টাঙ্গাইলে এক সপ্তাহে ছয় মামলায় বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

145

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলে এক সপ্তাহে ছয় মামলায় বিএনপি ও সহযোগি সংগঠনের ৩৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। টাঙ্গাইল জেলা ও উপজেলা বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ একের পর এক মামলা করার অভিযোগ করেছে বিএনপি। গত এক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন থানায় বিস্ফোরক আইনে পাঁচটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। ঘটনা না ঘটলেও দলের নেতাকর্মীদের হয়রানির জন্য পুলিশ এসব ‘গায়েবি মামলা’ করছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপির নেতারা।




অবশ্য প্রতিটি মামলাই সঠিক বলে দাবি করেছেন টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) মো. শরফুদ্দিন। তিনি বলেন, আসামিদের ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছে বিস্ফোরক পাওয়া গেছে। তাই মামলা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এখন তাঁদের নেতারা এসব মামলাকে সাজানো বলছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৪ নভেম্বর) বাসাইল উপজেলা বিএনপির তিন নেতার দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাঁরা হচ্ছেন- উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আবুল হাশেম, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব শাহ আলম ভূইয়া ও কাশিল ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রফিক মিয়া। বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, বুধবার (২৩ নভেম্বর) এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই তিনজনসহ দলের আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করা হয়। বাসাইল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) টিটু চৌধুরী বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪০-৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়।




এর আগে বুধবার (২৩ নভেম্বর) মির্জাপুর থানার এসআই মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ছয় নেতাকে আসামি করা হয়। ওই ছয় নেতাকে বুধবার (২৩ নভেম্বর) দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তাঁরা এখন রিমান্ডে পুলিশ হেফাজতে আছেন। গত মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) রাতে মির্জাপুরের গোড়াই নাজিরাপাড়া কাশেম ড্রাইসেল মিলের পাশে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে এই মামলা হয়। জুলহাস মিয়ার ড্রাম্প ট্রাক ও এক্সাভেটর ভাড়া দেন। তিনি বলেন, পেশাগত কারণে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) রাতে তিনি কোনো ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ বা অন্য কোনো শব্দ শোনেননি। কোনো হইচইও কানে আসেনি। তবে পরদিন সকালে শুনেছেন তাঁদের এলাকায় পুলিশের ওপর ককটেল মারার অভিযোগে কয়েকজনকে ধরেছে পুলিশ।




একই দিন ঘাটাইল উপজেলা বিএনপির ১০ নেতাকর্মীরও দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। আগের দিন মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) তাঁদের গ্রেপ্তার করে পুলিশের ওপর ককটেল হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়। ওই মামলায় ৩৫ জনের নাম উল্লেখসহ ৪০-৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া ১০ জন নেতাকর্মী পুলিশ হেফাজতে আছেন।




সোমবার (২১ নভেম্বর) রাতে টাঙ্গাইল শহরে বিএনপির প্রস্তুতি সভা থেকে ফেরার পথে তিনজন আইনজীবীসহ ১২ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই রাতেই তাঁদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত এক দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ওই ১২ জন টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে আছেন।




এছাড়া গত (২১ নভেম্বর) নাগরপুর উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের দু’জনকে এবং গত (১৭ নভেম্বর) কালিহাতী উপজেলার পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও পুলিশ বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলা করে। উভয় মামলাতেই আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়। কালিহাতীর মামলায় ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ ৩০-৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। নাগরপুরের মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখসহ ৪০-৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ঘটনার স্থান উল্লেখ করা হয়েছে সহবতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ। ওই স্কুলের পাশের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মনির উদ্দিন। তিনি বলেন, ওই দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন। ককটেল বা অন্য কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শোনেননি। আশপাশের অন্য কেউও শোনেননি। পরদিন সকালে ওই বাজারে গিয়ে শুনেছেন পুলিশ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে।




বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, এভাবে একের পর এক মামলার ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। যাঁদের নাম মামলায় রয়েছে তাঁরা গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছেড়েছেন। অন্যরাও গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। যে কাউকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ। আগামী (১০ ডিসেম্বর) ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ বাধাগ্রস্ত করতে পুলিশ ধারাবাহিকভাবে এই মামলা করছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাদের।




এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, পুলিশ এক সপ্তাহে টাঙ্গাইলে ছয়টি মামলা করেছে। এর পাঁচটিতেই পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ কোথাও কোনো ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। কাউকে বাড়ি থেকে, কাউকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা রাস্তা থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে ককটেল নিক্ষেপের কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়েছে। সব মামলাই ‘গায়েবি মামলা’। অবিলম্বে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ