টাঙ্গাইলের জলাভূমিতে ঘন হয়ে ফুটে আছে কাশফুল

31

হাসান সিকদার ॥
সবে তো এই বর্ষা গেলো/শরৎ এলো মাত্র,/এরই মধ্যে শুভ্র কাশে/ভরলো তোমার গাত্র। ক্ষেতের আলে, নদীর কূলে/পুকুরের ঐ পাড়টায়, হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে/বাঁশবনের ঐ ধারটায়…। হ্যাঁ, হঠাৎ করেই কাশ ফুটেছে। সাদা ফুলে অপরূপ হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। গ্রামে তো বটেই, শহরেও অভিন্ন ছবি। দিগন্ত বিস্তৃত কাশবন দেখে মন আর স্থির থাকতে পারছে না। সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে বারবার।
মনে ও বনে দারুণ এ পরিবর্তন, বলার অপেক্ষা রাখে না, শরত এনে দিয়েছে। ভাদ্র ও আশ্বিন দুই মাস শরতকাল। ভাদ্র মাস শেষ হয়েছে। বাংলা মাসের আজ ৩ আশ্বিন। ফলে শরতের রং রূপ এরই মাঝে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের আকাশ কী আশ্চর্য নীল এখন! গাঢ় নীল আকাশে সাদা মেঘের রথ। ওপরের দিকে তাকালে চমৎকার অনুভূতি হয়। ভ্যাপসা গরম নাগরিক ক্লান্তি কিছুই আর গ্রাস করতে পারে না। নিজের অজান্তেই মন গেয়ে ওঠে- আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা-/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই- লুকোচুরি খেলা…।
আর নিচের দিকে তাকালে কাশবন। গ্রামে নদীর ধারে জলাভূমিতে ঘন হয়ে ফুটে আছে কাশফুল। নৌকো করে যাওয়ার সময় সেদিকে তাকিয়ে থাকার আহা কী আনন্দ! দূরন্ত ছেলে মেয়েরা তো ছোট্ট নৌকো নিয়ে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। মনের আনন্দে সংগ্রহ করে কাশের গুচ্ছ। তাদের দিকে তাকিয়েই হয়তো কবিগুরু লিখেছিলেন, ‘শরতের মধ্যে শিশুর ভাব। তার, এই-হাসি, এই-কান্না। সেই হাসিকান্নার মধ্যে কার্যকারণের গভীরতা নাই, তাহা এমনি হাল্কাভাবে আসে এবং যায় যে, কোথাও তার পায়ের দাগটুকু পড়ে না, জলের ঢেউয়ের উপরটাতে আলোছায়া ভাইবোনের মতো যেমন কেবলই দুরন্তপনা করে অথচ কোন চিহ্ন রাখে না।’
টাঙ্গাইলসহ আশপাশের অনেক খোলা স্থানে এখন কাশফুল ফুটে আছে। বইছে ধলেশ্বরী নদী। শান্ত জল যেখানে স্থলভাগের সঙ্গে মিলিত হয়েছে সেখানে কাশবন। জল ছুঁয়ে থাকা কাশবন ওঠে এসেছে শূন্য ভূমি পর্যন্ত। দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা…। সেই সাদার মায়ায় মন আটকে যায়। অবশ্য শহরে কাশবন খুব কমই দেখা যায়। তাই বলে একেবারেই নেই এমন নয়। কিছু এলাকা কাশফুলের জন্য আলাদা দৃষ্টি কাড়ে। করোনা বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর এসব এলাকায় সৌন্দর্যপ্রেমীরা ভিড় করছেন। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। খোলা জায়গায় ঘন কাশবন। লম্বা সাদা কাশের গুচ্ছ মৃদু বাতাসে চমৎকার দুলছিল। কখনও পুরো বন ডানে হেলে পড়ছিল। কখনও বা বামে। শহরের ভেতরেই এমন দৃশ্য সত্যি বিরল। কত মানুষ মনের আনন্দে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! কাশফুল আলতো করে জড়িয়ে ধরছেন তন্বী তরুণীরা। ছবি তুলছেন। সেই ছবিতে ভরে উঠছে ফেসবুক। অন্যরাও পরিকল্পনা করছেন কবে সেখানে যাবেন। দল বেঁধে ছেলে মেয়েরা যাচ্ছে। পুরো পরিবার নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন অনেকে। শহরে ঘারিন্দা রাস্তার ধারেও উৎসবের আমেজ। দারুণ হৈ হুল্লোড়। হাসিরাশি আনন্দ। সবই কাশবন ঘিরে। শরতের এই দান অব্যাহত থাকবে আশ্বিন মাস পর্যন্ত।
নদীর তীরে যে উর্বর পলিমাটি থাকে সেখানে সহজেই বেড়ে ওঠে কাশ। বিভিন্ন জলাভূমি ও চরাঞ্চলে দেখা যায়। শুষ্ক এলাকা পাহাড় এবং এ ধরনের উঁচু জায়গায় স্বতন্ত্র সৌন্দর্য নিয়ে প্রকাশিত হয় কাশবন। কাশফুলের বৈজ্ঞানিক নাম সাকারাম স্পনটেনিয়াম। দীর্ঘকাল ধরে এটি বাংলাদেশে আছে। ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ অনেকটা ছনের মতো। গাছ ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। চিরল পাতার দুই পাশ বেশ ধারালো। কাশফুলের অন্য একটি প্রজাতির নাম আবার কুশ। পুরাণে কুশের কথা খুব গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুটো দেখতে প্রায় একইরকম। তাই সহজে আলাদা করা যায় না। আলাদা করার দরকারও নেই কোন। সাদা বা রুপালি রঙের কাশফুল ফোটে আছে। সৌন্দর্যটুকু দ্রুত উপভোগ করা চাই শুধু। কারণ আর ক’দিন পর মৌসুম শেষ হয়ে যাবে। ফুলটি আর দেখা যাবে না। কবিগুরুর ভাষায় বললে, ‘আমাদের শরতে বিচ্ছেদ-বেদনার ভিতরেও একটা কথা লাগিয়া আছে যে, বারে বারে নূতন করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে বলিয়াই চলিয়া যায়-তাই ধরার আঙিনায় আগমনী-গানের আর অন্ত নাই। যে লইয়া যায় সেই আবার ফিরাইয়া আনে। তাই সকল উৎসবের মধ্যে বড়ো উৎসব এই হারাইয়া ফিরিয়া পাওয়ার উৎসব।’
উৎসবটি সবার মন রাঙিয়ে দিয়ে যাক, করোনাকালের হতাশা দূর করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাক নতুন করে।

 

ব্রেকিং নিউজঃ