গোপালপুরে ৮ পুলিশকে প্রত্যাহার ॥ মামলা দায়ের ও দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত

246

স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের গোপালপুরে পুলিশী অভিযানে এক মাংস ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিমের (৫৫) মৃত্যুর ঘটনায় গোপালপুর থানার এসআইসহ ৮ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর আন্দোলনের মুখে পড়ে শুক্রবার (২৪ মে) রাতেই গোপালপুর থানার এসআইসহ ৮ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে নেয় জেলা পুলিশ। তারা হলো- উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু তাহের, সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আশরাফুল আলম, কনস্টেবল ফরিদ আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, খায়রুল ইসলাম, সালমান সাদিক, সাদ্দাম হোসেন, গাড়ির চালক কনস্টেবল আব্দুস ছাত্তার।
এদিকে মৃত্যুর এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মাসুদুর রহমান মনিরকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠণ করা হয়েছে। কমিটির অপর সদস্যরা হলো- জেলা বিশেষ শাখার ডিআইও-১ হারেচ আলী মিঞা, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি (উত্তর) সাজ্জাদ হোসেন। তদন্ত কমিটি শনিবার (২৫ মে) থেকে কাজ শুরু করেছে। এছাড়া গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আলিম আল রাজীর নেতৃত্বে একটি মেডিকেল তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এদিকে শুক্রবার (২৪ মে) রাতেই বিক্ষুব্দ লোকজনের দাবির প্রেক্ষিতে গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিকাশ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে নিহত আব্দুল হাকিমের লাশের সুরতহাল তৈরী করা হয়।
জানা যায়, শুক্রবার (২৪ মে) বিকেল ৫টার দিকে টাঙ্গাইলের গোপালপুরে পুলিশের নির্যাতনে মাংস ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিমের (৫৫) মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বাড়ি ঝাওয়াইল ইউনিয়নের ঝাওয়াইল গ্রামে। তবে পুলিশ নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার (২৪ মে) রাত ৮টার দিকে ঝাওয়াইল গ্রামবাসী গোপালপুর সড়কের উপর খরের পালায় আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীরা অভিযুক্ত পুলিশদের বিচার দাবি করেন। বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় স্থানীয় জনগণ ও পুলিশের কনস্টেবল রোকনসহ ৬ জন আহত হয়।
এদিকে এ খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন স্থানীয় সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির, পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) শফিকুল ইসলামসহ পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। তারা উপস্থিত বিক্ষোভকারীদের সাথে কথা বলেন এবং এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।
স্থানীয়রা টিনিউজকে জানায়, ঝাওয়াইল টেকনিক্যাল কলেজ মাঠে বিকেলে আব্দুল হাকিমসহ কয়েকজন তাস খেলছিল। এ সময় গোপালপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাহের ও এএসআই আশরাফুলের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সাদা পোশাকে মাইক্রোবাস নিয়ে ওই মাঠে অভিযান চালিয়ে সুরুজ্জামান, হারাধন চন্দ্র, গৌরাঙ্গ চন্দ্র ও রিপনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ আব্দুল হাকিমকে মারপিট করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সে মাঠেই অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। পরে হাকিমকে মাঠে অসুস্থ্য হয়ে পরে থাকতে দেখে এলাকাবাসী গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।
নিহত আব্দুল হাকিমের স্বজনরা টিনিউজকে অভিযোগ করেন, হাকিম মাঠে দাঁড়িয়ে তাস খেলা দেখছিল। এ সময় সাদা পোশাকে পুলিশ গিয়ে তাদেরকে আটক করে মারধর করে। পুলিশের নির্যাতনে হাকিমের মৃত্যু হয়েছে। তারা দায়ী পুলিশের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেছেন। ঝাওয়াইল গ্রামের আব্দুল হামিদ টিনিউজকে বলেন, নিহত হাকিম খুবই ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি মাংস ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদার টিনিউজকে বলেন, একজন সুস্থ্য মানুষকে আটক করার পর তার মৃত্যু হলো। বিষয়টি রহস্যজনক। এর সুষ্ঠু তদন্ত হলে মৃত্যুর রহস্য উদঘাটিত হবে। এদিকে পুলিশের নির্যাতনে হাকিমের মৃত্যু হয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে ঝাওয়াইল গ্রামের বিক্ষুব্ধ মানুষ গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে আসেন। এ সময় তারা বিক্ষোভ মিছিল করে এসআই তাহেরসহ দোষি পুলিশের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেন।
এ বিষয়ে গোপালপুর থানার (ওসি) হাসান আল মামুন টিনিউজকে বলেন, জুয়ার আসর থেকে পুলিশ ৪জনকে আটক করে। হাকিম এ সময় দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাকে হাসপাতালে আনার পর মৃত্যুবরণ করেন বলে তিনি জানান। জুয়া খেলার অভিযান থেকে ৫ হাজার ৮শ’ টাকা এবং দুই সেট তাস উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মাসুদুর রহমান মনির টিনিউজকে বলেন, শনিবার (২৫ মে) দুপুরে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। লাশের দাফন কাফনের জন্য পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়ের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। এদিকে জুয়ার আসর থেকে নগদ টাকাসহ আটককৃত ৪জনকে আসামী করে গোপালপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। এছাড়া মেডিকেল তদন্ত বোর্ডের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ব্রেকিং নিউজঃ