টাঙ্গাইলে ৭১ টাকায় মোরগ পোলাও!

444

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলে মাত্র ৭১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ডিমসহ মোরগ পোলাও! দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতির বাজারে এমন উদ্যোগ অবিশ^াস্য আর আশ্চর্যজনক মনে হলেও এটি সত্যি। প্রায় তিন মাস যাবৎ ভ্রাম্যামাণ ওই হোটেলটি পরিচালিত হচ্ছে টাঙ্গাইল পাসপোর্ট ও নির্বাচন অফিস চত্বরে। লাযীয বিরিয়ানী নামে ভ্রাম্যমাণ ওই হোটেলটি গড়ে তুলেছেন অনার্স সম্পন্ন ও পড়–য়া স্থানীয় তিন যুবক। কম মূল্যে সুস্বাদু মোরগ পোলাও বিক্রির মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ক্রেতাসহ স্থানীয়রা।

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্মাহুতি আর ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা স্বরূপ এর মূল্য ৭১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ওই তিন উদ্যোক্তারা। ৭১ টাকায় ডিমসহ মোরগ পোলাও বিক্রির ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পরও এর দাম ৭০ টাকা নিয়ে বাকি ১ টাকা জমা রেখে হতদরিদ্রদের মাঝে খাবার সরবরাহ করছেন ওই উদ্যোক্তারা।




মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, টাঙ্গাইল পাসপোর্ট ও নির্বাচন অফিস চত্বরে খোলা জায়গায় বসেছে ভ্রাম্যামাণ লাযীয বিরিয়ানী নামের ওই হোটেলটি। ১০-১২টি প্লাস্টিকের টুল রাখা হয়েছে ক্রেতাদের জন্য। এর কয়েকটিতে বসে ক্রেতারা খাচ্ছেন ৭১ টাকার মোরগ পোলাও। খাওয়া শেষে প্লাস্টিক জারের পানি পানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোন বাবুর্চি বা শ্রমিক নেই হোটেলটিতে।




শহরের বিভিন্ন বিরিয়ানী হাউজ ঘুরে দেখা গেছে, হাজী বিরিয়ানী হাউসে ডিমসহ মোরগ পোলাও হাফ ১৫০ আর ফুল ৩০০ টাকা, নান্না বিরিয়ানীতে শাহী মোরগ পোলাও হাফ ১৫০ আর ফুল ২৮০ টাকা, নবাব বিরিয়ানী হাউজে মোরগ পোলাও হাফ ১৪০ টাকা আর স্পেশাল শাহী বিরিয়ানী হাউজে মোরগ পোলাও বিক্রি হচ্ছে হাফ ১৪০ আর ফুল ২৮০ টাকায়।




৭১ টাকায় ডিমসহ মোরগ পোলাও বিক্রির লাযীয বিরিয়ানীর উদ্যোক্তা ও কালিহাতীর এলেঙ্গা শামসুল হক মহাবিদ্যালয়ের একাউন্টিং অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র আব্দুল্লাহ বলেন, টাঙ্গাইল পৌর শহরের ৩ নং ওয়ার্ডের হাউজিং এলাকার বাসিন্দা বড় ভাই রাজীব হোসেন, সাদিক আর আমি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি। তবে কারোই চাকরি ভালো লাগেনি। এ কারণে আমরা বাড়িতে ফিরে আসি। আমাদের উপার্জনসহ সমাজের জন্য কিছু করার কথা মাথায় আসে। ভাবনা থেকেই হোটেল করা আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্মাহুতি আর ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা স্বরূপ আমাদের ভ্রাম্যামাণ হোটেলের মোরগ পোলাও এর দাম নির্ধারণ হয়েছে ৭১ টাকা। এর মধ্যে ১ টাকা সমাজের চেয়ে খেতে পারা ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিদিনই খেতে না পারা ওই ব্যক্তিদের দেয়া হচ্ছে জনপ্রতি জমা হওয়া ১ টাকা থেকে খাবার।




তিনি আরও বলেন, সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার ব্যতিত ৫দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এই হোটেল। হোটেলে গড়ে প্রতিদিন তাদের ১০-১২ কেজি চালের মোরগ পোলাও বিক্রি হচ্ছে। এই পরিমাণ চালে ১০০-১২০ প্লেট মোরগ পোলাও হচ্ছে। স্পেশাল শাহী দম বিরিয়ানী নামের মোরগ পোলাও তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে চিনি গুড়া চাল, বয়লার মুরগী, সরিষার তেল। এক প্লেট মোরগ পোলাও এ দেয়া হচ্ছে পোলাওসহ এক টুকরো মুরগীর মাংশ, হাফ ডিম, লেবু আর শশা। নিজেরাই রান্না করাসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করায় এত কম টাকায় বিক্রির পরও তাদের লাভ হচ্ছে প্রায় ২৫-৩০ ভাগ টাকা।




টাঙ্গাইল পাসপোর্ট অফিসের গ্রাহক ও হোটেলের ক্রেতা গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল গ্রামের সুমী আক্তার বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য ৭১ টাকায় বিরিয়ানী আমাদের কাছে অনেক কিছু। এই বিরিয়ানী যদি আমরা হোটেল বা রেস্টুরেন্টে খেতে যাই, তাহলে সর্বনি¤œ বিল হবে ১৪০-১৮০ টাকা। পরিবেশসহ খাবারের মানও ভালো। ৭১ টাকায় এক প্লেট পোলাও, একটি মুরগীর টুকরো, ডিম, লেবু ও শষা পাওয়া যাচ্ছে। সরিষার তেল দিয়ে খাবারটি রান্না করায় এটি খুবই স্বাস্থ্য সম্মত।




ক্রেতা এম রতন মিয়া বলেন, টাঙ্গাইল ফুডিস নামের একটি গ্রুপে এই হোটেলটির খোঁজ পাই। বেশ কয়েকবার এই হোটেলের মোরগ পোলাও খেয়েছি। খুবই মান সম্মত। আজকে পাসপোর্ট অফিসে কয়েকজন বন্ধু মিলে এসেছি। এই সুযোগে ও খাওয়ার জন্য পাঁচ প্যাকেট নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকেই ভাবতে পারেন এই মোরগ পোলাও এর দাম কম তাই মান ভালো হবেনা, তাদের বলছি, এমনটা নয়। এই হোটেলে মোরগ পোলাও খুবই মান সম্মত ও সুস্বাদু। রিকসা, ভ্যান চালকসহ সকল শ্রেণীর পেশার মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়েছে এই মোরগ পোলাও এর দাম।




এ ব্যাপারে লাযীয বিরিয়ানী নামের ওই ভ্রাম্যমাণ হোটেলের মালিক রাজীব হোসেন বলেন, মানুষকে কম দামে ভালো খাবার দেয়ার জন্য আমরা এটি প্রাথমিকভাবে শুরু করি। শুরুর পর থেকেই আমরা ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। এরই মধ্যে ক্রেতারা এর মান ভালো বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রকৃত বাবুর্চি না হওয়ায় প্রথম দিকের রান্নায় কিছুটা সমস্যা হলেও আড়াই মাসের বেশি সময় হওয়ায় এখন আমরা মান সম্মত রান্না করতে পারছি। এই খাবার প্রতিদিন দুপুরে আমরাও খেয়ে থাকি।
তিনি আরও বলেন, ৭১ টাকার ১ টাকা জমা রাখা হয় চেয়ে খেতে না পারা ব্যক্তিদের সহায়তায় আর খাবার বাবদ আমরা নিচ্ছি ৭০ টাকা।

ব্রেকিং নিউজঃ