ টাকার মসজিদ নামেও পরিচিত অনেকের কাছে। সকলের দাবি দশ টাকার নোটে আবারো ফিড়িয়ে আনা হোক আতিয়া মসজিদের ছবি। টাঙ্গাইল জেলায় প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আতিয়া জামে মসজিদ। দশ টাকার মসজিদ নামে পরিচিত আতিয়া জামে মসজিদটি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় অবস্থিত।




আতিয়া জামে মসজিদ টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদ। যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে। এ গ্রামের লৌহজং নদীর পূর্ব পারে অবস্থিত আতিয়া জামে মসজিদ। লাল ইটে তৈরি এ মসজিদটির স্থাপত্য শৈলী অত্যন্ত চমৎকার। টাঙ্গাইল সদর থেকে ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া ইউনিয়নের আতিয়া গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসুল্লী ও পর্যটক আসেন এখানে। নামাজ পড়ার পাশাপাশি তারা ঘুরে দেখেন প্রাচীন ও ঐতিহাসিক এ জামে মসজিদটি। তবে, দীর্ঘ দিন সংস্কার না হওয়ায় মসজিদটি হারাচ্ছে তার নিজস্ব সৌন্দর্য। নষ্ট হচ্ছে কারুকাজগুলোও। মসজিদে আসার সড়কটিও খানাখন্দে ভরা। এলাকাবাসী, মুসুল্লী ও পর্যটকদের দাবি দ্রুত এই মসজিদ ও সড়কের সংস্কার করা হোক।




আতিয়া মসজিদটির নামকরণে রয়েছে একটি ইতিহাস। আরবি শব্দটা ‘আতা’ থেকে ‘আতিয়া’ যার অর্থ হচ্ছে ‘দানকৃত’। আলী শাহান শাহ্ বাবা আদম কাশ্মীরিকে (র.) সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ টাঙ্গাইল জেলার জায়গির হিসেবে নিযুক্ত করেন। পরে আদম কাশ্মীরি (র.) এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। আফগান নিবাসী কররানী শাসক সোলাইমান কররানীর কাছ থেকে ওই এলাকাটি দান হিসেবে পান। এলাকাটি দানসূত্রে পাওয়ায় অঞ্চলের নাম হয়েছে আতিয়া আর এলাকার নামানুসারে মসজিদটির নাম হয়েছে ‘আতিয়া জামে মসজিদ’। শাহ্ বাবা আদম কাশ্মীরি (র.) বৃদ্ধ বয়সে তাঁর প্রিয় ও বিশ্বস্ত ভক্ত সাঈদ খান পন্নীকে মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীর আতিয়া এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। সাঈদ খান পন্নী ১৬০৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ।




মসজিদটিতে সুলতানি ও মোগল আমল উভয় আমলের বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট নির্দশন রয়েছে। সুলতানি আমলের নিদর্শন হচ্ছে মিহরাব, কিবলা দক্ষিণ এশীয়দের জন্য পশ্চিমে। আর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মসজিদের খিলানসমূহ। আতিয়া মসজিদের খিলানগুলো চতুর্কেন্দ্রিক। চতুর্কেন্দ্রিক মানে হলো মসজিদটিতে চারটি দিক (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম) দিয়ে প্রার্থনা কক্ষে প্রবেশ করা যায়। কিবলা দেয়ালে তিনটি অলঙ্কিত মিহরাব রয়েছে। আর মসজিদটি টেরাকোটার ইটের তৈরি। চুন, সুরকি গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মিত। আর সুলতানি আমলে প্লাস্টার পদ্ধতি ছিল না। তারা চুন ও সুরকির গাঁথুনি দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করত। বক্রাকার কার্নিশ, সুচালো খিলান ও গম্বুজ সবই সুলতানি আমলের নিদর্শন। আতিয়া মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকের বাইরের দেয়ালে টেরাকোটার ওপর চমৎকার বৃত্তের মাঝে ফুলের নকশা করা, যা মোগল আমলের নিদর্শন।
মসজিদটির আকার দৈর্ঘ্য ১৮.২৯ মিটার , প্রস্থ’ ১২.১৯ মিটার, দেয়ালের পুরুত্ব ২.২৩ মিটার। মসজিদের চারকোনা অষ্টকোনাকৃতি মিনার রয়েছে। মসজিদটি টেরাকোটার তৈরি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মসজিদগুলো ইটের তৈরি। কারণ আমাদের এই দেশে পাথর সহজলভ্য না। পাথর দিয়ে তৈরি করতে চাইলে অন্য দেশ থেকে পাথর আমদানি করে আনতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ। আদিতে মসজিদের ছোট তিন গম্বুজগুলো পলকাটা বা ঢেউ তোলা ছিল। প্রধান গম্বুজটি ধসে পড়েছিল সে জন্য পলকাটা বা ঢেউ তোলা বৈশিষ্ট্যটি বর্তমানে বিলুপ্ত। মসজিদটি থেকে একটি আরবি ও একটি ফারসি শিলালিপি পাওয়া যায়। এই লিপিগুলো থেকে মসজিদের নির্মাতার সময়কাল জানা যায়।
রওশন খাতুন চৌধুরানী ১৮৩৭ সালে ও আবুল আহমেদ খান গজনবি ১৯০৯ সালে মসজিদটি সংস্করণ করেন। বাংলাদেশ সরকার মসজিদটি প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে চুনকামের অভাব, অবহেলা, অযত্নে হারাতে বসেছে ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য এই মসজিদটি। মসজিদটি মূলত বর্গাকৃতির এক গম্বুজ বিশিষ্ট। এছাড়া পূর্ব দিকে অপেক্ষাকৃত ছোট তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আওতকার বারান্দা রয়েছে। বারান্দা থেকে মসজিদে প্রবেশ করার জন্য রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। মসজিদের কিবলা দেয়ালে রয়েছে তিনটি অলঙ্কৃত মেহরাব। আতিয়া মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দেয়ালে রয়েছে চমৎকার সব পোড়ামাটির নকশা।




লাল ইট দ্বারা নির্মিত এই মসজিদটি আকারে বেশ ছোট। মাত্র ১৮.২৯ মিটার (৫৯ ফুট) ১২.১৯ মিটার (৪০ ফুট) এবং দেয়ালের পুরুত্ব ২.২৩ মিটার (সাড়ে ৭ ফুট)। এর চারকোণে ৪টি অষ্টকোণাকৃতীর মিনার রয়েছে। যার উপরের অংশটি ছোট গম্বুজের আকৃতি ধারণ করেছে। সুলতানি ও মুঘল– এই দুই আমলেরই স্থাপত্যরীতির সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে এই মসজিদের নির্মাণ শৈলীতে। নকশা, অসংখ্য ফুলের অলংকরণের কারণে আতিয়া মসজিদ বেশ দৃষ্টিনন্দন। এ ধরনের অলংকরণ ষোলো শতকে নির্মিত গৌড়ের জাহানিয়া মসজিদ ও কদম রসূল ইমারতে পরিলক্ষিত হয়। আতিয়া মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর কুঁড়ে ঘরের কার্নিসের ন্যায় ধনুক বক্রাকার কার্নিস যা সম্পূণরুপে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যরূপে পরিগণিত। বস্তুত বাঁশের চালাঘর থেকে ইটের নির্মাণে এ ধরনের উদ্ভাবন শিল্পমানে আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত।




মসজিদের মুসল্লি মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী টিনিউজকে বলেন, ইতিহাস ঐতিহ্যের এই মসজিদটি এখনও অনেক সুন্দর। তবে মসজিদ সংস্কার করা প্রয়োজন। অযতœ আর অবহেলায় পড়ে আছে মসজিদটি। স্থানীয় মুসল্লি সাদেক আলী (৫৬) টিনিউজকে বলেন, ৩০ বছর যাবৎ এ মসজিদে নামাজ আদায় করছি। অনেকেই মসজিদটি দেখতে আসেন। কিন্তু কেউই মসজিদটি সংস্কার করার কথা বলেন না। স্থানীয়দের করা একটি মসজিদ পরিচালনা কমিটি এর দায়িত্ব পালন করছেন। ওই কমিটিই বহন করছে মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিমের বেতনসহ আনুসাঙ্গিক খরচ। শুধু সরকারিভাবে মসজিদের জন্য ১শ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল ফ্রি আছে। এর উপরে বিল আসলে সেটিও পরিশোধ করছে ওই কমিটি। এছাড়া সরকারিভাবে রাখা হয়েছে একজন পাহারাদার। আতিয়া জামে মসজিদ কমিটির সাবেক হিসাব রক্ষক আব্দুল করিম টিনিউজকে বলেন, মসজিদের যতটুকু সংস্কার কাজ হয়েছে, সেটা স্থানীয়দের সহযোগিতায়। সরকারিভাবে কোনো কাজ হয়নি। ছাদের উপরে ফাটল রয়েছে। এতে বৃষ্টির দিনে চুয়ে চুয়ে পানি পড়ে। মসজিদটি দ্রুত সংস্কার করার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাই।




মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ফরিদ উদ্দিন আহাম্মেদ টিনিউজকে জানান, প্রায় ১৮ বছর যাবৎ এ মসজিদে কর্মরত আছি। বিগত ২০০১ সালের পর থেকে মসজিদটিতে কোনো চুনকাম করা হয়নি। বিভিন্ন অংশে শ্যাওলা জমে কালো হয়ে গেছে। দেয়ালের কিছু ইট-বালিও খসে পড়ছে। মসজিদটির প্রধান গম্বুজের একটি অংশ ভেঙে পড়ায় বৃষ্টি হলে মসজিদে পানি পড়ে। বিশেষত বর্ষাকালে মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে দুর্ভোগে পড়তে হয়। মসজিদটির সংস্কার দায়িত্ব পুরাতত্ত্ব বিভাগ পালন করলেও নতুন করে সংস্কার কাজ করেননি তারা। মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এ বিভাগের পক্ষ থেকে একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ দেয়া আছে।




আতিয়া মসজিদ পরিচালনা কমিটির সম্পাদক মাসুদুর রহমান টিনিউজকে বলেন, ৪শ’ বছরের প্রাচীন আর ঐতিহাসিক এই আতিয়া জামে মসজিদ। প্রায় ২০ বছর যাবৎ এই মসজিদ পরিচালনা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি আমি। বিগত ১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের আমলে বাংলাদেশ সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ এই আতিয়া মসজিদ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর তাদের তত্ত্বাবধানে দুইবার মসজিদটির কিছু সংস্কার হয়। এ সময় মসজিদের দেয়ালের খসে পড়া কিছু ইট লাগানোসহ চারপাশে চুন সুড়কি দিয়ে দেয়াল পাকা করার কাজটি করেন তারা। এছাড়া নিয়োগপ্রাপ্ত একজন পাহারাদারকে বেতন দিচ্ছে এ বিভাগ। মসজিদের দুইটি পুকুর থেকে পাওয়া টাকা আর স্থানীয়দের মাসিক চাঁদায় ঈমাম ও মুয়াজ্জিমের বেতন দেয়াসহ চলছে আনুসাঙ্গিক খরচ। ঐতিহ্য রক্ষার্থে দ্রুত মসজিদটির সংস্কার দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ পুরাতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক রাখি রায় মুঠোফোনে টিনিউজকে বলেন, সংস্কার তালিকায় আতিয়া মসজিদের নাম আছে। সিরিয়াল অনুসারে আমাদের সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আগামী বছর অর্থ বরাদ্দ পেলে ও সংস্কার প্রয়োজন আছে কিনা পরিদর্শন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

 

ব্রেকিং নিউজঃ