টাঙ্গাইলে বিষাদ বিচ্ছিন্নতা ভুলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য

158

হাসান সিকদার ॥
জীবন থেকে কত কী কেড়ে নিল করোনা! কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রিয়জনদের ছুঁ মেরে নিয়ে গেছে। বাবা-মা-আত্মীয় পরিজন হারিয়ে বিষাদে ডুবেছে অসংখ্য পরিবার। আক্রান্ত হয়ে মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও কম হয়নি। সেইসঙ্গে ছিল বিচ্ছিন্নতার কষ্ট। দিনের পর দিন ঘরবন্দী হয়ে পড়ে থাকা। কারও সঙ্গে দেখা নেই। এভাবে জীবন চলে? আসলেই চলছিল না। সময় বয়ে যাচ্ছিল। থেমে ছিল জীবন। এমনকি যারা আক্রান্ত হননি তারাও লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিলেন। ব্যবসা চাকরি সব হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এখন এ পর্যায়ে এসে সব ঠিক হয়ে গেছে, না, এমন নয়। তবে কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করার পর একটু একটু করে জট খুলতে শুরু করেছে। বিষাদ বিচ্ছিন্নতা ভুলে ছন্দে ফিরছে জীবন।
তার আগে গত ২০২০ সালের (৮ এপ্রিল) টাঙ্গাইলে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। সেই থেকে ঘোর দুর্দিনের শুরু। যত দিন যায় ততই বাড়তে থাকে সংক্রমণ ও মৃত্যু। কখনও কখনও সংক্রমণ কমেছে বটে। বড় করে নিশ্বাস নেয়ার সুযোগ দেয়নি। করোনার প্রথম ঢেউয়েই খেই হারিয়েছিল জীবন। দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। যথেষ্ট ভোগার পর সম্প্রতি কিছুটা আশার আলো দেখা যায়। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে গত (১১ আগস্ট) তুলে নেয়া হয় কঠোর বিধিনিষেধ। মূলত এরপর থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। প্রায় প্রতিটি মানুষকে এ সংগ্রামে লিপ্ত হতে দেখা যায়। করোনাকালে কেউ জীবিকা হারিয়েছেন। কেউ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবাই পূর্বাবস্থায় ফিরতে চান। ফিরতে শুরু করেছেন। টাঙ্গাইল তাই অনেকদিন ধরেই কর্মচঞ্চল। মানুষের জীবিকার লড়াই দৃশ্যমান হচ্ছিল সর্বত্র।
তবে গত (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত এক প্রাণচাঞ্চল্য। এদিন সারাদেশের ন্যায় টাঙ্গাইলেও স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা খুলে দেয়া হয়। তারপর থেকেই এ প্রাণচাঞ্চল্য। এখন আগের মতোই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠছে ছেলেমেয়েরা। ইউনিফর্ম পরে স্কুল বা কলেজে যাচ্ছে। আসছে। চেনা দৃশ্যটাই লাগছে নতুনের মতো। কচিকাঁচাদের মুখে হাসি লেগে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই গল্প আড্ডা জমাচ্ছে বন্ধুরা মিলে। শুধু কি তাই? স্কুলের সামনে বসে গেছে দোকান। অস্থায়ী দোকান ঘিরে নিয়ে ফুচকা খাচ্ছে মেয়েরা।
টাঙ্গাইল শহরের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ফুচকা খাচ্ছিল মাসুম, মিহির, জজসহ কয়েক সহপাঠী। খাওয়ার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল দিনটির জন্য অপেক্ষা করে ছিল সবাই। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মাসুম বলছিল, ফুচকা আমাদের খুব প্রিয়। কিন্তু বাসা থেকে বের হতে পারিনি বলে এতদিন খেতে পারিনি। তাছাড়া স্কুলের গেটের ফুচকাটা না হলে আমাদের চলে না। এখন পেয়ে সবাই মিলে মজা করে খাচ্ছি। একই ক্লাসের মিহির আরও বেশি উচ্ছ্বসিত। বলছিল, ভাত না খেলে চলে। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকা না খেলে চলে না। শহরের মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ মহবিদ্যালয়ের সামনে মুড়ি-চানাচুর, আচার, ফুচকা, বেলপুড়ি ইত্যাদি নিয়ে বিক্রেতারা হাজির। কলেজে ঢোকার সময় এবং বের হওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা এসব দোকান থেকে যার যা খুশি কিনে খাচ্ছে। খেতে খেতে কত যে গল্প! উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বন্যা আক্তার টিনিউজকে বলেন, আমরা বন্ধুরা একে অন্যকে ভীষণ মিস করছিলাম। ফোনে কথা হচ্ছিল। কিন্তু দেখা নেই সেই কবে থেকে। কবে দেখা হবে তাও জানতাম না। এখন তাই স্বপ্নের মতো লাগছে। বাইরে দেখে কিছু বুঝবেন না। ক্যাম্পাসের ভেতরে যান। সেখানে ঈদ চলছে আমাদের। বন্ধুরা একে অন্যকে ‘দোস্ত’ বলে বারবার জড়িয়ে ধরছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন যেমন হয় আর কী!’ স্যার ম্যাডামরাও এসবে আপাতত বাধা দিচ্ছে না বলেও জানায় সে।
কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির কী হবে? জানতে চাইলে ফিক্ করে হেসে দেয় নুরী আক্তার নামের আরেক শিক্ষার্থী। তার চটজলদি উত্তর, আমরা তো মাস্ক পরি। পকেটে হ্যান্ড স্যানিটাইজারও আছে। কথা বলতে বলতেই ওরা হাত স্যানিটাইজ করে নিল। সরকারি কুমদিনী মহিলা কলেজের বাইরে কথা হয় এক বাদাম বিক্রেতার সঙ্গে। সেখানে বাদাম বিক্রি করছিলেন তিনি। কী অবস্থা এখন? জানতে চাইলে নাজমুল নামের তরুণ বিক্রেতার পরিস্কার জবাব, ‘জীবনডা শ্যাষ হইয়া গেছিল। করোনা হয় নাই। গরিব মানুষ আমরা। আমরার করোনা হইবো কেন? তবে আয় রোজগার না থাকায় মরার অবস্থা হইছিল। লকডাউন গেছে। হের পর থাইকা আস্তে আস্তে বিক্রি বাড়ছে। এখন কলেজ খুইল্যা দিসে। এখন আর কোন চিন্তা নাই।’ অর্থাৎ সবাই নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। আশার আলো দেখছেন। এ আশা, এ স্বপ্নের কাছে করোনাকে পরাস্ত হতেই হবে। সেই সুদিনের জন্য অপেক্ষা করে আছে সাধারণ মানুষ।

 

ব্রেকিং নিউজঃ