টাঙ্গাইল শহরে টানা তিনদিন ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন

267

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার বড় ভাই আমিনুর রহমান খান বাপ্পীর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইল। খান পরিবারের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তাদের বিরোধী আওয়ামী পরিবার।
এ ঘটনায় (২১ ও ২২ নভেম্বর) আমিনুর রহমান খান বাপ্পী স্মৃতি সংসদ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষনা করে। এদিকে একই দিন নির্যাতিত আওয়ামী পরিবার এবং টাঙ্গাইল সিএনজি চালিত অটোরিকশা, অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষনা করেছে। এর প্রেক্ষিতে জেলার আইনশৃঙ্খলা শান্তিপূর্ণ রাখতে জেলা প্রশাসন (২১, ২২ ও ২৩ নভেম্বর) শহরে টানা তিনদিন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এই তিনদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শহরের শহীদ মিনার, শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ভিক্টোরিয়া রোড, নিরালা মোড়, মেইন রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সভা, সমাবেশ, মিছিল, মাইকিংসহ সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জানা যায়, বিগত ২০০৩ সালের (২১ নভেম্বর) সন্ত্রাসী হামলায় নিজ বাড়ির কাছেই খুন হন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক আমিনুর রহমান খান বাপ্পী। তিনি সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানার বড় ভাই এবং টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের বর্তমান এমপি আতাউর রহমান খানের ছেলে। বাপ্পী হত্যা মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ এখন শেষ পর্যায়ে। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এবার ‘শহীদ আমিনুর রহমান খান বাপ্পী স্মৃতি সংসদের’ ব্যানারে খান পরিবার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) কবর জিয়ারত, বাপ্পী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শোক র‌্যালি এবং শুক্রবার (২২ নভেম্বর) বিকেলে স্থানীয় শহীদ মিনারে আলোচনা সভা।
কিন্তু আওয়ামী লীগের খান পরিবার বিরোধী নেতাদের দাবি, বাপ্পীর মৃত্যুবার্ষিকীর এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে খান পরিবার তাদের অনুসারি সন্ত্রাসীদের আবার একত্রিত করছে। এরা টাঙ্গাইলকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে আবার অস্তিতিশীল করে তুলতে চাইছে। তাদের এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নীলনকশা রুখতেই পাল্টা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) সকালে ‘নির্যাতিত আওয়ামী পরিবারের’ ব্যানারে সকালে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ বিচারের দাবিতে শহরের বিক্ষোভ মিছিল ও শহীদ মিনারে সমাবেশ। পরদিন শুক্রবার (২২ নভেম্বর) বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল শেষে শহীদ মিনারে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। এছাড়া শনিবারও (২৩ নভেম্বর) বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ রয়েছে তাদের।
দুইপক্ষই কর্মসূচি সফল করতে শহর ও আশেপাশের এলাকায় নানা তৎপরতা করছে। সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানা টাঙ্গাইল শহরের কলেজ পাড়ায় তার নিজ বাসভবনে অবস্থান করে কর্মসূচি সফল করতে কাজ করছেন। অপরদিকে টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের এমপি তানভীর হাসান ছোট মনির, তার ভাই শহর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বড় মনি, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরন, প্যানেল মেয়র সাইফুজ্জামান সোহেল তৎপর মিছিল, সমাবেশ সফল করতে। ফলে শহরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। এতে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন পুলিশ প্রশাসন ও শহরবাসী।
আমানুর রহমান খান রানার অংশের নেতা টাঙ্গাইল সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি আব্বাস আলী টিনিউজকে বলেন, কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সফল করতে সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। শুক্রবারের (২২ নভেম্বর) আলোচনা সভায় বেশকয়েকজন এমপি উপস্থিত থাকবেন বলে তিনি জানান।
খান পরিবার বিরোধী অংশের নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও প্যানেল মেয়র সাইফুজ্জামান সোহেল টিনিউজকে বলেন, বাপ্পীর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের নামে খান পরিবার আবার তাদের সন্ত্রাসীদের নিয়ে অপতৎপরতা শুরু করেছে। তাদের এই অশুভ কর্মকান্ড প্রতিহত এবং মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার বিচারের দাবিতে তারা কর্মসূচি নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় টিনিউজকে বলেন, শহরের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে কোন পক্ষকেই মিছিল সমাবেশের অনুমতি না দেয়ার জন্য পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে মতামত দেয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোশারফ হোসেন খান টিনিউজকে জানান, একই দিনগুলোতে দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে আইনশৃংখলার অবনতির ঘটতে পারে। তাই বিষয়টি চিন্তা করে শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান, শহীদ মিনার, নিরালার মোড়, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন শহরের প্রধান প্রধান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং এর আশেপাশের এলাকায় (২১, ২২ ও ২৩ নভেম্বর) শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। টানা এই তিনদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এই আদেশ পালিত হবে।
টাঙ্গাইল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহাদুজ্জামান মিয়া টিনিউজকে জানান, আইনশৃঙ্খলা শান্তিপূর্ণ রাখতে জেলা প্রশাসন শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এ কারণে সেইসব স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইলে আওয়ামী রাজনীতিতে একক প্রভাব বিস্তারকারী খান পরিবারের চার ছেলে সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানা, সাবেক পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বিগত ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল ত্যাগ করেন। বিগত ২০১৬ সালে রানা আদালতে আত্মসমর্পন করেন। দীর্ঘ ৩৬ মাস হাজতবাসের পর তিনি চলতি বছরের জুলাই মাসে আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। অন্য তিন ভাই বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

ব্রেকিং নিউজঃ