টাঙ্গাইলে থৈ থৈ জলাশয়ে শোভা পাচ্ছে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য শাপলা

74

হাসান সিকদার ॥
শাপলা কেন জাতীয় ফুল? এতো এতো ফুলের মাঝে শাপলাকে কেন বেছে নেয়া হলো? অনেকেই উত্তর খুঁজে পান না। তবে এখন বর্ষার জলে থৈ থৈ নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় জল জলাশয়ে অজস্র শাপলা ফুটে আছে। সেদিকে চোখ রাখলে যে কেউ উত্তরটা পেয়ে যাবেন। সাদা রঙের ফুল। অথচ কী তার সৌন্দর্য! আকাশের তারারা যেন খসে পড়েছে জলের ওপর। এ ফুল শুধু নিজে ফোটে না, নদীমাতৃক বাংলাদেশ বলি আমরা, সে বাংলাদেশকে স্বার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে। বিপুল জলরাশির ওপরিভাগে ফুটে থাকা অজস্র শাপলা বাংলার নদী জল জলাশয়ের শোভা। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। দেখলে মন ভরে যায়। গ্রামবাংলার অকৃত্রিম রূপ ছায়া মায়া সবই যেন ধারণ করে আছে শাপলা। এসব কারণেই জাতীয় ফুলের মর্যাদা দিয়ে আরও আপন করে নেয়া হয় ফুলটিকে। গীতিকবির ভাষায়- যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে/যে দেশেতে কলমি কমল কনক হয়ে হাসে/সে আমাদের জন্মভূমি মাতৃভূমি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ…।
শাপলা পদ্ম গোত্রের ফুল। দিনের বেলায় ফুল ফোটে। জলে নিমজ্জিত নরম দন্ডেরে উপরিভাগে এ ফুল ফুটে থাকে। ১৩ থেকে ১৫টির মতো পাপড়ি হয়। ৪ থেকে ৫টি বৃন্তি। পাপড়ির মাঝখানে হলুদ রঙের পরাগদানি থাকে। লাল এবং নীল রঙের ফুলও হয় বটে। মূল রং সাদা। শাপলার পাতাও ভীষণ সুন্দর। বড় গোলাকার পাতা পানির ওপর চমৎকার ভেসে থাকে। খাঁজকাটা আউটলাইন। গ্রামের মানুষেরা শাপলার ভাসমান বাগানের মধ্য দিয়ে ডিঙ্গি চালিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যান। যেতে যেতে অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করেন। কেউ কেউ হাত বাড়িয়ে তুলে নেয় দু একটি শাপলা ফুল। দুরন্ত কিশোর-কিশোরীরা আবার নিজেরাই ছোট নৌকা নিয়ে বের হয়ে পড়ে। নৌকার পাটাতন ভর্তি করে শাপলা নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা। গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা এক সময় বিল ঝিলে ডুব দিয়ে শালুক তুলে আনত। শাপলার শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত শালুক সেদ্ধ করে খেয়ে জীবন বাঁচাতেন অনেকে। এখন গ্রামীণ অর্থনীতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। মাটির নিচ থেকে শালুক তুলে খাওযার লোক তেমন চোখে পড়ে না।
তবে টাঙ্গাইলে শাপলা এখন, বলা চলে, প্রিয় সবজি। শহরের কাঁচা বাজারে আরও অনেক সবজির সঙ্গে শাপলা পাওয়া যাচ্ছে। তারও বেশি বিক্রি হচ্ছে ভ্যানে করে। টাঙ্গাইল শহরের আশপাশের নদী, খাল, বিল, পুকুর, জলাশয় থেকে এগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শাপলা আসছে শহরে। এখনও এতো শাপলা হয় জলাশয়ে! দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। দেখা যায়, শাপলা ফুলে অদ্ভুত সেজে আছে ঘাট। নৌকার পাটাতনে শাপলা লম্বা করে বিছিয়ে বিক্রি করতে নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। ঘাটে আসার পর সেগুলো তারের মতো গোল করে পেঁচিয়ে নেয়া হচ্ছে। শাপলার স্তূপের মধ্য থেকে উঁকি দিচ্ছে ফুল। অবশ্য ফুল নিয়ে বিক্রেতাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। অনেক ফুল একসঙ্গে গিট দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। গাদাগাদি করে থাকা ফুলেও সৌন্দর্যের কমতি নেই।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, শাপলা ফুলের জন্য বিখ্যাত হলেও, সংগ্রহ করা হয় সবজি হিসেবে। বেশিরভাগ শাপলা টাঙ্গাইল শহরের আশেপাশের উপজেলা বিল, নদী থেকে আসে। নদীর শাপলায় সরাসরি কারও মালিকানা নেই। যার ইচ্ছা সে নৌকা নিয়ে গিয়ে তুলে আনতে পারে। বর্ষায় অনেকের কাজ থাকে না। মূলত তারা এ কাজে নিয়োজিত হন। স্থানীয়রা শাপলা তোলার পর সেখানেই ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। রান্নায় পারদর্শী শহুরে নারীরা শাপলার নরম কান্ড বিশেষ কায়দায় রান্না করেন। নতুন নতুন রেসিপি আবিষ্কারেও ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তাদের। তবে বিলের বুকে ভেসে থাকা শাপলা ফুলের যে সৌন্দর্য তার কোন তুলনা হয় না। শাপলা এমনই এক ফুল।

 

ব্রেকিং নিউজঃ