টাঙ্গাইলে শীতের শেষ মাসে মাঘের বিচিত্র রূপ

117

এম কবির ॥
শীত ঋতুর শেষ মাস মাঘে কয়েকটি উৎসব। এবারের মাঘের রূপ বিচিত্র। ১৪২৬ সাল হতে বাংলা একাডেমির নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী গত শনিবার (১৫ জানুয়ারি) ছিল মাঘের প্রথম দিন। তবে সর্বজনীন পঞ্জিকা মতে রবিবার (১৬ জানুয়ারি) পহেলা মাঘ। মাঘের শুরু থেকেই হিমবায়ু বইছে জনপদে। কখনও বরফের আবরণে ঝড়োবাতাস। বাইরে বের হওয়া যায় না। বাতাসের তীব্রতায় কাঁপুনিতে উড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। গত তিন বছরে ‘মাঘের শীতে বাঘ পালানো’র অবস্থা ছিল না। এবারের মাঘ শুরুতেই জানান দিচ্ছে বাঘ তাড়াবে না। শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোভিড-১৯ বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই উৎসবের আয়োজনও চলছে। উৎসবের শাখা-প্রশাখায় স্বাস্থ্যবিধি যোগ হয়েছে। বলা হচ্ছে- মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব মেনে চলাফেরা করে সাবধানতার মধ্যে থাকতে হবে। পরিস্থিতি জটিল হলে ভিন্ন ব্যবস্থা। লোকজনের বলাবলি, টিকা তো রানিং। ভিন্ন ব্যবস্থা আর কি- লকডাউন।
এদিকে মেঘের ভিন্নরূপে ঠাহর করা যাচ্ছে না, এটা মাঘ না ফাল্গুন। সকালের ঘন কুয়াশা হিমবায়ু কেটে দৃষ্টিসীমা দূরে যাচ্ছে। দুপুর শুরুতে উঠছে টানা রোদ। চিটমিট করছে শরীর। কখনও পরনের গরম কাপড়, গলায় মাফলার, কোট-জ্যাকেট রাখা যাচ্ছে না। নামাতে হচ্ছে। মধ্য দুপুরে শীতল বাতাস। মাস্ক ভেদ করে নাক-মুখ-কানে ঢুকছে। মৃদু ঘূর্ণিবায়ু কয়েক পাক দিয়ে ধূলিও উড়ছে। স্যুট পরিহিত যারা অফিস করেন তাদের কোট স্থান পাল্টে চেয়ারের হেলানদানিতে ঝুলে থাকছে। গোধূলিলগ্নে জানান দেয়, এটাই শীতকালের মাঘ। মাঘ নামটি এসেছে মঘা নক্ষত্রে সূর্যের অবস্থান মাঘা থেকে।
মাঘের প্রথমদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য আসে সূর্যব্রত। অবিবাহিত নারী দ্রুত মনের মতো বর পেতে সূর্যব্রত পালন করেন। ঘুড়ি উৎসব পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হয়ে চলে মাঘের কয়েকদিন। বর্ণিল আলোয় ঝলসে ওঠা এমন রাত হালে দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে। শুক্লা পঞ্চমীর তিথি নিয়ে আসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পুজা। এই মাসেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঘরে মাঘী পূর্ণিমা মাঘের মহাউৎসব হয়ে আসে। ভরা চাঁদের পূর্ণিমা- মায়াবি, স্নিগ্ধ আলোয় অপার নিসর্গের রূপ নেয়। পৌষ সংক্রান্তির (গ্রামাঞ্চলে কেউ এখনও বলে পুষ্ণা) সকল পিঠা মাঘের শুরুতে যোগ হয়ে মাসজুড়ে অবস্থান নেয়। মাঘের শুরুতে যেভাবে শীত দংশন করছে পুরো মাস এমনই শীত থাকবে কি! গত তিন বছরের মাঘের শীতের অবস্থা দেখে এই কৌতূহল সাধারণের। গ্রামের কৃষক নিত্যদিন আকাশপানে চেয়ে এবং কুয়াশা ও শিশিরঝরা দেখে হিসাব কষে। আবহাওয়া বিভাগ অবশ্য বলছে, জানুয়ারির মধ্যভাগের পর শৈত্যপ্রবাহের তীব্র গতির থাবা শুরু হবে।
টাঙ্গাইলের মাঠের চিত্র অবশ্য তা বলছে না। হিমালয় পাদদেশীয় উত্তরাঞ্চলের চিত্রও কমবেশি একই রকম। দেশের কংক্রিটের বনের রাজধানী ও টাঙ্গাইল শহর দিনে দিনে উষ্ণাঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। আবহাওয়া বিভাগের এক সূত্র জানাচ্ছে, দিনাকয়েক পর কংক্রিটের এই বনেও তীব্র হিমবায়ু ঢুকে পড়বে। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ অবস্থান করছে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে। ফলে জানুয়ারি মাসজুড়েই শীত থাকবে। কতটা থাকবে! ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগ পর্যন্ত মাঘ মাস। তাহলে মাঘের বাকি অর্ধেকটায় কি শীত থাকবে না! বসন্তের প্রথম মাস ফাল্গুন কি এবার মাঘের শেষ অর্ধেক খেয়ে ফেলবে! এমন আলামত এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বহু আগে কবি পি বি শেলী লিখেছেন ‘ইফ উইন্টার কামস ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড’ (শীতের আগমন বার্তায় বসন্ত কি খুব দূরে)। একবিংশ শতকের পৃথিবী শেলীর কথারই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। শুধু যোগ হয়েছে ‘জলবায়ুর পরিবর্তন’। ব্রিটিশ কবি এডিথ সিটওয়ে লিখেছেন- শীত হলো স্বাচ্ছন্দ্য ও ভাল খাবারের সময়। আগুনের পাশে বসে উষ্ণতায় গল্প করার সময়। দ্রুত ঘরে ফেরার সময়। তিনি ভাল খাবারের কথা বলেছেন। বাঙালীর প্রেক্ষাপটে শীতের যে কত বাহারি পিঠা আছে। ভাল খাবারও তৈরি হয় শীত মৌসুমেই বনভোজানে। বিশ্বজুড়ে জানুয়ারি শীতের মাস। বাঙালীর মাঘ মাস নিয়ে আসে অনেক বারতা। এই মাঘ মাসকে ঘিরেই খনা বচন দিয়েছে ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ’।

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ