নির্বাচিতরা আলুটা ও মুলাটা উপহার দিলে মানুষ তাদের একদিন প্রত্যাখান করবে

115

Capture25ফাহাদ শাওনঃ

ভোটের আগে কত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। ভোটের পরে সেই সব প্রতিশ্রুতির পাহাড় বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি মেয়র ও কাউন্সিলররা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অতীত ইতিহাস স্বাক্ষী দেয় জনকল্যাণে কাজের পরিমানটা খুবই কম। নিজের কল্যাণেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। এবারও তাই করবেন এই প্রতিনিধিরা এমন প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। টাঙ্গাইলে আটটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ৭-১ গোলে জয়লাভ করেছেন।
সংসদ নির্বাচন হোক আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হোক না কেন প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির শেষ নেই। মহৎ কাজের উদ্যোগ কাজের কত কথাই না দিয়েছিলেন তারা ভোটারদের মন জয় করার জন্য। ভোটারাও বিশ্বাস করে তাদের মূলবান ভোটটি দিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর কেউ প্রতিশ্রুতি রক্ষায় একশ’ দিনের কর্মসূচি ঘোষনা করেছেন। যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলো বাস্তবায়ন করার।
টাঙ্গাইল পৌরসভার নবনির্বচিত মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা জামিলুর রহমান মিরন বলেন, তার প্রথম কাজ হবে প্রতিটি এলাকায় মুরুব্বিদের নিয়ে কমিটি করা। এই কমিটিগুলো কোথায় কি উন্নয়ন করতে হবে ঠিক করবেন। সেই অনুযায়ী কাজ করা হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য সর্ব শক্তি নিয়োগ করবেন। পৌরসভার দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দূনীতি দূর করবেন। একইভাবে টাঙ্গাইলের ৮টি পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র কাউন্সিলরাও একই রকম কথা দিয়েছেন। নির্বাচনে বিজয়ীরা হলেন- মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন সুমন, সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের পৌর কমিটির সদস্য আবু হানিফ আজাদ, ভুঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক মাসুদুল হক মাসুদ, গোপালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হক ছানা, মধুপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ, ধনবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম তপন, কালিহাতী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক আলী আকবর জব্বার।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, পৌর নির্বাচনের পরে আইন শৃঙ্খলা শান্তিপূর্ন রাখার জন্য নিরাপত্তা কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে মোতায়েন রাখা হয়েছে। যাতে কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। আশা করি টাঙ্গাইলে এমন কিছু ঘটবে না।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন বলেন, কোন প্রকার বিজয় মিছিল করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোন প্রকার রংয়ের মিছিলও করা যাবে না। হামলা মামলা করা চলবে। সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোর নজরদারী রাখা হয়েছে। ভ্রাম্যমান আদালতও বহাল রাখা হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহের জানান, দলীয়ভাবে নির্বাচনে নিজ দলের প্রার্থীদের জয়যুক্ত করতে সবাই একত্রে কাজ করেছেন। কখনও মাঠে আবার কখনও দূও থেকে প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের উৎসাহ যুগিয়েছেন। নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীরাই জয়লাভ করেছে। তারা সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।
এদিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম তোফা জানান, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ট হয়নি। সরকার জনগণকে একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পৌরসভা নির্বাচন উপহার দিতে পারেনি। যদি তা দিতে পারতো তাহলে আট পৌরসভার মধ্যে বেশীর ভাগ পৌরসভায়ই বিএনপি প্রার্থীরা জয়লাভ করতো।
টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ রৌফ বলেন, টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ থেকে যারা মেয়ের হয়েছেন তারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা রক্ষা করতে পারবেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নে বিশ্বাস করেন। তাছাড়া দলীয় চাপও থাকবে মেয়রদের উপর। কারণ এবারই প্রথম দলীয় পরিচয়ে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে দলের সুনামের বিষয়টি জড়িত।
পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের আটটি পৌরসভায় সাধারণ ভোটারদের সামনে নানামুখী উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। নিজেকে যোগ্য ও উন্নয়নমনা প্রমান করতেই প্রার্থীরা এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। না আওয়ামী লীগ, না বিএনপি সব দলের প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে কমতি নেই। যদিও জেলার পৌর এলাকার রাস্তা ঘাট থেকে শুরু করে উন্নয়নমুলক তেমন কাজ চোখে পড়ার মতো নেই। তবুও প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির প্রতি সাধারণ ভোটারদের দুর্বলতা ছিল।
টাঙ্গাইল জেলা যুব লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন মানিক বলেন, দলীয় মেয়ররা উন্নয়ন কাজ না করলে ভবিষ্যতে তারা দলেও ভাল অবস্থানে থাকবে না। কারণ দলীয় পরিচয় অনেক বড় হয়ে উঠে এসেছে। দলের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তাদেও কাজ করতেই হবে। উন্নয়ন কাজের কোন বিকল্প নেই। জেলা আওয়ামী লেিগর পক্ষ থেকেও মেয়রদেও কাজের ওপর নজর থাকবে বলে নির্বাচনের আগেই আলোচনা হয়েছে।
ভোট গ্রহণের আগে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনিত মেয়র প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে ও ক্ষমতা গ্রহণের প্রথমেই পৌরবাসীর অবহেলিত জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবেন। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজ করে যাবেন। পৌরবাসীর নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নির্মূলসহ সামাজিক অবক্ষয়রোধে সর্বোচ্চ পদক্ষেণ গ্রহণ করবেন। পৌরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় কমিউনিটি পুলিশের দায়িত্ব বৃদ্ধির প্রতি সুদৃষ্টি দেবেন। এছাড়া সন্ত্রাস, ভুমিদস্যু রোধ করা হবে। সেই সাথে পৌর এলাকায় লাইটিং, পাঁকা রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। এখন যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদেও এখন কাজ করার পালা।
অন্যদিকে বিএনপি মনোনিত মেয়র প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা নির্বাচিত হলে অবহেলিত পৌরসভার উন্নয়নের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধার দিকে নজর দেবেন। পয়ঃনিস্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সন্ত্রাস দমন ও মাদক নির্মূলে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি পৌরবাসীর নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তারা সামাজিক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলেও জানান।
প্রার্থীরা এ রকম কিছু সুনিদিষ্ট প্রতিশ্রুতির কথা জানালেও সমর্থকরা প্রার্থীর পক্ষে এর অধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় জানা যায়, নির্বাচনী প্রচরণায় বলে থাকে “আসবে এবার শুভদিন ধানের শীষে ভোট দিন” “উন্নয়ন যদি দেখতে চাই-নৌকা ছাড়া গতি নাই,” আবার বর্তমানে মেয়র পদে থাকা প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থকরা বলছেন “পুরানো চাউল ভাত বাড়ে” নতুন প্রার্থীর পক্ষের সমর্থকরা বলছে পুরোনো লোককে দেখলেন এবার নতুন করে আমাকে দেখেন, একবার সেবা করার সুযোগ দিন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা এগুলো কথার কথা। প্রচার মাধ্যম মাত্র। তারা আরো বলেন “ভোটের আগে ভাই-ভাই, ভোটের পরে নাই-নাই, হিন্দু-মুসলিম ভাই-ভাই মাদকমুক্ত সমাজ চাই।” এমন উক্তির বিপক্ষে ভোটাররা বলছেন, প্রতিবার ভোট এলে আমাদের কদর বাড়ে। কিন্তু ভোটের পর আর কোন খবর থাকে না। তারপরও ভোট অনেক আনন্দের। এবার শুধু প্রতীক নয়, যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিব।
জেলার সাধারণ মানুষ বলেন, টাঙ্গাইলের আটটি পৌরসভাতেই যারা বিজয়ী হয়েছেন, তারা যদি যথাযথ উন্নয়ন কাজ জনগনকে উপহার দিতে না পারে ভবিষৎতে তাদের পরিনতি খুব একটা সুখকর হবে না। কারণ মানুষকে শুধু আলুটা ও মুলাটা উপহার দেন, তাহলে মানুষ তাদের একদিন প্রত্যাখান করবে।

ব্রেকিং নিউজঃ