পাকিস্তানিদের গুলিতে প্রাণ দিতে হয় বাবাকে ॥ পরিবারের দাবি শহীদ স্বীকৃতির

73

এরশাদ মিঞা, মির্জাপুর ॥
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জন্ম আমার। মা নাম রেখেছেন ‘মুক্তি’। ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়েছে। মা ও ভাই-বোনদের আদরে বড় হয়েছি। জন্মের পর বাবাকে পাইনি। বাবার আদর-সোহাগ ভালোবাসা কি বুঝতে পারিনি। বড় হয়ে শুনতে পারলাম রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানিরা বাবাকে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কুমুদিনী হাসপাতালের দেয়ালের সাথে দাঁড় করিয়ে কয়েকটি গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছর পার হলেও বাবাকে সরকারি ভাবে শহীদ স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।




এসব কথা বলতে বলতে মুক্তির দুই চোখ বেয়ে জল পড়ছিলো। মুক্তি মির্জাপুর উপজেলা সদরের পুষ্টকামুরী গ্রামের শহীদ মাজম আলী শিকদারের মেয়ে।
শহীদ মাজম আলী শিকদারের বড় মেয়ে লাইলী বেগম জানান, বাবার জন্য গর্ব হয়। আমাদের বাসায় মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের আশ্রয় প্রশয়ে থাকা এদেশীয় রাজাকাররা মির্জাপুরে লুটপাট করতো। আমার বাবা লুটপাটের প্রতিবাদ করতেন। বাসায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় এবং লুটপাটের প্রতিবাদ করায় রাজাকারদের সাথে বাবার বিরোধ শুরু হয়।




রাজাকাররা বাবাকে হত্যা করার নানা পরিকল্পনা করে। তাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গোড়াইল গ্রামে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দেয়। ১৯৭১ সালে ৮ মে (শুক্রবার) আমি টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে মির্জাপুরে বাড়ি আসি। এসেই শুনি রাজাকাররা বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানিরা আমার বাবাকে কুমুদিনী হাসপাতালের প্রাচীরে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলে, কিন্তু আমার বাবা জয় বাংলা বলেছে। এভাবে কয়েকবার বলার পর পাকিস্তান জিন্দাবাদ না বলায় কয়েকটি গুলি করে আমার বাবাকে হত্যা করে। পরে টেনে হিচরে পুষ্টকামুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে রাখে। আমার বাবার মরদেহ দেখতে পারিনি দাফনও করতে পারিনি। সেখান থেকে রাজাকাররা আমার বাবার মরদেহ বংশাই নদীতে ভাসিয়ে দেয়। শুনেছি গোড়াই এলাকায় কুকুর শেয়ালে কামড়ে খেয়েছে আমার বাবাকে।




আমারা সরকারি ভাবে শহীদ পরিবার হতে পারলাম না, হতে পারলাম না মুক্তিযোদ্ধার পরিবার। প্রধানমন্ত্রীর বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার বাবার নামে ৪২৫ ও ১৪ নম্বর স্বারকে দুইবার দুই হাজার টাকা করে দিয়েছেন। অনেক দু:খ কষ্টের মধ্য দিয়ে সাত ভাইবোন বড় হয়েছি। স্বাধীনতার পর আমার মা উপজেলার গোড়াই এলাকায় এক মুক্তিযোদ্ধার কাছে আমাকে বিয়ে দেন। সে সরকারি চাকরি করতেন। দেশের বিভিন্ন উপজেলায় তার বদলি হতো। মা, ছোট তিন বোন ও তিন ভাইকে বাড়িতে রেখে স্বামীর সাথে থাকতে হতো। মা ভাই-বোনের কথা চিন্তা করে স্বামীর সংসারে থাকা হয়নি। অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে ভাই-বোনদের নিয়ে দিন পার করতে হয়েছে। আমাদের কথা চিন্তা করে তৎকালীন সংসদ সদস্য টাঙ্গাইলের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান খান ফারুক চাচা আমাকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি দেন। এরপর থেকেই ভাই-বোনদের কাছে থেকে তাদের বড় করেছি। বাবাকে হত্যার সময় ছোট বোন মুক্তি মায়ের গর্ভে ছিলো। আমি বাবার আদর কিছুটা পেলেও ছোট ভাই-বোন তেমন আদর পায়নি। বাবার জন্য গর্ব হয়। তবে বাবাকে সরকারি স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি জানাচ্ছি।




মাজম আলী শিকদারের ছেলে মিজানুর রহমান জুয়েল ও মাহবুব হোসেন জানান, ‘আমরা কত না অভাগা! কিছু বুঝার আগেই পাকিস্তানিদের গুলিতে বাবাকে হারাতে হয়েছে। পাইনি বাবার আদর যতœ ভালোবাসা। বড় হয়ে শুনতে পারলাম বাসায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় থাকা এবং রাজাকারদের লুটপাটের প্রতিবাদ করায় বাবাকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এসময় মাজম আলীর দুই মেয়ে জিয়াসমিন আক্তার ও মিনু বেগম বাবার কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।




শহীদ মাজম আলীর বড় ছেলে আলী হোসেন শিকদার জানান, ‘আব্বার চেহারা কেমন ছিল তা- আর মনে করতে পারি না। তাঁর কোনো ছবিও নাই। আব্বার আদর-ভালোবাসা থেইকা আমাদের বঞ্চিত করছে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। আব্বা কী জিনিস তা বুঝার আগেই পাকিস্তানিদের বুলেট কাইড়া নিছে তাঁরে। রাজাকাররা আইসা আমাদের দুটি বাড়ির ঘর আগুন দিয়া পুড়িয়া দিছে। ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহের শুক্রবার। ওই দিন রাজাকার মওলানা অদুদের নেতৃত্বে বাবাকে ধরে নিয়ে কুমুদিনী হাসপাতালের প্রচীরে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানিরা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলে। এভাবে তিনবার বলতে বললে বাবা প্রতিবারই জয় বাংলা বলে। জয় বাংলা বলার পর পরই তিনটি গুলি করে বাবাকে হত্যা করে তারা। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান খান ফারুক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর এনায়েত হোসেন মন্টু বিভিন্ন সভা সমাবেশে আবার বাবার ইতিহাস তুলে ধরেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছর পার হলেও আমরা সরকারিভাবে শহীদ স্বীকৃতি পায়নি।
স্বাধীনতার পর কুখ্যাত রাজাকার মওলানা অদুদকে আমিসহ আমার দুই চাচা আবুল কাশেম কাচ্ছেদ ও ইছব, আমাদের গ্রামের বজলুর রহমান ও নোয়াব আলী ধরে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করি। সে কারণেও আমরা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির দাবিদার হতে পারি।




তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দিলেন, কিন্তু তার স্মৃতিটুকু ধরে রাখার জন্য মির্জাপুরে কোথাও কোন স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। পায়নি শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি। এ বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যান্ত পিরাদায়ক।
এর আগের দিন পাকিস্তানিরা মির্জাপুর, সাহাপাড়া ও আন্ধরা গ্রামের নিরীহ বেশ কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া সন্ধায় নারায়গঞ্জের বাসা থেকে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে সহ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। তাদের মরদেহও পরিবার খুঁজে পায়নি। মমতাময়ী মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা সরকারিভাবে শহীদ পরিবারের স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি।

 

ব্রেকিং নিউজঃ