টাঙ্গাইলে অবৈধ রিক্সা বৈধ করতে গুনতে হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা!

47

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলে যানজট নিরসনে ও দুর্ঘটনা রোধ করতে ব্যাটারি চালিত তিন চাকার অবৈধ রিক্সা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকায় সম্প্রতি পৌর কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহন করে। এরপর সেই রিক্সাগুলো আটক করে টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে রাখা হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আটককৃত রিক্সাগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর আবার রিক্সাগুলো আটকের উদ্যোগ নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। পরে রিক্সাগুলো আটক করে পৌর উদ্যানে নিয়ে গিয়ে অবৈধ রিক্সা লাইসেন্সের মাধ্যমে বৈধ করা হবে বলে ঘোষনা দেওয়া হয় পৌরসভার পক্ষ থেকে। এরপর থেকেই শুরু হয় সেই অবৈধ রিক্সা বৈধকরণ প্রক্রিয়া। কিন্তু দুই হাজার লাইসেন্সের মধ্যে বেশিরভাগই ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়েছে কতিথ কাউন্সিলর, কর্মকর্তা ও কর্মচারি এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাঝে। আর লাইসেন্স প্রতি নেওয়া হচ্ছে ২০/২৫ হাজার টাকা। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার দরিদ্র রিক্সা চালকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি পৌর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতায় অবৈধ রিক্সাগুলো আটক করে স্টেডিয়ামে নিয়ে ডাম্পিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে রিক্সা চালকরা লাইসেন্স করবেন এমন আশ্বাস দেওয়ার পর সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর চালকদের কাছ থেকে কোন সারা না পাওয়ায় আবার আটকের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং রিক্সাগুলো আটক করে পৌর উদ্যানে নিয়ে একটি করে স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয় রিক্সা চালকদের। এখন সেই অবৈধ রিক্সাগুলো ২০/২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে বৈধ করনের লাইসেন্স প্রদান করা হচ্ছে টাঙ্গাইল পৌরসভা থেকে। আর এই লাইসেন্সগুলো দরিদ্র রিক্সা চালকরা সরাসরি পৌরসভা থেকে না পাওয়ায় চরম বেকায়দায় পড়েছেন। তাই তারা দালালদের মাধ্যমে এই মোটা অংকের টাকা দিয়েই লাইসেন্স করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

কাকুয়া ইউনিয়নের রফিক হোসেন নামের এক রিক্সাচালক টিনিউজকে জানান, চার বছর ধরে তিনি রিক্সা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ৪৫ হাজার টাকা ঋন নিয়ে রিক্সাটি কিনেছিলেন। কিন্তু এখন সেই ৪৫ হাজার টাকার রিক্সার জন্য ২০ হাজার টাকা লাগবে লাইসেন্স নিতে। এতো টাকা কোথায় পাবেন এই ভেবেই তিনি দিশেহারা। ভাল্লুককান্দি গ্রামের নুরু মিয়া টিনিউজকে জানান, তিনি দুই বছর আগে এনজিও থেকে ৩৫ হাজার টাকা ঋন এবং কিছু জমানো টাকায় ৫২ হাজার টাকা দিয়ে রিক্সা কিনেছেন। এখন সেই রিক্সা পৌরসভা থেকে লাইসেন্স করতে ২০/২৫ হাজার লাগছে। আর যারা ওই টাকায় লাইসেন্স নিয়েছেন তাদের সেগুলো এখনো লাগানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।

টাঙ্গাইলে অবৈধ রিক্সা বৈধ করতে গুনতে হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা এদিকে পৌরসভা থেকে ১৮জন পুরুষ ও ছয়জন নারী কাউন্সিলর রয়েছেন। এদের প্রত্যেককেই ১৫টি করে এবং বাকিগুলো বিভিন্ন জনের নামে লাইসেন্সগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব লাইসেন্স কেউ ভাড়া দিচ্ছেন আবার কেউ ২০/২৫ হাজার টাকা বিক্রি করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার একজন কর্মকর্তা টিনিউজকে জানান, শহরে প্রায় ৮ হাজার ব্যাটারী চালিত অবৈধ রিক্সা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে দুই হাজার অবৈধ রিক্সার লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। আর এসব লাইসেন্স দালালদের মাধ্যমেই দেওয়া হচ্ছে। পৌরসভায় আর কোন লাইসন্স নেই। এজন্য অনেকে ঘুরে যাচ্ছেন লাইসেন্স না পেয়েছে। আর প্রতিটি লাইসেন্সের প্রকৃত মূল্য ১২শ’ টাকা। আর এ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। কিন্তু দালালরা সেগুলো মোটা অংকের টাকায় দরিদ্র রিক্সা চালকদের কাছে বিক্রি বা ভাড়া দিচ্ছেন।

রাকিব মিয়া, কালাম ও জাকির মিয়াসহ কয়েকজন রিক্সা চালক টিনিউজকে জানান, তারা সবাই গিয়েছিলেন লাইসেন্স নিতে। কিন্তু পৌরসভা থেকে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় লাইসেন্স শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু শুনেছেন কাউন্সিলরসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ১৫/২০টি করে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে তাদেরই রিক্সা চালানো উচিত। হাসান মিয়া নামের আরেক রিক্সা চালক টিনিউজকে জানান, তিনি ঋণ নিয়ে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে রিক্সা কিনেছেন। এখন সেই রিক্সা শহরে চালাতে হলে লাইসেন্স করতে হবে। তাই তিনি পৌরসভায় গিয়েছিলেন লাইসেন্স নিতে। কিন্তু তাকে জানানো হয়েছে লাইসেন্স নেই। বাধ্য হয়ে এক কাউন্সিলরের সাথে কথা বলেছেন। তাকে কাউন্সিলর জানিয়েছেন লাইসেন্স এখন নিতে হলে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। তিনি ২২ হাজার টাকা দিতে চেয়েছেন, কিন্তু কাজ হয়নি। রিক্সা চালক পরিচয়ে কথা হয় দুই নারী ও দুই পুরুষ কাউন্সিলরের সাথে। এ সময় তারা লাইসেন্স বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন।

১০, ১১ ও ১২ নং ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর সেলিনা আক্তার জানান, তিনি কয়েকটি লাইসেন্স পেয়েছেন, তার মধ্যে ২০ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছেন কয়েকটি। এছাড়া অন্য কাউন্সিলরা ২৫/৩০ হাজার টাকায়ও বিক্রি করছেন। ১, ২ এবং ৩ নং ওয়ার্ডের নারী কউিন্সলর মাহমুদা বেগম জেবু জানান, তিনি ৫/৬টি লাইসেন্স ২৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে তার কাছে আরো দুই/তিনটি লাইসেন্স আছে। সেগুলো ওই দামেই বিক্রি করতে চান।

২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুবেল মিয়া জানান, তিনি টাঙ্গাইলের বাইরে থাকায় তার জন্য যে লাইসেন্স বরাদ্দ ছিল সেগুলো বিক্রি করা হয়েছে। তবে মেয়র সাহেব তাকে জানিয়েছেন তার লাইসেন্স বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এজন্য তোমাকে টাকা দেওয়া হবে। তবে তিনি (রুবেল মিয়া) ঈদের পরে লাইসেন্স পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করতে বলেন। ১৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কামরুল হাসান মামুনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তার কাছে কোন লাইসেন্স নেই। আগামীকাল দুপুর ১২টায় যোগাযোগ করেন। দেখি ব্যবস্থা করতে পারি কি না।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সিরাজুল হক আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, শুধু পায়ে প্যাডেল করা এক হাজার রিক্সার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। আর প্রতি লাইসেন্স ১২শ’ টাকা। কিন্তু যদি কেউ এই লাইসেন্স ব্যাটারী চালিত রিক্সায় লাগায় তাহলে তার দায়ভার তাকেই নিতে হবে। তবে তার পৌরসভার কেউ যদি ২০/২৫ হাজার টাকায় লাইসেন্স বিক্রি করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

 

 

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ