ঝড় আসুক আর না আসুক আজ পহেলা বৈশাখ

113

এম কবির ॥
বাঙালীর সাংস্কৃতিক জাগরণের মহাউপলক্ষ পহেলা বৈশাখ এলো। আজ সেই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের দিন। আবহমানকাল ধরে চলা আচার, অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিবারের মতোই বরণ করে নেয়া হবে বাংলা নববর্ষকে। কোভিড ১৯ সংক্রমণের কারণে গত দু’বছর বড় কোন উদযাপন করা সম্ভব হয়নি। ১৪২৯ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে আজ সেই বন্ধ্যত্ব ঘুচিয়ে নব সূচনার আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় টাঙ্গাইল শহরের পৌর উদ্দ্যান থেকে আকর্ষণীয় মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিপুল জনসমাবেশ ঘটে। শেষ হয় শিল্পকলা একাডেমিতে। সবচেয়ে বড় বর্ণাঢ্য ও অসাম্প্রদায়িক উৎসবে মেতে উঠে সব ধর্মবর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ। বহুকাল পর রোজার মধ্যে হচ্ছে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। এ আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ধর্ম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন আরও জোরালো হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। বছরের প্রথম দিনে আজ নতুন নতুন স্বপ্ন বুনবে বাংলার কৃষক। হালখাতা খুলবেন ব্যবসায়ীরা। সরকারী ছুটির দিনে টাঙ্গাইলে চলবে লোকজ ঐতিহ্যের নানা উৎসব অনুষ্ঠান। শহুরে জীবনেও বিপুল আনন্দ যোগ করে পহেলা বৈশাখ। বর্ষবরণের দিন টাঙ্গাইলের প্রতিটি উপজেলা শহরেই আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য উৎসব অনুষ্ঠানের। ধর্মবর্ণ ভেদ ভুলে অসাম্প্রদায়িক উৎসবে মাতে বাংলা। আজ সরকারী ছুটির দিন। লাল ও সাদা রঙের পোশাক পরে সব বয়সী মানুষ ঘর থেকে বের হয়। শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে বিনোদন পিপাসু মানুষ দিনভর ঘুরে বেড়ায় সর্বত্র।
তবে পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, তাৎপর্যপূর্ণ এক মুভমেন্টের নাম। এবার এমন এক সময়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হচ্ছে। যখন সেই পুরনো চেহারায় সামনে এসেছে মৌলবাদ। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা স্বাধীনতার ৫০ বছরের যত অর্জন সব গিলে খেতে চাইছে। নানা ছুঁতোয় ফণা তোলার চেষ্টা করছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। যখন শ্রেণীকক্ষে আক্রান্ত হচ্ছে বিজ্ঞান, যখন ধর্মের নামে উন্মাদনা ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হচ্ছে, যখন পুলিশ এবং প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীলরাও বসে নেই তখন প্রতিবাদ-প্রতিরোধের বৈশাখ এসেছে। আজ বাঙালীর চেতনাবিরোধী অপশক্তি রুখতে নতুন বছরে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেবে বাংলাদেশ। বাঙালীর উদার-অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল আলোয়, অগ্নিবাণে পুড়বে অন্ধকার। নজরুলের ভাষায়: তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর…। উদার, অসাম্প্রদায়িক উৎসবের পক্ষে জয়ধ্বনি করবে আজ বাংলাদেশ। শুদ্ধ, সুন্দর চাওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন বছরে নবসূচনা করবে বাঙালী। বিগত দিনের শোক-তাপ-বেদনা-অপ্রাপ্তি-আক্ষেপ ভুলে অপার সম্ভাবনার দিকে চোখ মেলে তাকাবে।
বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক কৃষির। এ সম্পর্কের সূত্রেই বাংলা সাল প্রবর্তন করেন স¤্রাট আকবর। তার আমলেই প্রবর্তন হয় বাংলা সাল। এখন তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত। বঙ্গাব্দের মাস হিসেবে বৈশাখের প্রথম স্থান অধিকার করার ইতিহাসটি বেশিদিনের না হলেও, আদি সাহিত্যে বৈশাখের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। দক্ষের ২৭ কন্যার মধ্যে অনন্য সুন্দরী অথচ খরতাপময় মেজাজ সম্পন্ন একজনের নাম বিশাখা। এই বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারেই বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরণ। বৈদিক যুগে সৌরমতে বৎসর গণনার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। সেখানেও সন্ধান মেলে বৈশাখের।
পেছনের যত ক্ষত ভুলে এ মাসেই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে বাঙালী। সেই শুভ সূচনা হয় পহেলা বৈশাখে। কবিগুরুর ভাষায়Ñ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা…। পুরনো দিনের শোক-তাপ-বেদনা-অপ্রাপ্তি-আক্ষেপ ভুলে অপার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করবে। দুই হাতে অন্ধকার ঠেলে, সকল ভয়কে জয় করার মানসে নতুন করে জেগে উঠবে বাঙালী। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ আজ একাত্ম হয়ে গাইবেÑ এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ…। আনন্দে উৎসবে মাতবে গোটা দেশ। কবিগুরুর ভাষায়Ñ নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে/শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে…। একই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নজরুল লিখেছেনÑতোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর…।

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ