টাঙ্গাইলের তিন উপজেলায় ব্যাপক ভাঙন ॥ বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষা গাইড বাঁধে ভাঙন

97

জাহিদ হাসান ॥
উজানে পাহাড়ি ঢলের কারণে এ বছর বর্ষার শুরুতেই যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী ও নাগরপুর উপজেলায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। শুধু সদর উপজেলার চরপৌলীতে গত কয়েক দিনের ব্যবধানের এলাকায় প্রায় ২ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙ্গনের ফলে ৫’শ শতাধিক ঘর বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত দুই দিনেই তিন শতাধিক ঘর বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এদিকে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি ও সারা বছর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাড়ে সেতু রক্ষা গাইড বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার অংশ ধ্বসে গিয়ে নদীতে দেবে গেছে। ফলে গাইড বাঁধের আশপাশে থাকা ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

জানা গেছে, স্থানীয় ও মৌসুমী বালু খেকোরা কোন ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কিছু কিছু জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে যমুনা ও নিউ ধলেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বাংলা ড্রেজারসহ বিভিন্ন ধরনের পন্থায় বালু উত্তোলন করে যাচ্ছেন। এতে করে নদীর তলদেশ খালি হওয়ায় প্রভাব পড়ছে বাঁধের ওপর। প্রশাসন এসব দেখেও না দেখার ভান করে চলছে। এদিকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব পাড়ের দক্ষিণে কালিহাতী উপজেলার বেলটিয়া, আলীপুর উত্তরপাড়া গাইড বাঁধের কয়েকটি স্থানে ব্লকগুলো ধসে যাচ্ছে নদীগর্ভে। ধস রোধে জিও ব্যাগ ফেলছে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়াও নিউ ধলেশ্বরী নদীতে বুড়িগঙ্গা খনন প্রকল্পে সারি সারি বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়রা টিনিউজকে জানান, গাইড বাঁধের কাছে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু নেতা বালু ব্যবসায়ী ড্রেজার বসিয়ে বালু আনলোড করার কারণে ব্লকের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় তলদেশ খালি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্লকগুলো নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে।

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর দেড় কিলোমিটার ভাটিতে নিউ ধলেশ্বরী নদীর মুখে (অফটেকে) পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) চারটি পৃথক লটে ২৩৪ কোটি ২৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকায় ১৫৩০ মিটার গাইড বাঁধ (অফ টেক বাঁধাই) নির্মাণ করে। যমুনার মাঝ বরাবর নতুন চর জেগে উঠায় পানির তীব্র স্রোতের ফলে গাইড বাঁধের ১ নম্বর লটের বিভিন্ন অংশে ইতো মধ্যে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। অফ টেকের ভাটিতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে আলীপুর, হাট আলীপুর, ভৈরব বাড়ি, চরপৌলী ও উত্তর চরপৌলী গ্রামে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দুই দিনে ওই সব এলাকার ৫’শ শতাধিক ঘর বাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। যমুনার ডান তীরে পাউবো স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করায় এবং যমুনার মাঝখানে নতুন চর জেগে উঠার কারণে বাম তীরে পানির তীব্র চাপের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

যমুনায় পানি বাড়ার সময় এবং পানি কমার সময় প্রতিবছর ওই সব এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। সেই ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। এ বছর বর্ষার শুরুতেই ভাঙন শুরু হয়েছে। গত তিন দিন ধরে ভাঙনের তীব্রতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। নদী তীরের মানুষ ঘর বাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয়রা টিনিউজকে জানায়, কয়েক দিনের মধ্যেই ৫’শ শতাধিক ঘর বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড গত কয়েক বছর এলাকায় জরুরি প্রয়োজনে (ভাঙনের সময়) জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারপরও ভাঙনের ফলে নদীর সীমানা গত বছরের চেয়ে আড়াইশ’ মিটার পূর্ব দিকে সরে এসেছে। এখন হাট আলীপুর মসজিদ, হাইস্কুল, মাদ্রাসা ও হাট আলীপুর বাজার এবং চরপৌলী মিন্টু মেমোরিয়াল হাই স্কুল, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা, উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হুমকির মুখে রয়েছে। যে কোন সময় ওই প্রতিষ্ঠানগুলো যমুনা বিলীন হয়ে যাবে। স্থানীয় হাতেম আলী টিনিউজকে বলেন, আমরা বছর বছর ঘর বাড়ি সরিয়ে নেয়। এ বছরও ঘর বাড়ি সরিয়ে নিয়েছি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি আমরা গাইড বাঁধ চাই ভাঙন থেকে বাঁচতে চাই। শামীম মিয়া টিনিউজকে জানান, আমরা ত্রাণ চাই না। আমরা যমুনার নদী ভাঙন থেকে বাঁচতে চাই। সরকারের কাছে দাবি আমাদের ভাঙন থেকে রক্ষা করুক।
এদিকে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও আবাদি জমি রক্ষাসহ যমুনা নদীর তীরে ভাঙন প্রতিরোধে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে কয়েক গ্রামের মানুষ। এলাকায় নদীর তীরে যমুনা নদীর পূর্বপাড় ভাঙ্গন প্রতিরোধ কমিটি এ মানবন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। দপ্তিয়র ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড বাজুয়ারটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান প্রামানিক, দপ্তিয়র ইউপি ১নং ওয়ার্ড মেম্বার কাবির মোল্লা, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক প্রমুখ। বক্তারা বলেন, দপ্তিয়র ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে যমুনার তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। চলতি বছরে বন্যার আগেই পানি আসায় ব্যাপক ভাঙনে মানুষের বাড়ি-ঘর, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কবরস্থান মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে রয়েছে। তাই ভাঙন প্রতিরোধে এসব এলাকায় সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা।

সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ টিনিউজকে জানান, মাত্র কয়েকদিনেই ৫’শ শতাধিক ঘর বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ শুধু সময়ের দাবি নয়-জরুরি। না হলে আগামী ২-১ বছরের মধ্যে সদর উপজেলার মানচিত্র পাল্টে যাবে। আমি বিষয়টি স্থানীয় এমপি এবং জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছেন।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম টিনিউজকে জানান, যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে ব্লকের নিচের অংশ থেকে বালু সরে যাওয়ায় ধস দেখা দিয়েছে। ধস রোধে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। আর খনন কাজে মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা ড্রেজার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বালু বিক্রির বিষয়টি তিনি জানেন না বলে জানান। তিনি টিনিউজকে আরও বলেন, যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে তাতে জরুরি কাজ করে এ ভাঙন ঠেকানো যাবে না। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত সে কাজের দরপত্র আহ্বান করা হবে। আগামী শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন কবলিত স্থানে স্থায়ী বাঁধের কাজ শুরু করা হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেন টিনিউজকে বলেন, আগামী বছরই আমরা বাঁধে নিমার্ণ কাজ শুরু করতে পারবো। আমাদের এ বাধেঁ প্রকল্পটি একনে আগেই অনুমোদন হয়ে আছে। গতবছরই এ বাধে কাজ শুরু হতো। কিন্তু করোনার মহামারিতে প্রকল্পের কাজটি আটকে যায় যা ইতিমধ্যে টেন্ডার ডকুমেন্টটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টেন্ডারটি খুব দ্রুত পাশ হয়ে যাবে। কাজেই আমরা আশা রাখছি আগামী বছরই স্থায়ীভাবে বাঁধের কাজ শুরু করতে পারবো।

 

ব্রেকিং নিউজঃ