দেলদুয়ারে গৃহকর্মীর কাজ করে ছেলেকে ডাক্তার বানালেন রোকেয়া

150

স্টাফ রিপোর্টার ॥
ছিলনা স্বামীর বাসগৃহ আর যতসামান্য কৃষি জমি। সম্পদ বলতে ছিল যার বড়বোনের দেয়া দশ শতাংশ জমির উপর মাথা গোঁজার মত ঠাঁই নামক টিনের একটি ঘর। এতেই ছিল স্বামী, স্ত্রী আর চার সন্তান নিয়ে পরিবারটির বসবাস। এরপরও প্রায় দুই যুগ আগে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে ছোট রেখে মৃত্যুবরণ করেন পরিবারের একমাত্র অভিভাবক কৃষক আসকর আলী। তবে এতেও থমকে যায়নি জীবন সংগ্রামী আর স্বামীহারা রমণী রোকেয়া বেগম (৫০)। অন্যের সাহায্য, সহযোগিতা, বাসা বাড়ি আর অফিসে কাজ করে ছেলেকে বানিয়েছেন প্যারামেডিকেল ডাক্তার। শুধু ছেলেকে ডাক্তার বানিয়েই ক্ষ্যান্ত নন, ছোট মেয়েকে মাস্টার্স আর মেজ মেয়েকে এইচ.এস.সি পাশ করিয়ে বিয়েও দিয়েছেন তিনি। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া ইউনিয়নের ভুরভুরিয়া গ্রামের এক সংগ্রামী নারী রোকেয়া বেগম।
সংগ্রামী নারী রোকেয়ার ছোট মেয়ে ও গৃহিনী সাথী আক্তার (৩২) টিনিউজকে বলেন, চার ভাই বোনের মধ্যে ছোট ভাই আব্দুল আলিম। তবে আমার বয়স যখন ৬ বছর তখন মৃত্যুবরণ করেন তার বাবা আসকর আলী। টাঙ্গাইল পৌর শহরের অলোয়া ভবানী এলাকার বাসিন্দা তার বাবা হলেও সেখানে ছিলনা তার বাসগৃহ আর কিঞ্চিত পরিমানের কৃষিজমি। যার ফলে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় বড় খালার দেয়া দশ শতাংশ জমির উপর গড়া টিনের একটি ঘর। এখানে বসবাস করা অবস্থাতেই বিয়ে হয় বড় বোনের আর ১৯৮৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন তার বাবা। বাবার মৃত্যুর সময় তারা মেজ বোন শিল্পী আক্তার ১০ আর ছোট ভাই আব্দুল আলিম এর বয়স ছিল ৪ বছর। অভিভাবকহীন এ পরিস্থিতিতে তার মা রোকেয়া বেগম বিচলিত না হয়ে সন্তানদের ভোরণ পোষণ আর পড়ালেখা ভাবনায় শুরু করেন মানুষের বাসা বাড়িসহ স্থানীয় বিদেশী এনজিও সংস্থা আনন্দ এর কার্যালয়ে রান্না করাসহ নানা ধরণের কাজ।
এছাড়াও তাদের প্রাপ্তি হিসেবে ছিল খালা, খালাতো ভাই বোনের সাহায্য সহযোগিতা আর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া যতসামান্য সুযোগ সুবিধা। মায়ের এ অবর্ণনীয় কষ্ট আর ত্যাগে তার অর্জন ২০১৯ সালে কুমুদিনী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে সমাজকর্ম বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাশ। এর আগে ২০১৪ সালে ঢাকা প্যারামেডিকেল কলেজ থেকে প্যারামেডিকেল পাশ কওে তার ছোট ভাই আব্দুল আলিম। বর্তমানে মিরপুর-১ এর ডেলটা মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটালে ডাক্তার হিসেবে কর্মরত রয়েছে। এছাড়াও মায়ের কষ্টে উপার্জিত টাকায় দেলদুয়ার কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাশ করেন তার মেজ বোন শিল্পী আক্তার। একই সাথে উপজেলাতেই তার ও মেজ বোনের বিয়ে দিয়েছেনও তার মা।
এ সময় সাথী টিনিউজকে আরো জানান, তার স্বামী ময়মনসিংহের জন উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে কর্মরত থাকায় বর্তমানে সে মায়ের বাড়িতে বসবাস করলেও তার মেজ বোন শিল্পী আক্তার বসবাস করছেন স্বামীর বাড়ি উপজেলার লালহারা গ্রামে। তবে বর্তমানে ছোট ভাই আব্দুল আলিমের ঢাকা মীরপুরের বাসায় ছেলের বউ নিয়ে বসবাস করছেন তার মা রোকেয়া বেগম।
জীবন সংগ্রামী রোকেয়ার আশ্রয়দাতা বড় বোন জরিনা বেগম টিনিউজকে বলেন, বোন জামাইয়ের কোন বাসা বাড়ি না থাকায় তিনি তাদের থাকার জন্য এই টিনের ঘরসহ দশ শতাংশ জমিটি দিয়েছেন। বোনের সুখের জন্য এই সাহায্যটুকু তিনি করলেও অল্প বয়সেই তার বোনটি হয় স্বামীহারা। কান্না জড়িতকন্ঠে এ সময় তিনি টিনিউজকে বলেন, ছোট ছোট তিনটি সন্তান নিয়ে অতিকষ্টে আর মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানোসহ ছেলে আর মেয়েদের পড়ালেখা করায় সে। এখন আমার বোন বোকেয়ার সুখের দিন এসেছে। তার ছেলে ঢাকায় ডাক্তারী করছে আর তিন মেয়েরও হয়ে গেছে বিয়ে। বর্তমানে তার বোন রোকেয়া ঢাকায় বসবাস করছে এ আনন্দ প্রকাশ করলেও স্বামীহারা বোনের জীবন সংগ্রামের বর্ণনা দিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলার আটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ড ভুরভুরিয়া গ্রামের তৎকালীন ইউপি সদস্য দানেস আলী টিনিউজকে জানান, ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এ ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় অল্প বয়সে স্বামীহারা রোকেয়া বেগমকে পরিষদের ভিজিটি থেকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে গম দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তিনি। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্প আর সময়ে আসা কাপড় ও কম্বল দিয়ে অতিকষ্টে লালিত পালিত হওয়া এতিম ওই তিন ভাই বোনসহ পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর কথাও জানান সে। এতো কষ্টের পরও ছেলেকে ডাক্তার আর মেয়েগুলোকে শিক্ষিত আর বিয়ে দিতে পারায় রোকেয়া বেগমকে স্বার্থক এক নারী বলে স্বীকৃত দিয়েছেন তিনি।

ব্রেকিং নিউজঃ