টাঙ্গাইলে মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে সয়লাভ

164

কাজল আর্য্য ॥
টাঙ্গাইল শহরসহ পুরো জেলায় অসংখ্য মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে সয়লাভ হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দুর্বল তদারকি ব্যবস্থায় গজিয়ে উঠা এসব ক্লিনিকে সেবার নামে চলে গলাকাটা বাণিজ্য। লাইসেন্সের শর্তাবলী পূরণ করে না অধিকাংশগুলোই। প্রতিনিয়তই উঠে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ। তবে খোদ সিভিল সার্জন এবং মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেবার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলায় ৩২৮ টি বেসরকারি ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মধ্যে শুধু নামমাত্র আবেদন দিয়ে চলছে ১২৪ টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক রয়েছে ১৪৩ টি (লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৮৬ আবেদনকৃত ৫৭ টি)। তবে এ পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে অসংখ্য ক্লিনিক এবং ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। যার তালিকা নেই সিএস অফিসে। সরেজমিনে দেখা যায়, টাঙ্গাইল শহরেই কমপক্ষে ৭০ টি নিবন্ধিত এবং আবেদনকৃত ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার রয়েছে। এরমধ্যে জেনারেল হাসপাতালের দক্ষিণ গেটের কোল ঘেঁষেই কোদালিয়া নার্সারী রোডে রয়েছে ১০টি ও পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে নতুন বাসস্ট্যান্ড প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের দু’পাশেই রয়েছে ছোট বড় ২৫ টি।

 

জানা যায়, মির্জাপুরের দেওয়ান হাসপাতালে সাজিদ হোসেন, সখিপুরের মর্ডাণ ডক্টরস হাসাপাতালে এক প্রসূতি ও লাইফ কেয়ার হাসপাতালে সৌরভ আহমেদ, ফাতেমা মর্ডান হাসপাতালে স্বর্ণা আক্তার, নুরুল আমীন থান মাল্টিপারপাস মেডিকেল সেন্টারে রিনা বেগম নামের রোগীর ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ উঠে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বজনরা হামলাও করে। স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমানের অভিযোগ মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের ভুল রিপোর্টের কারনে অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার সংবাদ প্রচারে আসলেও পরে আইনগত ব্যবস্থায় যায়নি ভুক্তভোগীরা। বিভিন্ন চাপে কিংবা কারনে হয়ে যায় সমঝোতা। ঘাটাইলের জামুরিয়া থেকে টাঙ্গাইল শহরে আসা মধ্যবয়সী আমেনা খাতুনের সাথে কথা হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন আমাগো গরিব মানুষের চিকিৎসা নাই। উপজেলা হাসপাতালে গেছিলাম এক স্যার ক্লিনিকে যেতে বললো। মানহীন ক্লিনিকে রোগী ভর্তি করতেও মালিক পক্ষ নেন নানা কৌশল। গ্রামগঞ্জে ঔষধের দোকানদারদের নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে রোগী পাঠাতে প্ররোচিত করা হয়। রোগীদের বিলের থেকে দেওয় হয় এ কমিশন। এছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলোয় থাকে তাদের দালাল। তারা রোগী ভাগিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে আসেন।

জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বপালনকারী সাধারণ সম্পাদক আনম বজলুর রহিম রিপন টিনিউজকে বলেন, আমাদের সমিতির অধিনে ১৩৯ টি ডায়াগনষ্টি সেন্টার এবং ১০৫ টি হাসপাতাল রয়েছে। চিকিৎসার নামে বাণিজ্য ও রোগীরা প্রতারিত হয় কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা আমি শতভাগ অস্বীকার করবো না। অনেকেই সেবার মান মেইনটেইন করে না। তবে রোগীদেরও সচেতন হতে হবে।

ক্লিনিক-ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের তদারকির দায়িত্বে থাকা সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকী টিনিউজকে বলেন, অনেকেই সরকারি শর্তাবলী মানে না। নিবন্ধন বা আবেদন না করেই চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করে দেন। আবেদন ছাড়া কতগুলো ক্লিনিক-ডায়াগনষ্টিক সেন্টার রয়েছে এটা তিনি জানেন না। তবে তার তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন রযেছে।

সুশাসনের জন্য নাগনিক সুজনের জেলার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক তরুন ইউসুফ টিনিউজকে বলেন, টাঙ্গাইলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা ক্লিনিকে নিখাঁদ সেবার মান নিয়ে আমরা অসন্তুষ্ট। দূর দুরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীরা প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্থ হন। গেলেই মোটা অংকের টেস্ট ধরিয়ে দেয়, তারপর ব্যবস্থাপত্র। একেক জায়গায় একেক রকম টেস্ট রেট। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের খেয়াল নেই।

টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা: আবুল ফজল মো. সাহাবুদ্দিন খান টিনিউজকে বলেন, বহু ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে সেবার মান যতটুকু দরকার ততটুকু নেই। আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান জরিমানা করি। ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, আমার ১০ মাসের দায়িত্বে কোন লিখিত অভিযোগ পাই নি। এ ধরনের ঘটনায় ক্লিনিক ও রোগীর পক্ষ মিলে টাকা পয়সার মাধ্যমে সমঝোতা করে ফেলেন।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি টিনিউজকে বলেন, সেবার নামে মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে দেওয়া হবে না। করোনার মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান কম হতো। আমরা আরো কঠোর ব্যবস্থা নিবো।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ