টাঙ্গাইলে কান্দাপাড়া যৌনপল্লীর দালালের হাত ধরে শুরু যে জীবন

924

স্টাফ রিপোর্টার ॥
দুধে আলতা গায়ের রং যাকে বলে, সুমা মেয়েটার গায়ের রং ঠিক তেমনই। পান খাওয়া ঠোঁটের হাসিতে যেনো মুক্তা ঝরে। কোমরের বিছা আর রিনিঝিনি শব্দে নূপুর পায়ের হাঁটা দেখলে যে কারো ভ্রম হতে বাধ্য যে সে কোনো গল্প-সিনেমার নায়িকা। কিন্তু কোটা বাড়ির ফাঁদে বন্দি যে সুমা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল মেয়েটির। বিয়ের পর প্রথম এক বছর সব ঠিকঠাক ছিল।
অটোরিক্সা চালক স্বামীর ছোটখাটো দোষত্রুটি থাকলেও মানিয়ে নিয়েছিল নিজেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলোমেলো হতে শুরু করে সব। ফুটফুটে মেয়েটিকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ উপায়ে যৌনকাজে বাধ্য করা শুরু করল স্বামী। একেকটা রাত তখন একেকটা বছরের মতো। তবু মুখ বুঝে সহ্য করতে লাগলো সুমা। কিন্তু এরপর যা ঘটলো তা মেনে নিতে না পেরে রাতের অন্ধকারে প্রতিবেশির সহযোগিতায় বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান খুলনার বাগেরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়ে সুমা।




শুধু সুমা নয়, টাঙ্গাইলের কান্দাপাড়ার যৌনপল্লীর প্রায় অধিকাংশ যৌনকর্মীর জীবনের গল্পই এমন। সুখের আশায় বাড়ি ছাড়লেও এই যৌনপল্লীর চার কোনা আকৃতির কোটা বাড়ির ফাঁদে পরে কাটাতে হচ্ছে জীবন। এদের জীবনে যেমন নেই ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা, সামাজিক স্বীকৃতি, তেমনি নেই শিক্ষার আলো। এমনকি মারা যাওয়ার পর নেই জানাযা পাওয়ারও নিশ্চয়তা। অনেকেই একটা নির্দিষ্ট সময় পরে এই যৌনপল্লীর অন্ধকার গহ্বর থেকে বের হতে পারলেও বেশিরভাগকেই কাটাতে হয় দুর্বিষহ অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন। কেউ কেউ আবার নিজেদের দুঃখ ভোলার জন্য বুদ হয়ে থাকছেন মাদকে। যৌবন শেষে যখন শারিরীক সক্ষমতা থাকছে না, তখন ‘খদ্দের’ও থাকছে না। ফলে অর্থের অভাবে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। সারাক্ষণ মাদক, উচ্ছেদ আতঙ্ক আর ক্ষমতাশীলদের দাপটে তঠস্থ থাকতে থাকতেই নিভে যাচ্ছে তাদের জীবন প্রদীপ।
সরকারিভাবে তাদের জন্য সামান্য কিছু স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকলেও ভাসমান এই জনগোষ্ঠীর জন্য নেই স্থায়ী কোনো আবাসনের ব্যবস্থা। বেসরকারি কয়েকটি এনজিও এই যৌনকর্মীদের জন্য উন্নয়নমূলক কিছু কাজ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। মূলধারায় ফিরিয়ে না আনা গেলেও অন্তত: যেনো খেয়ে-পড়ে, স্থায়ী একটা ঠিকানায় জীবন কাটাতে পারে এর জন্য সরকারের কাছে আবেদন সমাজের এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর।




সম্প্রতি টাঙ্গাইল যৌনপল্লী সরেজমিনে সুমার গল্প শোনার সময় বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক এক কাহিনী। যৌনপল্লীতে আসার গল্পটা বলতে গিয়ে সুমার চোখের কোনায় জল। সেই জল লুকিয়ে তিনি বলতে থাকলেন, ‘স্বামী নামের ওই শয়তানডা একেক রাইতে একেকজন বন্ধুরে নিয়া আসতো আমার লগে শোয়ানোর জন্য। হেরা আমার সঙ্গে নানা উপায়ে খারাপ কাম করতো আর হে হেই দৃশ্য দেইখা আনন্দ লইতো। রাগে-দুঃখে দুই বার আত্মহত্যা করতে গেছিলাম। কিন্তু সাহস হয় নাই। পারলাম না। বাধ্য হইয়া একদিন প্রতিবেশি সুলেমান ভাইয়ের সহযোগিতায় বাইর হইয়া গেলাম রাইতের অন্ধকারে। কিন্তু ওই যে কয়, কপালের লিখন না যায় খ-ন। সেই সুলেমান ভাই চাকরি দেওয়নের কথা কইয়া লইয়া গেলো দৌলতদিয়ার ঘাটে। ঢাকায় নিয়া যাইবো। কিন্তু তখন তো আর বুঝি নাই কি হইতাছে।’
তিনি বলেন, ‘পথে আমারে শরবত খাইতে দিছিলো। সেই শরবত খাইয়া গভীর ঘুম পাইলো। ঘুম থেইক্কা উইঠ্ঠা দেখি আমি দৌলতদিয়া ঘাটের পতিতাপল্লীতে। এক সর্দারনী পান খাওয়া মুখে আমার দিকে তাকাইয়া রইছে। আর মিটমিট কইরা হাসতাছে। জিগাইলাম হাসেন ক্যান? কইলো এইরকম ডিগা মাইয়া এই লাইনে কমই আছে। তোরে দিয়া আমার লাভই হইবো। তহনো এই কথার মানে বুঝি নাই। বুঝলাম রাইতের বেলা। একেকজন কইরা আমার ঘরে লোক পাঠায় আর হেরা জোর কইরা আমার কাপড় খুইল্লা খারাপ কাম করে। পয়লা রাইতেই ছয় জনরে পাঠাইলো আমার ঘরে। সবার যখন মন ভরলো তহন আমার অচেতন হওয়ার দশা!’




এই পতিতাপল্লীতে সে আছে প্রায় ৬ বছর। এর আগে সর্দারনির অধীনেই কাজ করেছে। হাসার কারণ জানতে চাইলে বলে, ‘কি আর কমু আফা। ওইদিন রাইতে যেগুলা মানুষ আসছিলো হেরা সবাই তো বালা মানুষ। সুস্থ। কিন্তু হেরপর সর্দারনি ২০ টেকা, ৫০ টেকার লাইগ্গা রাস্তার পাগলরেও আমার ঘরে পাঠানি শুরু করলো। না পাইরা এইখানে পলাইয়া আইছি। এখন নিজে স্বাধীন কাম করি। এক টেকা পাইলেও আমার দশ টেকা পাইলেও আমার।’
জানা যায়, বেশিরভাগই দালালের মাধ্যমে সর্দারনির কাছে বিক্রি হয়ে এই যৌনপল্লীতে বসবাস করছেন। মোট ৬১১ জন যৌনকর্মী রয়েছে এখানে। যৌনকর্ম একটি অসম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই জীবন কাটাচ্ছেন তারা। টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট এবং পটুয়াখালীর জেলার ১১টি যৌনপল্লীতে বর্তমানে কাজ করছেন তিন হাজার ৭২১ জন যৌনকর্মী। এদের মধ্যে স্বাধীন যৌনকর্মী আছেন তিন হাজার ৭৭ জন। আর বাঁধা যৌনকর্মী ৬৪৪ জন। যৌনকর্মীর সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী দৌলতদিয়ায়। এখানে কাজ করছেন এক হাজার ৪২০ জন যৌনকর্মী। এরপরেই রয়েছে টাঙ্গাইলের অবস্থান। দেশের নানা প্রান্ত থেকে নিগৃহিত হয়ে এখানে বাধ্য হয়ে এ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তারা। এমনই আরেকজন যৌনকর্মী সোহানা বলেন তার জীবনের গল্প।
ওড়না দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখার শর্তে সিরাজগঞ্জের এই মেয়েটি বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই প্রেমে পরছিলাম এক সহপাঠীর। দুইজনে ভালোই ছিলাম। কিন্তু একদিন বড় ভাই আমাগো এক লগে দেইখা ফালায়। আর যায় কই। বাড়িত নিয়া কোমড়ের বেল্ট খুইল্লা এমন মাইর শুরু করল সারা শরীর দিয়া রক্ত পরন শুরু হইলো। রাগে দুঃখে ওইদিন রাইতেই বাড়ি থেইক্কা বাইর হইয়া ঢাকার বাসে উইঠা গেলাম। আমাগো গ্রামের এক মাইয়া গাজীপুরের একটা গার্মেন্টেসে চাকরি করে। থাকে বস্তিতে। হের বাড়ি গিয়া উঠলাম। কয়দিন বালাভাবেই কাটছে। কিন্তু হের মনে যে কি ছিলো তা তো আর জানতাম। একদিন বেড়াইতে নিয়া যাওনের কথা কইয়া এই পল্লীতে নিয়া আসলো। বেদেনা নামের এক সর্দারনির ঘরে বসাইয়া রাইখা সেই যে গেলো আর ফিরা আসলো না। আমারও মনে থিক ধইরা গেলো। যা থাকে কফালে। এইখান থেইক্কা আর কুনুখানে যামু না। সেই থেইক্কা আছি। প্রত্থম প্রত্থম সর্দারনির অধীনেই কাম করছি। এখন স্বাধীনভাবে কাম করি। দিনে ৫০০ টেকা ঘর ভাড়া দেই। কাস্টমারগো কাছ থেইক্কা এক কামের লাইগ্গা ৫০০ টেকা লই। কনডম ছাড়া এক হাজার। খাইয়া-থুইয়া টেকা আরও রইয়া যায়। হেই টেকা জমাইতাছি। একদিন দূরের কোনো জায়গায় চইলা যামু এইহান থেইক্কা। নিজের একটা ঘর বান্দুম। কিন্তু দূরে কোথাও ঘর বাঁধা তো দূরে থাক কোটা বাড়ির এই ফাঁদেই আটকে রয়েছে সোহানাদের জীবন।




দেশের ১১টি যৌনপল্লীর উপর সেড’র চালিত এক জরিপের প্রেক্ষিতে জানা যায়, এসব পল্লীতে বাড়ির সংখ্যা রয়েছে ৪২৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়ি দৌলতদিয়ায়। এরপর রয়েছে যথাক্রমে টাঙ্গাইলে ৪৯টি, বানিশান্তায় ৩৮টি, সিঅ্যঅন্ডবি ঘাটে ২৫টি, পটুয়াখালীতে ১৩টি, ময়মনসিংহে ১২ এবং জামালপুরে ১১টি। এসব বাড়িতে মোট কক্ষ রয়েছে ৩ হাজার ৩৮৬টি। প্রতিটি কক্ষের জন্য যৌনপল্লীভেদে নির্ধারিত দৈনিক বা মাসিক ভাড়া দিতে হয়। একেকটি কক্ষের ভাড়া প্রতিদিন ৫০০ টাকা। এই ৫০০ টাকা যোগাড়ের পাশাপাশি খাওয়া-পড়ার টাকাও শরীর বেঁচে যোগাড় করতে যৌনপল্লীর এই মেয়েদের।

 

ব্রেকিং নিউজঃ