টাঙ্গাইলে আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন কাদের সিদ্দিকী

69

স্টাফ রিপোর্টার//

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি আজকের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। টাঙ্গাইল তথা স্বাধীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিনেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে অস্ত্র জমা দেন মুক্তিযুদ্ধে কাদেরীয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী বালক স্কুল মাঠে কাদেরীয়া বাহিনীর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুবিজুর রহমানের কাছে অস্ত্র তুলে দেন তিনি। পূর্ণতা পায় মুক্তিকামী টাঙ্গাইল জেলাবাসীর আরেকটি অধ্যায়ের।
কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমাদানের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বিকেলে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। টাঙ্গাইল শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমাদান উদযাপন কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, কবি আল মুজাহিদীসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। এতে সভাপতিত্ব করবেন কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমাদান উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও কাদেরিয়া বাহিনী ’৭১ এর প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত করিম।





জানা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার বাইরে এই দিন প্রথম টাঙ্গাইলে আসেন। কাদেরিয়া বাহিনীর ১৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও ৭২ হাজার সেচ্ছাসেবক এই দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানান। ওই দিন অনুষ্ঠানে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তাঁর ব্যবহৃত স্টেনগানসহ নানা ধরণের প্রায় লক্ষাধিক অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। অস্ত্র জমা দেওয়া অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা স্বরূপ বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল নানা ধরনের দশ হাজার অস্ত্র। মেজর আব্দুল হাকিমের নেতৃত্বে তিন হাজার সশন্ত্র মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুকে সশন্ত্র অভিবাদন জানানোর জন্য মাঠের এক পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও কাদের সিদ্দিকী মঞ্চে ওঠার পর প্যারেড কমান্ডার মেজর হাকিম মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করে সশন্ত্র অভিবাদন জানালেন। কাদের সিদ্দিকী হাঁটু গেড়ে বসার সাথে তাল মিলিয়ে মাঠের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো তিন হাজার মুক্তিযোদ্ধাও হাঁটু গেড়ে বসে যার যার অস্ত্র মাটিতে রেখে কাদের সিদ্দিকীর সাথে তাল মিলিয়ে দাঁড়িয়ে অস্ত্র জমা দেন। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিকেল বেলা টাঙ্গাইলের ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ জনসভায় বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এটাই রাজধানী ঢাকার বাইরে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভায় ১০ লক্ষ লোকের সমাগম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
কাদের সিদ্দিকী তাঁর লেখা স্বাধীনতা ৭১ গ্রন্থের ৬০৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘অস্ত্র হস্তান্তর’ শিরোনামে সেদিনের বিষয়াবলী লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি লিখেছেন ঘড়ির কাঁটা বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের ঘরে। বঙ্গবন্ধুকে বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে অস্ত্র জমা দেওয়ার মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলো। অস্ত্র জমা দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে নানা ধরনের হাজার দশেক হাতিয়ার বিন্দুবাসিনী স্কুলমাঠে সারি করে দাঁড় করা ছিল। তিন হাজার সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চের সামনে মাঠের একপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও আমি মঞ্চে উঠতেই প্যারেড কমান্ডার মেজর আব্দুল হাকিম মাঠে দাঁড়ানো মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করল এবং সশস্ত্র অভিবাদন জানাল। পরে আনুষ্ঠানিকতা সেরে হাঁটু গেড়ে বহুদিনের বহু লড়াইয়ের স্মৃতিবিজড়িত স্টেনগানটি বঙ্গবন্ধুর পায়ের সামনে রাখলাম। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারির ঐতিহাসিক দিনের চিত্রগুলো মুক্তিযোদ্ধাগণ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।





বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক পুত্র কাদের সিদ্দিকী ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ আবদুল আলী সিদ্দিকী ও মাতার নাম লতিফা সিদ্দিকী। পৈতৃক নিবাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী ইউনিয়নের ছাতিহাটী গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই কাদের সিদ্দিকী প্রতিবাদী, সাহসী ও অন্যায়ের সঙ্গে আপসহীন। তাঁর ডাক নাম বজ্র। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখায় তিনি ‘বাঘা সিদ্দিকী’ হিসেবেও খ্যাতিমান।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইল তথা দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রায় ১৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের সমন্বয়ে কাদের সিদ্দিকী গঠন করেন একটি গেরিলা বাহিনী। কাদের সিদ্দিকী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ায় বাহিনীটি ‘কাদেরীয়া বাহিনী’ নামে সুপরিচিত। কাদেরীয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ১১ নম্বর সেক্টরে কমপক্ষে তিন শতাধিক ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রায় ৩০০০ হানাদার সদস্য হত্যা করেন। কাদের সিদ্দিকী নিজে ৩০টিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীসহ আলবদর, আলশামস, রাজাকারদের কাছে আতঙ্কের নাম ছিল কাদেরীয়া বাহিনী। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর কাদেরীয়া বাহিনীর সহায়তায় কালিহাতী উপজেলার পৌলীতে ভারতীয় ছত্রীসেনা অবতরণ করে। ১১ ডিসেম্বর কাদেরীয়া বাহিনীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত হয়। মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কাদের সিদ্দিকীকে বঙ্গবন্ধুর সরকার বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে। খেতাব নং-৬৮ (গণবাহিনী), সেক্টর নং-১১।
কাদের সিদ্দিকী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তিনি হত্যার প্রতিবাদে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। এজন্য তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। দীর্ঘদিন ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমকে বঙ্গবন্ধু বাকশাল সরকারের টাঙ্গাইলের গর্ভনর নিযুক্ত করেন। ১৯৯৬, ২০০১ সালে তিনি টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে কাদের সিদ্দিকী নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা প্রতীক)। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি সর্বদাই নিবেদিত।




রাজনীতিবিদের পাশাপাশি তিনি একজন সুলেখক। বিভিন্ন পটভূমিতে তাঁর লেখাগুলো পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশকয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন তিনি। তার রচিত ‘স্বাধীনতা ৭১’ গ্রন্থটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং কাদেরীয়া বাহিনীর প্রামাণ্য দলিল।
কাদের সিদ্দিকী পারিবারিক জীবনে নাসরিন সিদ্দিকীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর এক ছেলে দ্বীপ সিদ্দিকী এবং দুই মেয়ে কুড়ি সিদ্দিকী ও কুশি সিদ্দিকী। তার বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।
এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী খন্দকার মোখলেছুর রহমান (মণি খন্দকার) বলেন, ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি সত্যি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। কেননা আমরা যে মহান নেতার ডাকে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম, আবার সেই নেতার পদতলে আমাদের সবার পক্ষে কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম অস্ত্র জমা দেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে ফেরেন। এরপরেই রাজধানী ঢাকার বাইরে প্রথম টাঙ্গাইলে আসেন। দিনটি বিভিন্ন আঙ্গিকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আর সেদিনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এ দিনটিকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি এবং পালন করার দাবি করছি। যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে।
জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, বাংলাদেশ নামের একটি ভূখন্ড যত দিন পৃথিবীর মানচিত্রে থাকবে তত দিন দেশে-বিদেশে স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করবে কাদেরীয়া বাহিনীর নাম ও ২৪ জানুয়ারির অস্ত্র সমর্পণের ইতিহাস।

 




ব্রেকিং নিউজঃ