টাঙ্গাইলে করোনায় কঠিন সঙ্কটে শ্রমিকদের জীবন জীবিকা

133

হাসান সিকদার ॥
টাঙ্গাইল শহরের পূর্ব আদালত পাড়া এলাকার একটি ভবনে কাজ করতেন রোজিনা বেগম (৩৩)। করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় তাকে গত মার্চ মাসের বেতন দিয়ে একেবারে বিদায় করে দিয়েছেন তার গৃহকর্তা। কোথাও কাজের ব্যবস্থা করতে না পারায় ঘরভাড়া দিয়ে শুক্রবার (৩০ মে) গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন রোজিনা বেগম। চলমান লকডাউনে দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক পরিবহন বন্ধ থাকায় কোনভাবে দিনযাপন করছেন আলিম মিয়া। দুবার বাস মালিকদের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা পেয়েছেন। আলিম জানান, আর্থিক সহায়তা নেই, কাজ নেই, ঘরে খাবারও নেই। করোনা মহামারীতে রোজিনা বেগমের মতো গৃহকর্মী কিংবা আলিমের মতো পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা এই নগরীতে অনেকাংশেই বেড়েছে। জীবন বাঁচাতে ধারকর্জের জন্য হয় আত্মীয়স্বজন, নয়ত ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়েছে শ্রমিকদের। আবার কাউকে কাউকে নিতে হয়েছে সরকারের দেয়া খাদ্যসহায়তা। করোনা মহামারীতে কর্মজীবী শ্রমিকদের নানামুখী সঙ্কটের মধ্যে আজ শনিবার (১ মে) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। মহান মে দিবস।
জানা গেছে, বিগত ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে লাখ লাখ শ্রমিক সমবেত কণ্ঠে দাবি তুলেছিলেন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত নয়, আট ঘণ্টা কর্মদিবস চাই। শ্রমিকদের গুলি করে হত্যার মাধ্যমে সেই আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করাই শুধু নয়, আন্দোলনের নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। বিগত ১৯১৯ সালে আইএলও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সারাবিশ্বে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। শ্রম দাসত্ব থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে শ্রমজীবী মানুষ গভীর আবেগে মে দিবস পালন করে। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকেই মে দিবস সরকারী ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে গণজমায়েত হয় এমন কোন অনুষ্ঠান এবার হচ্ছে না। তবে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে গণমাধ্যমগুলোও বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে।
জানা যায়, মে দিবসের প্রধান দাবি আট ঘণ্টা কর্মদিবস দেশের ২২ লাখ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হলেও কোটি কোটি বেসরকারী শ্রমিক সেই সুফল পান না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি ছয় কোটি আট লাখ। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে (শ্রম আইনের সুবিধা পান) কর্মরত জনশক্তির মাত্র ১৪.৯ শতাংশ। সবচেয়ে বড় অংশ ৮৫.১ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এই হিসাবে দেশের পাঁচ কোটি মানুষ দিনমজুরের মতো কাজ করে; যাদের শ্রম আইন-২০০৬ প্রদত্ত নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা, ঝুঁকি ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়াসহ বেশিরভাগ অধিকারই নিশ্চিত নয়। মালিকপক্ষের ইচ্ছায় তাদের কাজ ও মজুরি নির্ধারণ হয়ে থাকে। একাধিক শ্রমিক সংগঠনের দেয়া তথ্য মতে, শ্রম আইন নির্ধারিত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে ৪৩টি সেক্টরের সোয়া কোটি শ্রমজীবীর নি¤œতম মজুরি নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকলেও বাকি লাখ লাখ শ্রমিককে ‘কাজ নাই তো মজুরি নাই’ নীতিতে কাজ করানো হয়ে থাকে। ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক নির্মাণ খাতে, ৭০ লাখ পরিবহন খাতে, তিন লাখ পাট খাতে এবং ১০ লাখের বেশি দোকান কর্মচারী, চা, চামড়া, তাঁত, রিরোলিং, মোটর মেকানিক, লবণ, চিংড়ি, সংবাদমাধ্যম, হাসপাতাল-ক্লিনিক, পুস্তক বাঁধাই, হকার, রিক্সা-ভ্যানচালক, ইজিবাইক চালক, সিকিউরিটি গার্ডসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন।
শ্রমিক নেতারা জানান, শ্রমিকদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাড়িভাড়া, পোশাক ও চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে যাওয়ার ফলে সঞ্চয় যেমন থাকছে না, তেমনি দক্ষতা অর্জনের জন্য বাড়তি খরচ করাও শ্রমিকের জন্য সম্ভব হয়ে উঠছে না। এরপর শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তো রয়েছেই। সাভারে রানা প্লাজা ধস ও তাজরীনসহ বিভিন্ন কারখানার অগ্নিকান্ড শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে। সর্বশেষ করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই দুর্যোগ শ্রমিকদের অসহায়ত্বের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করে তুলেছে। এসব ক্ষেত্রে মালিকের মুনাফার শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা।
আজ শনিবার (১ মে) মহান মে দিবসে টাঙ্গাইলের সড়কগুলোতে শ্রমিকদের কাঁপানো স্লোগান থাকছে না। কোন সভা-সমাবেশ আর শোভাযাত্রা হবে না। করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ৩০০ কোটির বেশি শ্রমজীবী মানুষের জীবন স্তব্ধ করে দিয়েছে। ফলে আজ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হলেও করোনা দুনিয়ার এসব শ্রমজীবী মানুষের জীবন করে দিয়েছে লন্ডভন্ড।

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ