টাঙ্গাইলের তিন উপজেলার ২১ স্পটে পাহাড় কেটে লাল মাটি বিক্রির মহোৎসব

117

হাসান সিকদার ॥
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, কালিহাতী ও সখীপুর উপজেলার ২১টি স্পটে পাহাড় কেটে লাল মাটি বিক্রির মহোৎসব চলছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাহাড় কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বর্ষাকালে ওইসব এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।




জানা গেছে, ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া, বারইপাড়া, টেগুড়িচালা, ঢেলুটিয়া, ঘোড়ামারা, লক্ষিন্দর ইউনিয়নের মনতলা, দুলালিয়া, আবেদালী, কাজলা, সানবান্ধা, গারোবাজার, কালিহাতী উপজেলার মরিচা, সখীপুর উপজেলার সাপিয়ার চালা, বাগেরবাড়ি, ইন্দারজানী, গড়বাড়ি, বহেড়াতৈল, আড়াংচালা, আমতৈল, আমগাছ চালা ও গিলাচালা নামকস্থান থেকে অবাধে লাল মাটির পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। কতিপয় ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, বন বিভাগের বিট ও রেঞ্জ কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে স্ব স্ব স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা রীতিমতো বেকু বসিয়ে দিনরাত ট্রাক, মাহিন্দ্র ট্রাক ও ড্রাম ট্রাক দিয়ে ওইসব পাহাড়ী লাল মাটি স্থানীয় ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে।




ভূমি আইন উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকায় দেদারছে চলছে লালমাটির পাহাড় কাটা। এক্ষেত্রে কেউ পুকুর খনন, আবার কেউবা বাড়িঘর তৈরি করার অজুহাত দেখাচ্ছে। মূলত পাহাড় কাটার এই মাটি বিক্রি করা হচ্ছে উপজেলার ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে। এতে করে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমির পরিমাণ। অন্যদিকে ইটভাটার চাহিদা মেটাতে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগ। এই মাটি বহনকারী ট্রাক চলাচলে নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তা। উপজেলার লক্ষিন্দর ইউনিয়নের মনতলা, দুলালিয়া, আবেদালী, কাজলা, সানবান্ধা, গারোবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর খননের হিড়িক পড়ে গেছে। লক্ষিন্দর ইউনিয়নের মনতলা গ্রামের ভেকু সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা শামসুল হক চৌধুরী প্রকাশ্যে কাটছেন লালমাটির পাহাড়। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়। গাড়ি প্রতি মাটি বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১৫শ টাকায়। অন্যদিকে সাগরদিঘী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বনবিভাগ এবং সরকারি সম্পত্তির মাটি কেটেও বিক্রি করেছেন এলাকার কতিপয় অসাধু ব্যক্তি।




স্থানীয়রা টিনিউজকে জানায়, দিনে মাটির ট্রাক কম আসা-যাওয়া করলেও রাত ৮টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত শতাধিক ট্রাক দিয়ে মাটি নেয়া হয়। এসব স্পটের স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ীদের মদদ দিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতৃবৃন্দ।




কয়েকজন মাটি ব্যবসায়ীরা টিনিউজকে জানান, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, বন বিভাগের বিট ও রেঞ্জ কর্মকর্তাদের মৌখিক অনুমতি নিয়েই তারা পাহাড়ের মাটি কাটছেন। তাছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও প্রতি মাসে টাকা দিয়ে সমর্থন নিতে হয়। দিনশেষে তাদের হাতে দিনমজুরির টাকাই থাকে। কোন কাজ নাই, তাই তারা মাটির ব্যবসা করে কোন রকমে দিনাতিপাত করছেন। মনতলা গ্রামের ভেকু সিন্ডিকেটের হোতা শামসুল হক চৌধুরী টিনিউজকে বলেন, আমি তো একা না, আমার মতো অনেকেই পাহাড়ি লাল মাটি কাটছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে মাটি ব্যবসায়ীরা সপ্তাহের বৃহস্পতি থেকে শনিবার পর্যন্ত নির্বিগ্নে মাটি কেটে বিক্রি করছেন।
টাঙ্গাইল বন বিভাগের বহেড়াতৈল রেঞ্জ কর্মকর্তা টিনিউজকে জানান, তিনি এ রেঞ্জে নতুন এসেছেন। বন বিভাগের ভূমির পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে বলে তিনি শুনেছেন। তিনি সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। তাছাড়া ব্যক্তি মালিকাধীন জায়গা কেটে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের কিছু করণীয় নেই।




ঘাটাইল উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, ঘাটাইলে কৃষি জমির পরিমাণ ২৭ হাজার ৮৫১ হেক্টর। এর মধ্যে তিন ফসলি জমি ১৭ হাজার ২১৮ হেক্টর, দুই ফসলি ৮ হাজার ১৮৫ হেক্টর ও এক ফসলি জমির পরিমাণ ২ হাজার ৩১১ হেক্টর।




এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জমির উদ্দিন টিনিউজকে বলেন, তিনি পাহাড় কাটা বা মাটি কেটে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন। এছাড়া সরজমিনে পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

 

ব্রেকিং নিউজঃ