টাঙ্গাইল পৌরসভার তিন প্রকৌশলীকে বরখাস্ত ॥ মেয়রকে কারণ দর্শানোর নোটিশ

659

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অনিয়ম হচ্ছে জেনেও আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ায় টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সিরাজুল হক আলমগীরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল পৌর শহরের বেড়াডোমা এলাকায় সেতু নির্মাণে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ।




স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ পৌর-১ শাখার উপসচিব আবদুর রহমান স্বাক্ষরিত তিনটি পৃথক চিঠিতে বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সিরাজুল ইসলাম আলমগীরকে কারণ দর্শানোর নোটিশটিও তিনি দিয়েছেন। আর তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মুহম্মদ ইব্রাহিম স্বাক্ষরিত তিনটি পৃথক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সবগুলো নথি রোববার (২০ নভেম্বর) মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।




এছাড়া ওই চিঠিতে সেতু নির্মানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ব্রিকস্ অ্যান্ড বিল্ডিং লিমিটেড এবং দ্যা নির্মিতি কে (জেভি) প্রতিষ্ঠান দুটিকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সেতু নির্মানে ডিজাইন ও প্রাক্কলন যথাযথ অনুসরণ করেনি।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রকৌশলীরা হলেন- টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শিব্বির আহমেদ আজমী, সহকারী প্রকৌশলী রাজীব গুহ ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী জিন্নাতুল হক।




এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ নামা প্রাপ্তির ১০ কার্য দিবসের মধ্যে তাদের লিখিতভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগে জানানোর জন্য বলা হয়েছে। বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামায় বলা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন ‘চাকরি হতে বরখাস্তের’ গুরুদন্ড দেওয়া হবে না, তা লিখিতভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগকে জানাতে প্রত্যেককে ১০ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন কি না, সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।




জানা যায়, গত (১৬ জুন) রাতে টাঙ্গাইল পৌর শহরের বেড়াডোমা এলাকায় লৌহজং নদীর উপর সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতু দেবে যায়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে টাঙ্গাইল পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মান করা হচ্ছিল। আট মিটার প্রস্থ ও ৪০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা।

সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নির্মাণাধীন সেতুটির ঢালাই কাজের পূর্বে সেন্টারিং ও সাটারিং’এর সময় ঠিকাদার ড্রয়িং ও ডিজাইন অনুসরণ করেননি। সেখানে বল্লি ও বাঁশের খুটি ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিরা শুধু চিঠির মাধ্যমে তাদের নিষেধ করেন। তারা ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা নেননি। বরং ঢালাইয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন। এটিকে দায়িত্বে চরম অবহেলা প্রদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনে।




অপরদিকে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সিরাজুল হক আলমগীরকে কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, পৌরসভার প্রকৌশলীদের সঙ্গে ঠিকাদারপক্ষের স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং সেতু নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে জেনেও কোনো পদক্ষেপ নেননি মেয়র সিরাজুল হক আলমগীর। বরং কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বিল প্রদান করেছেন। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাঁকে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সেতুটি নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘ব্রিকস অ্যান্ড বিল্ডিং লিমিটেড’ ও ‘দ্য নির্মিতি কে (জেভি)’ সেতু নির্মাণে নকশা ও প্রাক্বলন যথাযথ অনুসরণ না করায় ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিন প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সিরাজুল হক আলমগীর বলেন, তাঁরা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ–সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছেন। তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চিঠির জবাব দিবেন বলে জানান।




স্থানীয় সূত্র জানায়, সেতুটি নির্মাণে কাজ পেয়েছিল ‘ব্রিকস অ্যান্ড বিল্ডিং লিমিটেড’ ও ‘দ্য নির্মিতি কে (জেভি)’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতা। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আমিরুল ইসলাম খান, সাবেক পৌর কাউন্সিল মাসুদুর রহমান মাসুদ, শহর আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম খান জামিল, বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী সাবেক মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু মুক্তি আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক আলিম রাজ, শহর আওয়ামী নেতা শাহ্ নেওয়াজ শিপুসহ অন্যান্যরা সেতুটির নির্মাণকাজ তদারক করতেন। দরপত্রের শর্তানুযায়ী সেতুর শাটারিং এএমএস পাইপ ব্যবহারের কথা ছিল, কিন্তু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা শাটারিংয়ে গাছের গুঁড়ি ব্যবহার করেন।




এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শিব্বির আহমেদ আজমী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়েছিলেন। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে একটি অঙ্গীকারনামা দেয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, এমএস পাইপের পরিবর্তে গাছের গুঁড়ি ব্যবহার করার কারণে ঢালাই চলাকালে কোনো ক্ষতি হলে এর ক্ষতিপূরণ তারা (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) বহন করবে।

 

 

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ