খেজুর রসের ঘ্রাণ পেতে সবাই চারাবাড়ির খেজুর তলায় ভীড়

114

মোজাম্মেল হক ॥
খেজুর রস খাওয়ার জন্য টাঙ্গাইল সদরের চারাবাড়ির কেন্দুয়ায় ছাত্র ও যুবকদের ঢল নেমেছে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা আর রাত ৮ থেকে ৯টা পর্যন্ত খেজুরের রস থাকা পর্যন্ত ভীড় লেগেই আছে। ভোর বেলা শীতের কারনে ২০০ লোক এবং রাতে গড়ে ৩০০ লোকের খেজুর রসের চাহিদার কারনে ভীড়। ভীড় থেকে এক লিটার কিংবা হাফ লিটার খেজুর পেয়ে ছাত্র ও যুবকদের মুখে হাসি ফুটেছে। শুরুতে এই খেজুর রস ৮০ টাকায় বিক্রি করেছে খেজুর গাছের মালিক সজিব। চাহিদার কারনে দাম বেড়ে এখন লিটার ১০০টাকা।




টাঙ্গাইল মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ঠাকুরগাঁও জেলা অধিবাসী হাসান টিনিউজকে বলেন, শীতে খেজুর রস খাওয়ার মজাই আলাদা, তাই শীতের কষ্ট হলেও চলে এসেছি রস খেতে” আদি টাঙ্গাইলের আতিক টিনিউজকে বলেন, শহরে খেজুর রস বিক্রি করার লোক পাওয়া যায় না। মানুষের কাছে শুনে শুনে খেজুরের রস খেতে এসেছি। চারাবাড়ি এলাকার অধিবাসী কসমস কম্পিউার সেন্টারের মালিক শওকত আলী টিনিউজকে বলেন, অতীতে ভোর বেলায় খেজুর নামাতে দেখতাম। হাড়িতে ভরে ভরে গ্রামগঞ্জে শহরের আনাচে কানাচে খেজুরের রস বিক্রি করতে দেখতাম। আর এখন খেজুর গাছের অভাব, খেজুর গাছের পরিচর্যার অভাবে খেজুর রস এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। তবে বাঙালীদের খেজুরের রস খাওয়ার চাহিদা যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। এটা চারাবাড়ির কেন্দুয়ার এই খেজুর তলায় সেটার প্রমান মেলে।




এই খেজুর গাছগুলোর মালিক সজিব মিয়া টিনিউজকে বলেন, মানুষের খেজুর রস খাওয়ার চাহিদা পূরণ করতেই গাইবান্ধা থেকে আগত মিষ্টার আলী ও সেন্টু নামে দুইভাইকে কাজে লাগিয়েছেন। তারা খেজুর গাছের নিকটে খেজুর গাছের পাতা দিয়ে ঘরে বসবাস করে আর সারাদিন খেজুর গাছের পরিচর্যা করে। ভোর বেলা ও রাতে খেজুর রস নামায় এবং দুপুর বেলায় খেজুর গাছ চেঁচে দেয়। ৪৪টি খেজুর গাছ থেকেই পর্যায়ক্রমে খেজুরের রস নামানো হয়। তবে খেজুরের রস পাইকারীর সুযোগ থাকে না, কারন খুচরা বিক্রি করেই সব শেষ হয়ে যায়। মিষ্টার আলী ও সেন্টু মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের খেজুর গাছের রস আহরনে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা। কুয়াশা ঢাকা শীতের সকালে টাটকা এক গ্লাস খেজুরের রসের তুলনা হয় না। এই মধুবৃক্ষ থেকে আহৃত রস কাঁচা ও জ¦াল দিয়ে খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি এ রস দিয়ে তৈরি গুড় ও পাটালিরও তুলনা নেই। খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এতে ১৫-২০% দ্রবীভূত শর্করা থাকে। খেজুরের রসে প্রচুর এনার্জি বা শক্তি রয়েছে। এটাকে প্রাকৃতিক “এনার্জি ড্রিংক” বলা যেতে পারে। এতে গ্লজোকের পরিমাণ বেশী থাকে।




 

প্রকৃতি প্রেমী ব্যারিষ্টার মশিউর রহমান টিনিউজকে বলেন, কুয়াশামাখা ভোরে খেজুর রসের ঘ্রাণ হারাতে বসেছে ঐতিহ্য। আমরা ছোট বেলা দেখতাম ক্ষেতের আইলপথে চলতে চলতে শিশিরে ভিজে যাওয়া পায়ের পাতা। সন্ধ্যে হলেই গাছে বাঁধা হচ্ছে হাঁিড়। সকাল হতে না হতেই খেজুর রসের চেনা স্বাদে মাতোয়ারা। বাড়ির উঠোন বা ধান কেটে নেওয়া শূন্য মাঠে গোল হয়ে বসে শীতের মধ্যে রস আস্বাদন। এই দৃশ্যগুলো অনেকেরই চেনা হলেও ইট-পাথরের এই নগরে সে দৃশ্যের দেখা মেলা কঠিন। আর আছে মধুর এ রস থেকে বঞ্চিত হওয়ার তিক্ততাও। অনেক দিন পর বন্ধু টিপু মীর্জার ডাকে সাড়া দিয়ে এই খেজুর তলায় এসে ভীড় থেকে এক লিটার খেজুর রস পেলাম। খুবই ভালো লাগলো। ঢাকা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক মির্জা জাহাঙ্গীর আদিল টিনিউজকে বলেন, শৈশব-কৈশোরটা যাদের গ্রামে কেটেছে, খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি চুরি করে রস খাওয়া তাদের এটি মূল্যবান স্মৃতি। এ স্মৃতি ভোলার নয়, এ যুগের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়ের স্বাদ জানে, কিন্তু তারা খেজুর রসের স্বাদ জানে না। এটার প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। এটা আমাদের ঐতিহ্য। সত্যি খেজুরের রস এখন আর শহরে পাওয়া যায় না, এমন কি গ্রামেও সচরাচর দেখা যায় না। শোনা যায় না- খেজুরের রস নিবেন? খেজুরের রস! খেজুরের রস এখন তেমন পাওয়া না গেলেও খেজুরের গুড় পাওয়া যায়। যা তুলনামূলক দাম বেশী। তাই খেজুর গাছ যেখানে বেশী সেখান থেকেই খেজুরের গুড় বেশী পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে হারানো ঐতিহ্য খেজুরের রস আস্বাদনে বয়স্ক লোকদের চেয়ে কিশোর কিশোরী এবং যুবকযুবতীদের আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে।




খেজুরের রস খাওয়ার পাশাপাশি খেজুর গাছ এবং খেজুরের রস নিয়ে ছবি তোলা মজার বিষয়। চারাবাড়ির কেন্দুয়ায় এই খেজুর গাছ গুলো খেজুরের রস পিপাসুদের কেন্দ্রস্থল। “খেজুরে আলাপ” বিরক্তিকর ও অবান্তর হলেও খেজুর রস ঐহিত্যের স্বাক্ষ্য বহন করা অন্যরকম স্বাদ ও উপকারী রস, এর কোন ক্ষতিকর দিক নেই।

ব্রেকিং নিউজঃ