পাহাড়ের ফুল ঝাড়ু কারখানা এখন টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে

74

স্টাফ রিপোর্টার ॥
পাহাড়ে ফুলঝাড়ুর চাহিদা বাড়ছে দিনদিন। কারণ অন্যান্য ঝাড়ুর চেয়ে এটি সহজে ব্যবহার করা যায় এবং বেশী কার্যকরী। দেশের সব জায়গায় এই ফুলের ঝাড়ুর ব্যবহার অনেক বেশী। আর এ পেশার সঙ্গে পাহাড়ি ছাড়াও অন্যান্য বাঙালি জনগোষ্ঠীর লোকজনও জড়িয়ে পড়েছেন। দিনে দিনে পাহাড়ের ফুলঝাড়ুতে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বিভিন্ন হাত ঘুরে পাহাড়ের ফুলঝাড়ু কারখানা এখন টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সারা ফেলেছে।
একেবারে যমুনার পাড় ঘেষা টাঙ্গাইলের অনগ্রসর পিছিয়ে পড়া বিস্তৃর্ণ কালিহাতি উপজেলার চরাঞ্চলের গোহালিয়া বাড়ি ইউনিয়নের নদী ভাঙন কবলিত গ্রাম বেলটিয়া বাড়ির আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে ফুলের ঝাড়ু তৈরির কুটির শিল্পের কারখানা। ছোট এই গ্রাম, যেখানে কিছুদিন আগেও প্রতিনিয়ত ভর করতো অভাব, অনটন, পারিবারিক কলহ, ছোট-বড় এনজিওদের ঋণের টাকা তোলার কটু আর অস্থিতিশীলতা তৎপরতা। ছিলো বেকারত্বের বোঝা, দুঃখ-হতাশা আর নানান যন্ত্রণাময় জীবনের পথচলা। এখন হঠাৎ করেই এগুলোর দেখা নেই। ঝগড়া ঝাটির সময় নেই, আগ্রহ নেই এনজিও কর্মীদের কাছে ঋণের জন্য ধরণা দেওয়া। এখন শুধুই কর্ম চঞ্চল বেলটিয়া বাড়ির ছোট-বড় ফুলের ঝাড়ু তৈরির কারখানাগুলোতে।
বেলটিয়া বাড়ির ছোট-বড় সব মিলিয়ে ১৭টি ফুলের ঝাড়ুর কারখান গড়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে। একই সাথে বেড়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এতে করে আশেপাশের গ্রামের কর্মহীন মানুষের নারী-পুরুষের রোজগারের পথও খুলেছে। বেলটিয়া এলাকার শিশুরাও বড়দের মতো এই গাছ থেকে ঝাড়ু বানাতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। মুলত খাগড়াছড়ির পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা ও তার পাশের জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও সাজেকের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব পাহাড়ী ফুল সংগ্রহ করা হয়। তারপর এখানে এনে ফুল ছাড়– তৈরি করা হয়। এসব কারখানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সমান দূরত্বে পাশাপাশি পাঁচজন একমনে সেরে নিচ্ছে নিজ নিজ কাজ। এমন ব্যস্ততা যে ঝুম বৃষ্টি কিংবা বাজ পড়াও তাদের মনোযোগকে সরাতে পুরোপুরি ব্যর্থ। সব থেকে বয়জেষ্ঠ্য জন দ্রুত পাটশোলার চিকন আটি তৈরিতে ব্যস্ত। তার পাশের জন সমান করে কেটে দিচ্ছে শুকনো চিকন পাটশোলা। তারপরের জন সূদুর খাগড়াছড়ি থেকে নিয়ে আসা বিশেষ ধরনের শুকনো ফুলের ছড়াগুলি আলাদা করছে নিঃশ্বব্দে। আর বাকি মানুষটি পাটশোলার আটির চারপাশে এমন ভাবে ফুলের ছড়াগুলি গুছিয়ে বাধছে দেখে কেউ ভাবতেই পারে কোন নিখুত শিল্পীর ফরমাইশি বিশেষ ধরনের ফুলের তোড়া বানাচ্ছে একমনে। এতো গেলো বারান্দার দৃশ্য। ঘরের ভিতরও মুখোমুখি বসেছে পাঁচজন করে দশজন। তারাও সবাই ব্যস্ত একই কাজে।
নতুন এ সুযোগ তৈরি হওয়ায় ফুলের ঝাড়ুর কুটির শিল্পের সাথে যুক্ত পরিবারগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে আর্থিক সক্ষমতা যেমন বেড়েছে। তেমনি উন্নত হয়েছে গ্রামের আর্থ সামাজিক অবস্থার। সব থেকে বড় অর্জনটি হয়েছে মহিলাদের কর্মসংস্থান এবং তারা খুব দ্রুত স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে কুটির শিল্পটির অপার সম্ভবনা। দেশের উওর, মধ্য এবং দক্ষিণঞ্চালের অনেক জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে টাঙ্গাইলের উৎপাদিত ফুলের ঝাড়ু। ফুলের ঝাড়ু কারখানার সব কর্মীই রোজগার করে উৎপাদনের ভিত্তিতে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে উৎপাদন বাড়ায় পুরুষ কর্মীদের সমান হারে যুক্ত হয়েছে গ্রামের নারীদেরও। নারীরা মূলত স্বচটেপ দিয়ে পেচিয়ে ফুল ঝাড়ুর শেষ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার কাজ করে। পুরুষ কর্মীরা বিভিন্ন মাপের ভিন্নতায় কখনও তিন, চার, কিংবা পাঁচ টাকা দরে প্রতিটি ঝাড়ুর প্রধান কাঠামো তৈরি করে। আর রং তুলির শেষ ছোঁয়া হিসেবে স্বচটেপ পেচিয়ে নারী কর্মীরা পায় কখনও পঞ্চাশ কিংবা ষাট পয়সা প্রতি ঝাড়ুতে। বাড়ির সব কাজ শেষ করে অবসর সময়ে তার নিজ ঘর অথবা বাড়ির উঠানে বসেই শেষ করে তাদের নির্ধারিত কাজ। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সকাল বেলা কারখানা থেকে নিয়ে আসে ঝাড়ুর মূল কাঠামো। আর সন্ধ্যায় পৌঁছে দেয় বিক্রির উপযোগী করে তোলা ফুলের ঝাড়ুগুলি। পুরুষ কর্মীরা দিনে দক্ষতা ভেদে পাঁচ, ছয়, সাতশত টাকা পর্যন্ত রোজগার করতে পারলেও মহিলা কর্মীরা দিনে গৃহস্থলীয় কাজ শেষে বাড়তি আয় করতে পারে দেড় থেকে দুইশত টাকা।
কুটির শিল্পটির উদ্যোগক্তারা টিনিউজকে জানিয়েছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়ায় সস্তা শ্রম, স্বল্পমূল্যে গুদাম আর কারখানার প্রাচুর্যতা তাদের এ চরাঞ্চল মুখি করে তুলেছে। সব থেকে বড় কারণ হচ্ছে বেলটিয়া বাড়ি গ্রাম ও আশেপাশের কর্মীরা তুলনামূলক অনেক বেশি দক্ষ হওয়ায় তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা এবং কদর বেড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
এছাড়া প্রাকতিক দূর্যোগ প্রবণ এ দেশের কৃষি নির্ভর শ্রমিকদের বছরের সব সময়, সব মৌসুমে কাজের সুযোগ ও পারশ্রমিক ওঠানামা করায় তারাও স্বাচ্ছন্দে এ কাজকে আপন করে নিয়েছে। প্রতিটি কারখানায় নারী-পুরুষ মিলে গড়ে ৩০ জন কর্মী কাজ করছে। যা চাহিদার সাথে সাথে শ্রমিকদের সুযোগ বাড়ছে। ইসরাত আম্মু কুটির শিল্পের উদ্যোগক্তা পাষান টিনিউজকে বলেন, কমপক্ষে এ চরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ পরিবার এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। আর এর মাধ্যমে টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার গোহালিয়া বাড়ি ইউনিয়নে বেলটিয়া বাড়ি গ্রাম ও আশেপাশের অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে প্রতিনিয়তই বিশেষ অবদান রেখে চলছে। যা এক পিছিয়ে পড়া চরাঞ্চল মানুষের ভিন্ন ধরনের সফলতা।

 

ব্রেকিং নিউজঃ