সোমবার, আগস্ট 10, 2020
Home এক্সক্লুসিভ টাঙ্গাইলে ঋতু রাণী আষাঢ়ে প্রকৃতি বৃষ্টিতে ধুয়ে সতেজ

টাঙ্গাইলে ঋতু রাণী আষাঢ়ে প্রকৃতি বৃষ্টিতে ধুয়ে সতেজ

জাহিদ হাসান ॥
মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে/আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদলদিনে…। সেই বাদল দিনের, বাদল-দিনের শুরু হলো। এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা। সোমবার (১৫ জুন, ১ আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ)। আষাঢ়ের প্রথম দিবস থেকে আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো প্রিয় ঋতু রাণী বর্ষার।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষা খুব, খুবই উল্লেখযোগ্য। বছর ঘুরে আবারও এসেছে বর্ষণমুখর দিন। এরই মাঝে বদলাতে শুরু করেছে টাঙ্গাইলের প্রকৃতি। এতো দিনের রুক্ষ শুষ্ক প্রকৃতি বৃষ্টির জলে ধুয়ে সবুজ সতেজ হচ্ছে। উর্বর হচ্ছে টাঙ্গাইলের ফসলের মাঠ। কবিগুরুর ভাষায়: তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে, ফসল ফলে-/মরু বহে আনে তোমার পায়ে ফুলের ডালা…। বর্ষাকে স্বাগত জানিয়ে নজরুল লিখেছেন: রিম্ঝিম্ রিম্ঝিম্ ঘন দেয়া বরষে।/কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে…। ভাটি বাংলার সাধক উকিল মুন্সি ঘাটে নতুন পানি দেখে উতলা হয়ে গেয়েছিলেন: যেদিন হইতে নয়া পানি আইলো বাড়ির ঘাটে সখি রে/অভাগিনীর মনে কত শত কথা ওঠে রে…। বাঙালীর হৃদয়ে জমে থাকা কথা বর্ষায় ভাষা পায়। মন জাগিয়ে দিতে, আবেগ ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে আসে বর্ষা। এবারও এসেছে।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। বর্ষাও দিন ক্ষণ অতো মানে না। অনেক দিন আগে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। ঝড়ো হাওয়া ভারি বর্ষণ মূলত আভাস দিচ্ছিলÑ বর্ষা আসছে। আর প্রকৃত শুরু আজ থেকে। ঋতুর হিসেবে আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। এ সময় জলীয় বাষ্পবাহী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয় বর্ষায়। নিয়মিত বর্ষণে বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ। বর্ষার ভারি বর্ষণে শরীর ধুয়ে নেয় প্রকৃতি। বেলী, বকুল, জুঁই, দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনার ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ। আর মিষ্টি হাসি হয়ে ফোটে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল।’ ময়ূর পেখম মেলে নাচে।
বর্ষার অপরূপ রূপ দেখা যায় গ্রামবাংলায়। বিশেষ করে চরঅঞ্চলে। এ সময় টাঙ্গাইলের ছবিটা আমূল বদলে যায়। গ্রীষ্মে যে অংশ ফসল ফলত, বর্ষায় তা অথৈ জলের নদী। শুকনো মৌসুমে যে জায়গায় হালচাষ করে কৃষক, ভরা বর্ষায় সেখানে জাল ফেলে মাছ ধরে জেলে।
প্রকৃতি পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের হৃদয়েও নানাভাবে ক্রিয়া করে বর্ষা। মন মেঘের সঙ্গী হতে চায়। কবিগুরুর ভাষায়: মন মোর মেঘের সঙ্গী,/উড়ে চলে দিগ্দিগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে/রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম…। বর্ষায় মন কখনো ‘ময়ূরের মতো নাচে রে।’ আবার কখনো বেদনায় বেদনায় ডুবায়। তুমি যদি না দেখা দাও, কর আমায় হেলা,/কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা…। প্রিয়জন ছাড়া যেন কাটতে চায় না দিন। কারও কারও বুকে বাজে হারানোর ব্যথা। বর্ষায় সে যন্ত্রণার কথা কথা জানিয়ে কবি লিখেন: চেনা দিনের কথা ভেজা সুবাসে,/অতীত স্মৃতি হয়ে ফিরে ফিরে আসে।/এমনি ছলছল ভরা সে-বাদরে/তোমারে পাওয়া মোর হয়েছিল সারা…।
এসব বিবেচনায় বিরহের ঋতু বটে বর্ষা। বাদল দিনে বিরহকাতর হয়ে ওঠা বাঙালী মনের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে সমকালীন কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, বর্ষাই একমাত্র নারী। একমাত্র রমণী। তিনি আমাদের প্রিয় দ্রৌপদী। বাকি পাঁচ ঋতু হচ্ছে মহাভারতের পঞ্চপা-ব! হয়তো এ কারণেই বর্ষায় বিরহ বেড়ে যায়।
অবশ্য বর্ষার সবই উপভোগ্য উপকারের- এমনটি বলা যাবে না। ভারি বর্ষণে, পাহাড়ী ঢলে গ্রামের পর গ্রাম যে ভাসিয়ে নেয় সে-ও বর্ষা! অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার মানুষ এ সময় বন্যার আশঙ্কায় থাকে। কখনও কখনও কৃষকের ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়। শাহ আবদুল করিমের ভাষায়: আসে যখন বর্ষার পানি ঢেউ করে হানাহানি/ গরিবের যায় দিন রজনী দুর্ভাবনায়/ ঘরে বসে ভাবাগুনা নৌকা বিনা চলা যায় না/বর্ষায় মজুরি পায় না গরিব নিরুপায়…। একইভাবে ঝড়ে খেই হারানো জেলের নৌকোটি ঘাটে সব সময় ফিরতে পারে না! আর কর্দমাক্ত পথে পা পিছলে পড়ার গল্প তো প্রতিদিনের। বর্ষার কাছে কবিগুরুর তাই প্রার্থনা করে বলেন, এমন দিনে সকলের সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধারায়,/বামে রাখ ভয়ঙ্করী বন্যা মরণ-ঢালা…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

ব্রেকিং নিউজঃ