ঘাটাইলে যন্ত্রের দাপটে বিলুপ্তির পথে ঢুলি

225

স্টাফ রিপোর্টার ॥
বাংলা সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঢুলি। দেশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য বিকাশে রয়েছে ঢুলি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যাত্রা, নাটক, বাউলগান, পালাগানসহ বাংলা সংস্কৃতি সমৃদ্ধের ক্ষেত্রে রয়েছে এ সম্প্রদায়ের বিশেষ অবদান। আধুনিক যন্ত্রাংশের দাপটে বিলুপ্তপ্রায় এ পেশায় জড়িত শতাধিক পরিবারের বসবাস টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউনিয়নের হামিদপুরের বায়ানপাড়ায়।
পেশা প্রায় বিলুপ্তির উপক্রম হওয়ায় চরম অনটনে কাটছে এ সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। ফলে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন ভিন্ন পেশা। অভাবের কারণে ঝুপড়িঘর, উন্মুক্ত টয়লেটের কারণে তাদের শিশুসহ পরিবারগুলো যেমন রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে, তেমনি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে অসচেতনতা।
জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর ধরে ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউনিয়নের বায়ানপাড়ায় বসবাস করে আসছে ঢুলি সম্প্রদায়। ৪নং ওয়ার্ডের গ্রাম বায়ানপাড়া বা নার্গাচিপাড়া। ব্যক্তিমালিকাধীন ৫৯ শতাংশ জমির ওপর গ্রামটিতে শতাধিক পরিবারের বসবাস। ভোটার সংখ্যা ১০৫। তাদের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন বাদ্যযন্ত্র। উপার্জনক্ষম শিশু থেকে বৃদ্ধ একজন হলেও রয়েছে এ পেশায়। বর্তমানে এ পেশার রয়েছে বাসন্তী ব্যান্ড পার্টি, মনির ব্যান্ড পার্টি, বাংলাদেশ ভান্ডারী ব্যান্ড পার্টি, স্বপন ব্যান্ড পার্টি, শাহিন ব্যান্ড পার্টি, ফখর উদ্দিন ভাই ভাই ব্যান্ড পার্টি, সুমাইয়া ব্যান্ড পার্টি, বৃষ্টি ব্যান্ড পার্টি ও হৃদয়-রিপন ব্যান্ড পার্টি। প্রতিটি দলে কাজ করেন ছয়জন বাঁশি বাদক, একজন বাংলা সানাই বাদক, একজন করে জয় ঢাক বাদক, ঢোল বাদক, জুড়ি বাদক, কারা বা ছোট জয় ঢাক বাদক আর করতাল বাদক। নাটক, যাত্রা, বাউলগান, পালাগান, সনাতন ধর্মের বিয়ে, পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওরস, র‌্যালিসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের ডাক পড়ে। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বাবদ জনপ্রতি মিলে এক হাজার টাকা। বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, অগ্রহায়ণ, মাঘ আর ফাল্গুন তাদের উপার্জনের সময়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যক্তি মালিকাধীন ৫৯ শতাংশ জমিতে গড়ে উঠে গ্রামটিতে মাত্র একটি সেমিপাকা ঘর। বাকি সব টিনের ঝুপড়ি। সরকারিভাবে স্যানেটারি পায়খানা তৈরির রিং পাট আর স্লাব বসানো হলেও সেগুলোতে টিনের বেড়া দেয়ার সাধ্যও হয়নি হতদরিদ্র পরিবারগুলোর। এ কারণে পলিথিন বা সিমেন্টের কাগজ দিয়ে ঘিরেই চলছে এর ব্যবহার। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি নিয়ে চরম অসচেতনতায় গ্রামটির প্রতিটি পরিবারেই বাড়ছে সদস্য সংখ্যাও। গ্রামের মরহুম বরকত আলী নার্গাচীর স্ত্রী খুশিরন (৫৫) প্রধানমন্ত্রীর দেয়া একটি ঘর পেলেও তাতে নেই স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট।
বায়ানপাড়া গ্রামের চার সন্তানের জনক ও বয়োজ্যেষ্ঠ করনেট বাঁশিবাদক দরাজ আলী নার্গাচী (৭৮) টিনিউজকে বলেন, ঢোল ব্যবসা আমাগো জাতিগত পেশা। পূর্বপুরুষ থেকে এ ব্যবসা চৈইলা আসছে। ব্যবসা-বাণিজ্য নেই, তাই খুব অভাবে রয়েছি। বছরের ছয় মাস চলে এ ব্যবসা। যখন কাম থাকে না তহন রিকশা বাই, কেউ কেউ আবার হাটে বাজারে ইঁদুর, তেলাপোকা, পিঁপড়া মারার ওষুধ বিক্রি কৈইরা চলে। বাঁশিবাদক জোয়াদ আলী নার্গাচী, শফিকুল ইসলাম নার্গাচী ও আহাম্মদ আলী ভান্ডারী নার্গাচী টিনিউজকে বলেন, অন্য কোনো কাম জানা নেই বৈইলা কোনো রকমে এ পেশা দিয়াই বাইচা আছি। নাটক, যাত্রা, বাউলগান, হিন্দু বিয়ে, পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওরস, র‌্যালিসহ বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজাই। বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের কারণে আমাগো চাহিদা কৈইমা গেছে। বাংলার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি। হযরত আলী নার্গাচী (৫৫) টিনিউজকে বলেন, ‘পূর্বপুরুষের পেশা ব্যান্ডপার্টি। এ পেশার ওপরই সংসার চলতাছে। এখন ডিজিটাল যন্ত্রপাতি আইসা পড়ায় আমাগো ব্যবসা কৈইমা গেছে। বছরের ছয় মাস যখন কাম না থাকে পেটে ভাতে বেঁচে থাকার তাগিদে দিনমজুরসহ রিকশা চালাই’- বলেও জানান তিনি।
দিগর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড ও বায়ানপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম তালুকদার টিনিউজকে জানান, প্রায় ৩০০ বছর ধরে এ গ্রামে বায়ান সম্প্রদায়ের বসবাস। আধুনিক সব প্রযুক্তির কারণে তাদের পেশায় প্রায় ধস নেমেছে। ব্যবসা খারাপ হওয়ায় পরিবারগুলোর অনেকেই এখন হাটে বাজারে মশা, মাছি ও ইঁদুরের ওষুধ বিক্রি কইরা পেট চালায়।
ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার সরকার টিনিউজকে জানান, সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে নিয়ে দ্রুত ঢুলি সম্প্রদায়ের বসবাসরত বায়নপাড়া গ্রামটি পরিদর্শন করা হবে। সমস্যা নির্ণয়সহ স্বাভাবিক জীবনযাপনে যথাসাধ্য সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় আসা বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান তিনি।

 

 

 

ব্রেকিং নিউজঃ