ধূপের সুগন্ধ ছড়িয়ে জীবনের গ্লানি বিতাড়নের লড়াই রেনু বালার

159

55স্টাফ রিপোর্টারঃ

কুড়িয়ে পাওয়া নাম গোত্রহীন এক শিশু। বন্য জন্তুর মুখ থেকে এনে রাখা হয়েছে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আমবাড়িয়া গ্রামের প্রধান সড়কে। নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে ভাঙ্গা গলায় গোংরাচ্ছে নবজাতক। চতুর্দিকে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। কার বাচ্চা, কেন ফেলে রেখে গেছে হাজারো প্রশ্ন। জবাব দেয়ার পাল্লা ভারী হলে বিড়ম্ভনার আশঙ্কায় নবজাতক কুড়িয়ে আনা ব্যক্তি সটকে পড়লো। ভিড় কমতে লাগলো। শিশুটির গলা কাঁপা ও ক্ষীণ হচ্ছিলো। আশ্রয় দিতে সবাই বিমুখ তখন এগিয়ে এলো এক ভিখারীনি। সযত্নে কোলে তুলে নেয়। দশগেরাম ঘুরে মাগন করে ফেরা ওই ভিখারিনীর হাত বদলে একদিন নবজাতকের ঠাঁই হলো গোপালপুর উপজেলার নলিন বাজার নিষিদ্ধ পল্লীতে।
সেখানে নামও জুটলো একটা। রেনু বালা। সেখানেই শিশু ও কৈশোর কাল। পরিচয় সর্দারনি দেলজান বিবির দ্বাদশতম কণ্যা। যৌবনে পা না পড়তেই পাড়ার আর দশ মেয়ের মতোই রেনুবালার অন্ধকার জীবন শুরু। সকাল-বিকাল আর রাত জুড়ে বিরতিহীন খদ্দের সেবা। জীবনের আরেক গল্প খদ্দেরের সাথে গতানুগতিক সেই প্রেম। সংসার বাঁধার স্বপ্নে পাড়া থেকে পালানো। প্রেমিক কাদের মিয়ার সিরাজগঞ্জের গোখলা গ্রামের বাড়ি গিয়ে মিললো তিন সতীন। চুলোচুলি, খিস্তিখেউড়, হেঁশেলের জলন্ত খোঁচানির ঘায়ে শরীর দগ্ধ। সঙ্গে নেয়া সোনাদানা আর টাকা ফুরোলেই চুলের মুঠি ধরে বিদায়। এতক্ষনের যে বর্ণনা তা আহামরি কোনো গল্প বা ঘটনা নয়। হাজার বছর ধরে পুরুষ শাসিত সমাজে অহরহই ঘটছে এসব। তবে পার্থক্য, অন্ধকার জগৎ থেকে রেরিয়ে যাওয়া আর দশজনের মতো রেনু বালা ভিক্ষার পাত্র হাতে নেয়নি। জীবনের শেষ প্রান্তে নিজের মতো করে বাঁচার সংগ্রামে লড়ছে। রেনুবালার বর্তমান ঠিকানা গোপালপুর পৌরসভার কোনাবাড়ি মহল্লায়। ডাকবাংলো মোড় ধরে একশ’ গজ সামনে এগুলেই চালচুলোহীন জীর্ন ঘর। তাও আবার উঠুলি। সেখানেই কথা হয় তার সাথে।
প্রতিবেদকের সামনে জীবনের উপরোক্ত গল্প উপস্থাপন করেন রেনুবালা। বর্তমানে রেনু বেওয়া। জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্ম তারিখ ১২ মার্চ ১৯৫৬। এটি আনুমানিক বয়স।‘যার জন্মের ঠিক নেই তার আবার জন্ম তারিখ কিসের, তার পরেও নাগরিক পরিচয়পত্র সংগ্রহের খাতিরে ওই মনগড়া সন তারিখ বসানো হয় বলে জানান রেনু।’ সর্দারনি দেলজান তাকে গান-নাচ শিখিয়েছিলেন। এজন্য গায়েগতরে ময়লা থাকলেও চাহিদা ছিল। সত্তরের দশকে গোপালপুর পৌরশহরে নিবারন চন্দ্র ‘ভৌমিক সার্কাস পার্টি’ গঠন করলে দেলজান বিবির নিকট থেকে ভাড়ায় আনা হয় রেনুকে। নাচগান ছাড়াও সঙ সেজে আনন্দ দিতেন সার্কাস দর্শকদের। যাত্রাপালায় নাচের ছুকরি হিসাবেও ভাড়া খেটেছেন অনেক দিন।
স্মৃতি হাতড়ে রেনু জানায়, ১৯৮১ সালে নলিন বাজারের গনিকালয় তুলে দেয়া হয়। এর আগে কুঠির বয়রা, ভেঙ্গুলা, হেমনগর, নন্দনপুর ও হাদিরা বাজারের নিষিদ্ধ পল্লী অমানবিকভাকে উচ্ছেদ করে। যারা পল্লীতে স্ফূর্তি করতো, যার টাকায় মদ গিলতো, বউবাচ্চার জন্য চালডাল, পরনের কাপড় কিনে নিয়ে যেতো, তারাই সেদিন মাথায় টুপি পরে মুসলী সেজে মিছিল নিয়ে হামলা ও মারপিট করে আমাদের ঘরছাড়া করে। সব লুটে নিয়ে যায়। আমাদের কেনা সাবকবলা জমিসহ পাড়ার পুরো জমি রাতারাতি জবরদখল করে প্রভাবশালীরা। থানা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও কোনো লাভ হয়নি। পাড়ার অনেকের আত্মীয়স্বজন ছিল। আমারতো কেউ ছিল না। তাই পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত নারী পাচারকারিদের খপ্পরে পড়লাম। ভারতে গিয়ে আবার সাত বছরের নরক যন্ত্রনা। উত্তর ভারতের ওই পাড়া থেকে কৌশলে পালিয়ে আজমির শরীফ। মাজারে গিয়ে জীবনকে নতুন করে সাজানোর শপথ। পাঁচশ টাকায় একটি ধুপদানি কিনে ৮৮ সালে দেশে ফেরা। ওই ধূপদানিই এখন সম্বল। একটানা তিন দশক ধরে প্রত্যেক সন্ধ্যায় গোপালপুর বাজারের দেড় শতাধিক দোকানপাট ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে জ্বালানো পাত্র থেকে ধূপ ছড়িয়ে থাকে।
বাজারের অনেক ব্যবসায়ীরা জানায়, আমরা ব্যবসায়ীরা এমনিতেই সন্ধ্যার সময়ে দোকানপাটে ধূপ দেয়ায় অভ্যস্থ। এর বহুবিধ উপকার রয়েছে। মশামাছি দূর হয়। রোগ, জীবানু কাছে ভিড়তে পাওে না। রেনু কয়েক যুগ ধরে পৌর শহরের সব দোকানপাটে ধূপ দেয়ার কাজটি করে আসছে। এ কাজের জন্য দোকানিরা খুশি হয়ে তিন-চার টাকা করে বখশিস দেই। ধূপ দেয়ার সময় রেনু গায়ে জড়ায় লাল মেক্সি। ওপরে কালো শার্ট। মাথায় টিয়া রংয়ের ওড়না। এ সময়ে কারো সাথে কথা বলে না সে। এক দেড় ঘন্টা দ্রুত পায়ে ধূপ দেয়ার কাজ সেরে ধূপদানি নিয়ে সোজা বাড়ি চলা। ধূপ দেয়া থেকে মাসে আয় এক দেড় হাজার টাকা। এ দিয়ে তার পেট চলে।
রেনু জানায়, এখনো তাকে আাদিম পেশার খোটা শুনতে হয়। এজন্য কপালে বয়স্ক ভাতা বা দুঃস্থ কার্ড জুটেনি। তার অভিযোগ ‘জীবনের সবটুকু সময় কাটালাম নলিন আর গোপালপুর পৌর শহরে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহে পৌর কাউন্সিলর সহযোগিতা করেনি। আমার বাবা-মার নাম জানতে চায়। কমিশনারকে বুঝাতে পারিনি যে, আমার মতো মানুষের কোনো বাবা-মা থাকে না।’ পরে এক লোকের সহায়তায় জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার মুল বাড়ি গ্রামের ঠিকানায় ২০১৩ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে রেনু। তার বক্তব্য ‘সংসারে নিজের কেউ ছিল না। এখনো কেউ নেই। বাড়ি নেই। থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। উঠুলি থাকি। তারপরও কোনো দুঃখবোধ নেই। সারা জীবন সমাজের দুর্গন্ধযুক্ত মানুষের ভোগের সামগ্রী ছিলাম। দুর্গন্ধ আর গ্লানি জীবনে লেপ্টে আছে। ধূপ ছড়িয়ে জীবনের গ্লানি সুগন্ধে ভরিয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছি।’

ব্রেকিং নিউজঃ