টাঙ্গাইলে ৬ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিলের রফা ১ লাখ ১৮ হাজার টাকায়!

229

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলে প্রায় ৬ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১৮ হাজার টাকায়। চাঞ্চল্যকর এমন ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের গ্রাহক বিলে। আড়াই লাখ টাকা উপঢোকনে টাঙ্গাইল মেডিনোভা হসপিটালের ভবন মালিক অধ্যাপক ডা. শাহ্ আলমের ছেলে গ্রাহক তাশফিক আলমের বাসভবনের বিদ্যুৎ বিল এভাবেই পরিশোধ দেখিয়েছেন বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ভবনের সচল মিটার নষ্ট দেখিয়ে ও নতুন মিটার স্থাপনের মতো অভিনব কৌশলও অবলম্বন করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী। এছাড়াও রয়েছে গ্রাহকদের আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিটার নষ্ট দেখিয়ে গড় বিলে হয়রানি করাসহ অসামঞ্জস্য বিদ্যুৎ বিল করার মতো নানা অভিযোগ। যোগদানের শুরু থেকেই এমন নানা অনিয়নে লিপ্ত ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী বলে গুঞ্জন রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিস চত্ত্বরসহ গ্রাহক মহলে।
বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০১২ সালে থেকে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করছেন টাঙ্গাইল পৌর শহরের থানাপাড়া মেইনে রোডে নির্মিত ১১তলা বিশিষ্ট অধ্যাপক ডা. শাহ্ আলমের মালিকাধীন শামছুদ্দোহা রিজিয়া ভবন বা এসআর ভবন। যার গ্রাহক তাশফিক আলম ও মিটার সিরিয়াল নম্বর ১১২১৫২৫৯। এরপর বিগত ২০১৭ সালের অক্টোবরে ওই ভবনের সামনের অংশে ৬টি ফ্লোর ভাড়া নেয় মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লিঃ। এ সময় বহুতল ভবনটির মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লিঃ এর জন্য একটি বাণিজ্যিক এস.টি (মাদার মিটার) স্থাপন করা হয়। বাকি ফ্লোরগুলোর আবাসিক মিটারগুলো স্থাপন হয় চাইল্ড মিটার হিসেবে।
জানা গেছে, বিগত ২০১৯ সালের (৫ সেপ্টেম্বর) টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রকৌশলী শামীম আহম্মেদ। এই দপ্তরের অধিনে রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার গ্রাহক। অনিয়নের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে জানা যায়, কিগত ২০১২ সালে ১১২১৫২৫৯ নম্বর সিরিয়ালের মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ শুরু করেন। অধ্যাপক ডা. শাহ্ আলমের মালিকাধীন শামছুদ্দোহা রিজিয়া ভবন বা এসআর ভবন। যার গ্রাহক তাশফিক আলম। বিগত ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পিছনের বাসভবন অংশে স্থাপনকৃত ১১২১৫২৫৯ মিটার সিরিয়াল নম্বরে হয় ৫৯২৯২.৯৩ ইউনিট বিদ্যুৎ। ১০ টাকা দরে ব্যবহৃত ৫৯২৯২.৯৩ ইউনিটের মূল্য ৫ লাখ ৯২ হাজার ৯২৯.৩ টাকা। তবে ব্যবহৃত ওই মিটারে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৪৩৬৯ ইউনিটের বিল দেখানোসহ আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২০৪ টাকা। বিগত ২০১২ সাল থেকে ব্যবহৃত একক মিটার ছিল। আর এ সময় থেকে ২০২০ এপ্রিল পর্যন্ত মিটারটিতে এই পরিমানের ইউনিট জমা পরে। এরপর ২০১৭ সালের অক্টোবরে সেটি চাইল্ড মিটারে স্থানান্তর হয়। বিষয়টি অবগত হয়েই বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিলের বিশাল অংকের ওই টাকা আত্মসাতের অবলম্বন হিসেবে মিটারটি নষ্ট দেখিয়ে নতুন মিটার স্থাপনের কৌশল নেয়। এর ফলে সরকার হারায় ৪৪ হাজার ৯২৩ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল। যার পরিমাণ ৪ লাখ ৪৯ হাজার ২৩০ টাকা।
যা অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ম্যানেজার (অ্যাপস্) এর ফোন আলাপ রের্কডে ওই অনিয়ম ও দূর্নীতির স্পষ্টতা রয়েছে। এতে স্পষ্টও হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহম্মেদ আর উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামের যোগসাজসে বিদ্যুতের টাকার আত্মসাতের ওই দূর্নীতি। বিদ্যুৎ বিলের টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি বাইরে থেকে মিটারটি কেনাসহ স্থাপন বিধি অমান্য করার অনিয়ম হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও অসামঞ্জস্য বিলের অভিযোগ রয়েছে শামছুদ্দোহা রিজিয়া ভবন বা এস আর ভবনের ৭৫২৮৭২০৫ নং গ্রাহক তাশফিক আলমের মিটার ০৩৬৮৪ এর মে মাসের ৩১৪৯ ইউনিটে ২৮ হাজার ৫৬৪ টাকা, ৭৫২৮৭১৫৪ নং গ্রাহক তাশফিক আলমের মিটার ০৩৭১৭৩ এর মে মাসের ৩০৮০ ইউনিটে ২৮ হাজার ২৬১ টাকা, ৭৫২৮৭১৯২ নং গ্রাহক তাশফিক আলমের মিটার ০২৯৬৮১ এর মে মাসের ২৯২৯ ইউনিটে ২৭ হাজার ৩৫৪ টাকা, ৭৫২৮৭১৬৯ নং গ্রাহক তাশফিক আলমের মিটার ৩২৫৬৭ এর মে মাসের ২৭৯৯ ইউনিটে ২৬ হাজার ৬০৪ টাকা।
৭২৭২৬২ নং মিটার গ্রাহক থানাপাড়ার আবু কাউসারের অভিযোগ, আমি প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে আসছি। এরপরও হঠাৎ বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন এসে বলেন আপনার মিটার নষ্ট হয়েছে এবং বিল বকেয়া রয়েছে ১২’শ ইউনিট। প্রতিমাসে বিল পরিশোধ করলে কিভাবে বিল বকেয়া থাকে সেই প্রশ্নই এখন আমার। এরপরও বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন আমার বাড়িতে নতুন মিটার লাগিয়ে দেন এবং বলেন একবারে বকেয়া পরিশোধ করা আপনার পক্ষে কষ্টকর হবে বলে আমরা প্রতিমাসের বিলে বকেয়া বিল গড় করে পরিশোধের সুযোগ করে দিব। এরপর আগস্ট মাসে আমার বিল আসে ২৪০৮ টাকা। সেটিও পরিশোধ করেছি। তবে অক্টোবর মাসে বিল এসেছে ১২৮০০টাকা। তিনি জানান, আমরা স্বল্প আয়ের মানুষ। হঠাৎ করে এত টাকা বিল আসলে আমাদের পক্ষে ওই টাকা পরিশোধ করা অনেক কষ্টকর। এক এক মাসে এক এক রকমের বিদ্যুৎ বিল, এটি হয়রানী ছাড়া আর কিছুই না। বিদ্যুতের এমন হয়রানী বন্ধে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
শহরের বেড়াডোমা ফকিরপাড়ার গ্রাহক ফেরদৌস হায়দারের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ একজন কর্মচারি আমাকে ফোন বলছেন আমি বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আপনার কবে হাজিরা সেই তারিখটা জেনে যান। যদিও গত দুই বছর আগে ৪০ হাজার টাকা বকেয়া বিলের অভিযোগে আমার নামে একটা মামলা হয়েছিল। পরে সেই টাকা আমি পরিশোধ করাসহ আদালতের হাজিরাও শেষ করি। এরপর থেকে আমি নিয়মিত বিল পরিশোধ করছি। এখন দুই বছর পরে কেন আবার আমাকে ডাকছে আর কোন উদ্দেশ্যে সেটি জানতে আসছি। এছাড়াও প্রায় ১ বছর যাবৎ আমি ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করা শুরু করেছি, কিন্তু আট মাস পর্যন্ত এসেছে এ্যানালগ মিটারের বিল। বাধ্য হয়ে সেই বিলের টাকাগুলোও আমাকে পরিশোধ করতে হয়েছে। এখন আমার ৫’শ টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল খরচ হলেও দিতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা বিল।
টাঙ্গাইল মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লিঃ এর মার্কেটিং ম্যানেজার গোলাম হায়দার আলী জানান, আমরা প্রতি মাসে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট এস.টি মিটার অনুসারে বিল পরিশোধ করছি। আমাদের মিটারের সাথে ভবন মালিকের বৈদ্যুতিক কোন সম্পর্ক নেই। মালিক পক্ষ তাদের ব্যবহৃত মিটার অনুযায়ি পৃথকভাবে বিল পরিশোধ করেন। তবে গত বছরের এপ্রিল মাসে ভবন মালিকের মিটার আর বিল নিয়ে কিছু একটা সমস্যা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
বিষয়টি জানতে অধ্যাপক ডা. মো. শাহ্ আলমের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে অধ্যাপক ডা. মো. শাহ্ আলমের ভাগ্নি জামাই ও ভবনের একাংশের মালিক ফখরুল ইসলাম ফারুক জানান, আমাদের ভবনের ১১২১৫২৫৯ সিরিয়াল নম্বরের মিটারে একটা সমস্যা হয়েছিল। সেটির সমাধান করেছেন ভবনের মূল মালিক অধ্যাপক ডা. মো. শাহ্ আলম।
অনিয়ম ও দূর্নীতির কথা স্বীকার করে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর ম্যানেজার (অ্যাপস্) মামুন জানান, আমি গ্রাহক তাশফিক আলমের ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১১২১৫২৫৯ মিটার সিরিয়াল নম্বরে ব্যবহৃত ৫৯২৯২.৯৩ ইউনিট বিদ্যুৎ বিলটি ওপেন করতে চেয়েছিলাম। তবে নির্বাহী প্রকৌশলীর চাপের মুখে আমি সেটি ওপেন করতে পারিনি। এর বিপরীতে ওই মিটার রিডিংটা স্কিপ করে ও সুবিধা নিয়ে শেষ করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ।
এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর উপ-সহকারি প্রকৌশলী ও সাইড ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল ইসলাম।
টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ জানান, তাশফিক আলমের ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যবহৃত ১১২১৫২৫৯ নম্বর মিটারটি নষ্ট হওয়ায় আমি সেটি পরিবর্তনের নির্দেশ দেই। সরকারি মিটার পেতে ঝামেলা থাকায় বাইরে থেকে নতুন একটি মিটার কিনে সেখানে স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে বিদ্যুৎ বিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তোফাজ্জল হোসেন প্রামানিক জানান, এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ বা সংবাদ প্রচার হলে এ বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ব্রেকিং নিউজঃ