কোম্পানি কমান্ডার আলী হোসেন খান লালটু’র দু:খ ও ভরাক্রান্ত কথা

215

Laltuস্টাফ রিপোর্টারঃ
স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবনকে বাজি রেখে শত্রুর মোকাবেলা করে স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচন করেছি কিন্তু নিজের জীবন ছায়ান্নে ঘর থেকে বের হবার দ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে নিজের বসত বাড়ির রাস্তাটুকুও করাতে পারিনি কাউকে দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধে টাঙ্গাইল জেলার ১১ নং সেক্টরের ১২ নং কোম্পানি কমান্ডার আলী হোসেন খান লালটু অত্যন্ত দু:খ ও ভরাক্রান্ত মনে কথাগুলো বললেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থান থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরকে নাস্তানাবুদ করেছেন। তিনি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার ঝনঝনিয়া গ্রামের সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা কৃষি ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক এবং একজন মাতব্বর শ্রেণীর সম্মাণিত ব্যক্তি ছিলেন। তার নাম আব্দুর রশিদ খান। মাতা হাজেরা খানম।
ছোট বেলা থেকেই লম্বাচোরা গড়নের দুরন্ত এই ছেলেটি ছিল ফুটবল খেলা ও সাতাঁরে পারদর্শী। আবার অন্যায় করে তার সামনে পার পেয়ে যায় এমন কেউ ছিল না। ঠিক যেন তার পিতার মত অন্যায়ের প্রতিবাদকারী। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে বীরত্বের সঙ্গে পাক ভারত যুদ্ধে শিয়ালকোটে সক্রিয় অংশগ্রহন করেন। ১৯৬৯ এর শেষের দিকে লাহোর থেকে দেশে ছুটিতে আসেন। ছুটি শেষে পাকিস্তানে যাবার জন্য ঢাকায় গমন করেন। ঢাকায় ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় তিনি ময়দানে উপস্থিত থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন এবং ২৫ মার্চের গণহত্যার ভয়াল চিত্র দেখে তিনি ক্ষীপ্ত হয়ে বর্বর পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করেন। তারপর টাঙ্গাইলে চলে এসে তৎকালীন শীর্ষ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সহযোগীতায় ইপিআর, আনসার ও সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য এবং কিছু স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্রদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করেন এবং টাঙ্গাইল মডেল প্রাইমারী স্কুলের স্থানে (বর্তমানে যেখানে পার্ক বাজার ও ভাসানী হল)। সেখানে তাদেরকে প্রথম প্রশিক্ষন প্রদান করেন এবং উল্লেখিত নেতাদের নির্দেশে ট্রেজারি আক্রমণ করে আর্মস এমিনেশন উদ্ধার করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা বিপুল অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে টাঙ্গাইল অভিমুখে রওনা দিয়েছে শুনে তাদের অগ্রযাত্রাকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশে আলী হোসেন লালটু তার প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের নিয়ে অত্যন্ত পুরাতন মডেলের থ্রিনটথ্রি রাইফেল নিয়ে অত্যাধুনিক পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে গোড়াইয়ের সাটিয়া চুড়াতে অ্যাম্বুশ (পজিশন) নেন। পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর সুসজ্জিত সৈন্যদের সাথে সাটিয়া চুড়াতে তাদের গোলাগুলি শুরু হয়।
বাঙালিদের এই চতুর্মুখী আক্রমনের মুখে তারা ঘাবড়িয়ে যায়। তবে অত্যাধুনিক এই বাহিনীর সাথে লালটু বাহিনী কৌশলগতভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং সেখানে ৬ জন মুক্তিসেনা শহীন হন। লাল্টু কমান্ডার জানান,“ঐ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অন্তরে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। পরে তিনি টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানে গমন করে মুক্তিযুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক এমন অনেক যোদ্ধা সংগ্রহ করে এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি তার অধীনে একাত্মতা প্রকাশ করলে মুক্তি সেনাদের পুণরায় বন্টন করে ১২নং কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে আলী হোসেন খান লালটুকে নিয়োগ করেন এবং পরে কাদের সিদ্দিকীর নির্দেশে তিনি নাগরপুর থানা আক্রমন করে বীরত্বের সাথে প্রচুর অস্ত্র শস্ত্র গোলা-বারুদ উদ্ধার করেন। যেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক উপকারে আসে এবং কিছু রাজাকার সহ অন্যান্য সরকারী বাহিনীর সদস্যদের বন্দি করতে সক্ষম হন। সেগুলোকে পরে কাদের সিদ্দিকীর নিকট হস্তান্তর করা হয়। ঠিক একই ভাবে তিনি ভূঞাপুর থানা বীরত্বের সাথে দখল করেন। সেখান থেকেও প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করেন যা তৎকালীন সময়ের সংবাদপত্রে অত্যন্ত ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল। কাদের সিদ্দিকী পরে তাকে মধুপুর ও বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার দায়িত্ব প্রদান করেন। সেখানে থাকালীন অবস্থায় তিনি বীরত্বের সঙ্গে অনেক সম্মুখ যুদ্ধে শত্রুদের সাথে যুদ্ধে অবর্তীর্ণ হয়ে কৃতিত্বের সাথে বিজয়ী হন। সেখানে অনেক খন্ড সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধে প্রচুর পাক সেনা, রাজাকারের কমান্ডারসহ অনেক শত্রু সেনা নিহত হয়। সেখানে একজন প্রাক্তন আনসার মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন।
রমজানের সময় মুক্তিযুদ্ধের বেসামরিক প্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদ এর মাধ্যমে কাদের সিদ্দিকী লালটু কমান্ডারকে সখীপুর হেড অফিসে ডেকে পাঠান। তিনি সেখানে পৌছাঁলে কাদের সিদ্দিকী তাকে কালিয়াকৈর ব্রীজ ভাঙার নির্দেশ প্রদান করেন। অসীম সাহসী এই টকবগে তরুণ লালটু বীজ ভাঙার জন্য কালিয়াকৈর গমন করেন। ব্রীজটি ছিল হানাদার বাহিনীদের করা পাহারা বেষ্টনীতে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে ব্রীজটি উড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। সেখান থেকে ফুলবাড়িয়া গমন করে। এভাবে তিনি প্রচুর সম্মুখ যুদ্ধে জীবনকে বাজি রেখে যুদ্ধ চালিয়েছেন। অনেক যুদ্ধে তিনি কীভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেন সেকথা তিনি উল্লেখ করতে গিয়ে ৭২-৭৩ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের চোখ বেয়ে পানি গড়াতে থাকে।
তিনি সাংবাদিকদের জানান, স্বাধীনতার পর থেকে সার কারখানায় চাকরি করার পর ২০০৪ সাল থেকে অবসরে জীবন অতিবাহিত করছেন। শারীরিক চিকিৎসার জন্য কয়েকবার দেশের বাইরে গেলেও কারও পক্ষ থেকে কোন প্রকার সাহ্যা সহযোগীতা তিনি পায়নি। তিনি টাঙ্গাইল বিশ্বাসবেতকা সুপারি বাগান ধোপাবাড়ি খাল পাড়ের পূর্ব পার্শ্বে নিজ বাড়িতে থাকেন। স্ত্রী ছাড়াও তার এক মেয়ে ও তিন নাতি নিয়ে বসবাস। খুব দু:খ করে তিনি জানান, আপনারা কীভাবে আমার বাড়িতে আসলেন। সাইকেল নিয়েও খুব সাবধানে আসতে হয়। গত কয়েক বছরে তিনবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে কীভাবে টেনে হিচড়ে রাস্তায় নিয়ে গাড়িতে উঠিয়েছিল তা তার মনে নেই। তবে শেষ বয়সের শরীরটা বেশ ভাড়ী। তাই তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই টাঙ্গাইল পেরৈসভার প্রতিনিধিদের নিকট ধরনা দিয়েও রাস্তার কোন সুফল পাওয়া যায়নি। এখানে পাকা রাস্তাটা হওয়া খুবই জরুরি। মরে গেলে কমপক্ষে কাধে নিয়ে যেনো লাশটা বের করতে পারে। সে ব্যবস্থা করার জন্য সাংবাদিকদের মাধ্যমে আবেদন করেন।

ব্রেকিং নিউজঃ