টাঙ্গাইলে লাইসেন্স ও ছাড়পত্র বিহীন অবৈধ ইটভাটার ছড়াছড়ি

109

কাজল আর্য ॥
টাঙ্গাইলে লাইসেন্স ও ছাড়পত্র বিহীন অবৈধ ইটভাটার ছড়াছড়ি। আসন্ন শুস্ক মৌসুমে ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য চলছে নিষিদ্ধ কাঠ পোড়ানোর জোর প্রস্তুতি। ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনায় সরকারি নির্দেশনা মানছেন না অধিকাংশ মালিক। ফলে পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্য অনেক স্থানে আজ হুমকির মুখে। ভুক্তভোগী এবং পরিবেশবাদীরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা আরো জোরারো পদক্ষেপের দাবি করছেন। হাইকোর্টে রিট করে চলছে জেলার ১২৩ টি ইট ভাটা।




জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলার ১২ টি উপজেলার ২৮২ টি ইটভাটার মধ্যে ১৩৪ টি বৈধ এবং বাকি ১৪৮ টি অবৈধ। এরমধ্যে মির্জাপুরে ২৯ টি, ধনবাড়ীতে ১৭ টি, মধুপুরে ১৮ টি, ঘাটাইলে ৪৪ টি, কালিহাতীতে ১১ টি, সখীপুরে ৪ টি, গোপালপুরে ৩ টি, দেলদুয়ারে ১ টি, ভূঞাপুরে ৫ টি, নাগরপুরে ৮ টি, সদর ২ টি ও বাসাইলে ৬ টি লাইসেন্স ও ছাড়পত্র বিহীন অবৈধ ইটভাটা রয়েছে।
দেখা যায়, টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বেকড়া ইউনিয়নের ভালকুটিয়ার এমএমকে এমটি ব্রিকসে ইট পোড়ানোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাঠ সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউনিয়নের জাগিরাচালা গ্রামের মেসার্স যমুনা ব্রিকসে কাঠ পোড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইটভাটার শ্রমিকরা মাটি কাটা ও ইট বানাচ্ছেন। বনাঞ্চল সমৃদ্ধ মধুপুর এবং ধনবাড়ীর প্রায় সব ভাটাগুলোতেই একই রকম প্রস্তুতি নিচ্ছে। বন নিকটে হওয়ায় কাঠ সহজলভ্য। অচিরেই ভাটায় আগুন দেওয়া হবে। আবার ফলসি জমির উপরের মাটি আসে ভাটায়।




মেসার্স যমুনা ব্রিকসের সত্ত্বাধিকারী আমির হোসেন টিনিউজকে বলেন, কয়লার দাম বেশি তাই কাঠ পুড়িয়েই ইট বানাই। বনের ওয়াকশনের মাধ্যমে এবং লোকাল থেকে কিনে কাঠ সংগ্রহ করি। এখানকার প্রায় সবভাটায়ই কাঠ পোড়ানো হয়। আমি প্রায় ১০ বছর যাবত ইটভাটা চালাই। ছাড়পত্র নবায়ন না হওয়ায় হাইকোর্টের রিটের মাধ্যমে ৭ বছর ধরে চালাচ্ছি। আর আমাদের এলাকার অধিকাংশ ইটভাটার লাইসেন্স নাই। মধুপুর উপজেলার ইটভাটা মালিক সমিতি সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মোতালিব হোসেন টিনিউজকে বলেন, আমরা বনের কাঠ পোড়াই না। ভাটায় প্রথম চুলা জ¦ালাতে কয়েক হাজার মন কাঠ লাগে। অন্য সময় কয়লা দিয়েই ইট পোড়াই। তবে কয়লা পাওয়া কঠিন।




পরিবেশবাদী গবেষক সোমনাথ লাহিড়ী টিনিউজকে বলেন, বনাঞ্চলের ৩ কিলোমিটার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন একেবারে নিষিদ্ধ। জেলার অনেক ভাটা স্থাপনে সে নিয়ম মানা হয়না। অসংখ্য ভাটায় কয়লার পরিবর্তে ইট পোড়ানো হয় কাঠ দিয়ে। জেলার সখীপুর, মধুপুর, ঘাটাইল এবং মির্জাপুরে এর পরিমান বেশি। ফলে চাপ পড়ছে বনাঞ্চলের উপর। পরিবেশ এবং প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হলেও ভাটার মালিকরা মানে না। নিজের স্বার্থে দেশের কি হলো সেটা তাদের কাছে বিবেচ্য নয়। স্থানীয় পরিবেশ বিভাগের জনবলের দুর্বলতা রয়েছে। তাদের আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মধুপুর অঞ্চলে দায়িত্বরত পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তাপস চন্দ্র পাল টিনিউজকে বলেন, বনাঞ্চল, স্কুল-কলেজ কিংবা লোকালয়ের আইন না মেনে স্থাপিত ইটভাটার সংখ্যা আমার জানা নেই। অনেক ভাটার লাইসেন্স নবায়ন না থাকলেও হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকায় সেগুলো চালু আছে।




টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. মিনহাজ উদ্দিন মিয়া টিনিউজকে বলেন, নিয়ম না মেনে ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার জন্য আশেপাশের বসতি এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। ভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় তারা চোখ, ত্বক ও ফুসফুসের কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে মৃত্যুও হতে পারে। যথাযথ দূরত্ব মেনে স্থাপন এবং পরিবেশ রক্ষার্থে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে।

টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাজ্জাদুজ্জামান টিনিউজকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ইটভাটায় আগুন লাগানোর জন্য কাঠ পোড়ানো হয়। এগুলো দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের।

বনাঞ্চল সমৃদ্ধ মধুপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমীন টিনিউজকে বলেন, অবৈধ ইটভাটাগুলোয় আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকি। কোন ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর খবর পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




টাঙ্গাইল জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জমির উদ্দিন টিনিউজকে বলেন, ইটভাটায় কয়লার ব্যবহার করতে হবে। কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ। আমরা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধ ইটভাটায় এবং কাঠ পোড়ানো হলে অভিযান করে থাকি। গতবছর ৬৭ টি ইটভাটায় ১ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছি। এবারো নিয়ম মানা না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি টিনিউজকে আরও বলেন, আমাদের জনবল সংকট এবং এরিয়া বড় হওয়ায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়।

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ