টাঙ্গাইলে ৫ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি ॥ ঈদের আনন্দ নেই

16

নোমান আব্দুল্লাহ ॥
করোনার প্রাদুর্ভাবে জনগণ দুঃশিশ্চন্তায় ও অর্থনৈতিক কষ্টে রয়েছে। তার উপর বন্যা আবার মরার উপর খড়ার ঘা। টাঙ্গাইলের বানভাসি মানুষের ঈদের আনন্দ ক্রমেই ফিকে হয়ে গেছে। বন্যায় ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে কয়েক লাখ পানিবন্দি মানুষ। রাস্তা বা উচু জায়গায় গিয়েও শেষ রক্ষ হচ্ছে না। সেখানেও হানা দিয়েছে বন্যার পানি। গরু, ছাগল হাস, মুরগির সাথে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবন যাপন করছে পানিবন্দি এসব মানুষ। ঘরে খাবার নেই। নেই কোন কাজকর্ম। ঈদের আনন্দ তাদের কাছে এখন বিষাধ।
যমুনা, ধলেশ্বরী ও ঝিনাই নদীর পানি কমলেও পানিবন্ধি রয়েছে মানুষ। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলায় এখন পর্যন্ত ৫টি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ১১টি উপজেলা বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। তবে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের গ্রামগুলো নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। এতে নতুন করে একের পর এক রাস্তা ঘাট ও ব্রিজ পানির স্রোতে ভেঙে যাচ্ছে। নিমাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ঘড়-বাড়ি, ফসলী জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রাম ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার পৌর এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বন্যা দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ত্রাণ সহায়তাও পাচ্ছেন না বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। এতে বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে বাড়ছে দুর্ভোগ। বন্যায় জেলায় এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৫ লক্ষাধিক মানুষ। হুমকির মুখে রয়েছে বিভিন্ন এলাকার রক্ষাবাধ। আর তৃতীয় দফার বন্যায় পৌঁনে ১১ হাজার হেক্টর ফসলী জমি নিমজ্জিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানায়, জেলায় ১২টি উপজেলার মধ্যে ১১টি উপজেলার নিমাঞ্চল এবং চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যা কবলিত উপজেলাগুলো হলো- টাঙ্গাইল সদর, নাগরপুর, দেলদুয়ার, ভূঞাপুর, কালিহাতী, ধনবাড়ী, গোপালপুর, বাসাইল, মির্জাপুর, সখীপুর এবং ঘাটাইল। এ ১১টি উপজেলার ৮৯টি ইউনিয়নের অন্তত ৭৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অপরদিকে ৬টি পৌরসভা আংশিক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ৫ লাখ ৪১ হাজার ১৩৫ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ৭১ হাজার ৭২০টি। অপরদিকে ৭৬১টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে এবং আরো আংশিক ৩৫ হাজার ৩১১টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ২টি স্কুল নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আংশিক আরো ২৪৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া নদী ভাঙনে ১টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং আংশিক ২১০টি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ১১ উপজেলার ৬৯৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, জেলায় এখন পর্যন্ত ১৩ কি.মি. সম্পূর্ণ কাচা রাস্তা এবং আংশিক ৭৩৫ কি.মি. কাঁচা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে সম্পূর্ণ ১ কি.মি. পাকা রাস্তা এবং ১৭৫ কি.মি. আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও সম্পূর্ণ ২৬টি ব্রিজ এবং আংশিক ১৩৯টি ব্রিজ ক্ষতি হয়েছে। সম্পূর্ণ ১ কি.মি. এবং ১২ কি.মি. আংশিক নদীর বাঁধ ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে টিউওবেল ৭৯৪১টি ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া জেলায় মোট ৪৫ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা রয়েছে। এই আশ্রয় কেন্দ্রের লোক সংখ্যা ৩ হাজার ৪৬৫ জন। ১৮টি গবাদি পশুও আশ্রয় নেয়। ১১৩টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া জেলায় ১ হাজার মে.টন জির চাল, নগদ ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অপরদিকে শিশু খাদ্য ৪ লাখ টাকা এবং গোখাদ্য ১১ লাখ টাকা এবং শুকনা প্যাকেট ১০ হাজার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এগুলো বিতরণ কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে শিশুসহ ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, প্রথম দফায় বন্যায় টাঙ্গাইলে ৩ হাজার ৮৩৯ হেক্টর ফসলী জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৭ হাজার ২৩৩ জন। আর তৃতীয় দফায় বন্যায় এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৭৮১ হেক্টর ফসলী জমি নিমজ্জিত নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে বোনা আমন, রোপা আমন (বীজতলা), আউশ, সবজি, লেবু এবং আখ রয়েছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আতাউল গনি টিনিউজকে বলেন, এবারের বন্যা দীর্ঘ মেয়াদি। জেলার বহু মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় ত্রাণ সরবরাহ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। পর্যাপ্ত পরিমান ত্রাণও রয়েছে। পর্যায়ক্রমে বানভাসি ক্ষতিগ্রস্ত সব মানুষ ত্রাণ সহায়তা পাবে।

ব্রেকিং নিউজঃ